হাইড্রোলিক প্রেশার, অটো-পাইলট সংযোগ বিচ্ছিন্ন! ফুকেত-দিল্লি বিমানে চরম গাফিলতির তথ্য ফাঁস
Air India flight incident: তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া বয়ানে পাইলট জানিয়েছেন যে বিমান চলাকালীন তিনি প্রায় ৩০-৩৫ মিনিট ঘুমিয়েছিলেন। ঘুম থেকে উঠে তিনি ওয়াশরুমে যান এবং পরে ফার্স্ট অফিসারের আসনের পিছনে দাঁড়িয়েছিলেন।
Air India flight incident: মাঝ আকাশে আচমকা ঝাঁকুনি দিয়ে ৩০০ ফুট নীচে নেমে গিয়েছিল ফুকেট থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান। এই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন একাধিক যাত্রী ও কেবিন ক্রু। এবার সেই ঘটনার নেপথ্যে বড়সড় যান্ত্রিক ত্রুটির প্রমাণ সামনে এল। শুরুতে এয়ার ইন্ডিয়া এই ঘটনাকে সাধারণ 'টার্বুলেন্স' (Turbulence) বলে দাবি করলেও, ককপিটের রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত একটি নতুন রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে যে আসল ঘটনাটি ছিল আরও অনেক বেশি ভয়াবহ। ওই রিপোর্টে ৯টি সতর্কতা বার্তা (Warnings) এবং ট্রিপল-হাইড্রোলিক ফেইলিওরের (Triple-Hydraulic Failure) কথা উল্লেখ রয়েছে।

তদন্তকারী সূত্রের খবর, গত ৪ অগস্ট দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণ করার পর ১১টা ১৪ মিনিটে মেনটেন্যান্স রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়। তার ঘণ্টা দুয়েক পর এয়ার ইন্ডিয়া একটি বিবৃতি দিয়ে দাবি করে, এটি কেবলই ক্ষণস্থায়ী টার্বুল্যান্সের ঘটনা। কিন্তু সন্ধ্যা নাগাদ তারা সেই বিবৃতি পরিবর্তন করে 'টার্বুল্যান্স' শব্দটি বাদ দিলেও হাইড্রোলিক বিকলতার বিষয়টি সম্পূর্ণ চেপে যায়। বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রক জানিয়েছে, এই দুর্ঘটনায় অন্তত ২০ জন যাত্রী এবং ৪ জন কেবিন ক্রু আহত হয়েছেন। ওই বিমানের পাইলটেরাও তদন্তকারীদের আতশকাচের নীচে রয়েছে। ওই বিমানটি কেন হঠাৎ ৩০০ ফুট নীচে নেমে গেল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুর্ঘটনার সময় পাইলটেরা কী করছিলেন, তাঁরা নেশাগ্রস্ত ছিলেন কিনা, তা তদন্তের আওতায়। সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে ওই বিমানের পাইলটদের পর পর দু’বার ডোপ টেস্ট করানো হয়। সূত্রের খবর, প্রথম পরীক্ষাতে পাশ করতে পারেননি। দ্বিতীয় পরীক্ষাতেও ‘ফেল’ করেছেন পাইলট-ইন কমান্ড।
টার্বুলেন্সের দাবি নাকি ভয়াবহ যান্ত্রিক ত্রুটি?
রিপোর্ট অনুযায়ী, এয়ারবাস এ-৩২০ নিও (Airbus A-320 NEO) মডেলের ওই বিমানটিতে তিনটি আলাদা হাইড্রোলিক সিস্টেম থাকে। কিন্তু ৪ অগস্ট সকাল ৯টা ৩২ মিনিট নাগাদ একসঙ্গে তিনটি সিস্টেমেই নিম্ন চাপের সতর্কবার্তা দেখা যায়, যার মধ্যে দুটিতে তরল বা ফ্লুইডের পরিমাণ কমে গিয়েছিল। ঠিক সেই সময়েই অটো-পাইলট (Autopilot) সিস্টেম সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং বিমানের উচ্চতা ও ওঠানামা নিয়ন্ত্রণকারী লেফট ও রাইট এলিভেটরে ত্রুটি দেখা দেয়। এর কয়েক মিনিট পরেই বিমানের সামনের ডানদিকের এবং পিছনের ডানদিকের ইমারজেন্সি এক্সিট ডোরের (Emergency Exit Door) সতর্কবার্তা বেজে ওঠে। সকাল ১০:১৬-এ বিমানের ১ নম্বর ইঞ্জিনের অ্যান্টি-আইস সিস্টেমে ভালভ প্রেশারের ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর সকাল ১০:৫২-তে দ্বিতীয়বার অটো-পাইলট সিস্টেম বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এয়ারক্রাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB) ৪ অগাস্টের এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। ওই দিন এয়ার ইন্ডিয়ার AI2379 বিমানে ঘটনাটি ঘটে। বিমানটি ছিল A320 মডেলের এবং এর রেজিস্ট্রেশন নম্বর VT-EXO। ফ্লাইটরাডার২৪ (Flightradar24)-এর তথ্য অনুযায়ী, সতর্কবার্তাগুলোর ধারাবাহিক প্রকাশের ঠিক একই মিনিটের মধ্যে বিমানের উচ্চতার এই দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। ভারতীয় সময় অনুযায়ী সকাল ৯ টা ৩৩ মিনিটে যখন উচ্চতায় প্রথম অস্বাভাবিকতা রেকর্ড করা হয়, তখন বিমানটি ৩৬,১৬০ ফুট উচ্চতায় ছিল। ফ্লাইটরাডারের তথ্য অনুসারে, ঠিক এর পরপরই বিমানটি প্রায় ৩৫,৮০০ ফুটে নেমে আসে-যা প্রায় ৩৬০ ফুট উচ্চতা হ্রাসের বা হঠাৎ নিচে নেমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
কী ঘটেছিল বিমানে?
জানা গিয়েছে, তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া বয়ানে পাইলট জানিয়েছেন যে বিমান চলাকালীন তিনি প্রায় ৩০-৩৫ মিনিট ঘুমিয়েছিলেন। ঘুম থেকে উঠে তিনি ওয়াশরুমে যান এবং পরে ফার্স্ট অফিসারের আসনের পিছনে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সময়েই হু-হু করে নীচে নেমে যায় বিমানটি। সূত্রের খবর, বিমানটি যখন হু হু করে নীচে নেমে আসছিল তখন পাইলট নিজেও ককপিটে ছিটকে পড়েন। যদিও এয়ার ইন্ডিয়ার অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য ঘুমের ওষুধ খাওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন ওই পাইলট। আপাতত তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিমানের প্রধান দুই পাইলটকেই ডি-রোস্টার অর্থাৎ বিমান উড়ানো থেকে আপাতত অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে, একের পর এক হাইড্রোলিক সতর্কবার্তা এবং ক্রু সদস্যদের গাফিলতির কারণে বিমানটি কতটা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছিল, তা নিয়ে এখন বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ (DGCA) ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগ এই পুরো ঘটনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করছে।
E-Paper

