পাকিস্তান-যোগে নৌঘাঁটির গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগ, ‘অপারেশন ফায়ারওয়াল’-এ নজরে ১৩ নৌকর্মী! ১০ রাজ্যে তল্লাশি, গ্রেফতার ২
তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম। ভারতের পূর্ব উপকূলে নৌবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি এই শহর। অভিযোগ, নৌবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সম্পর্কে সংবেদনশীল তথ্য পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দা অপারেটিভদের কাছে পৌঁছে থাকতে পারে।
পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ। ভারতীয় নৌবাহিনীকে ঘিরে বড়সড় সন্দেহের জাল। অন্ধ্রপ্রদেশের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স শাখার ‘অপারেশন ফায়ারওয়াল-২০২৬’-এ দেশের ১০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একযোগে তল্লাশি চালানোর পর ১৮ জনকে নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৩ জনই নৌবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত বলে তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে পাকিস্তান-যোগের এক সম্ভাব্য গুপ্তচর চক্রের ছবি। তবে যাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, তাঁদের প্রত্যেকেই যে একই ধরনের অপরাধে যুক্ত, এমন কোনও দাবি এখনও করেনি তদন্তকারী সংস্থা।

তদন্তের কেন্দ্রে রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনম। ভারতের পূর্ব উপকূলে নৌবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি এই শহর। এখানেই রয়েছে ইস্টার্ন নেভাল কমান্ডের সদর দফতর। অভিযোগ, নৌবাহিনী এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সম্পর্কে সংবেদনশীল তথ্য পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ গোয়েন্দা অপারেটিভদের কাছে পৌঁছে থাকতে পারে। সেই তথ্য কী ভাবে সংগ্রহ করা হয়েছিল, কারা তা পাঠিয়েছিল এবং তার বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না—সব দিকই খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
গ্রেফতার নৌঘাঁটির কর্মী ও গাড়িচালক
তদন্তে প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিশাখাপত্তনমে গ্রেফতার করা হয়েছে অন্নম সাই বরপ্রসাদকে। তিনি নৌবাহিনীর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। অভিযোগ, পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ এক অপারেটিভের কাছে নৌবাহিনী ও প্রতিরক্ষা স্থাপনা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, সেই তথ্যের বিনিময়ে কোনও অর্থ তিনি পেয়েছিলেন কি না। তাঁকে আদালতে হাজির করার পর ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়েছে।
দ্বিতীয় গ্রেফতার হয়েছে তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোর থেকে। প্রাথমিক ভাবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন নৌকর্মী প্রদীপ মুখার্জির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এমন একটি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করতে প্রয়োজনীয় ওটিপি শেয়ার করেছিলেন, যেটি পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ এক অপারেটিভ ব্যবহার করত বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। তাঁর সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা অপারেটিভদের যোগাযোগ এবং কোনও সংবেদনশীল তথ্য আদানপ্রদান হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
১০ রাজ্যে একযোগে অভিযান
এই তদন্ত যে কেবল অন্ধ্রপ্রদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সেটাই ‘অপারেশন ফায়ারওয়াল’-এর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক। কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের ১২টি দল দেশের ১০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে একযোগে অভিযান চালিয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশের পাশাপাশি কেরল, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক-সহ একাধিক জায়গায় তল্লাশি হয়েছে। সন্দেহভাজনদের মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। বিশেষ নজরে রয়েছে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগের মাধ্যম।
তদন্তকারীদের মূল প্রশ্ন, পাকিস্তানি গোয়েন্দা অপারেটিভরা ঠিক কী ভাবে ভারতে থাকা সন্দেহভাজনদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কোনও নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের নথিও পরীক্ষা চলছে। এখনও পর্যন্ত ১৮ জনের মধ্যে দু’জনের বিরুদ্ধে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি। বাকি ১৬ জনের ভূমিকা নিয়ে অনুসন্ধান চলছে।
নৌবাহিনীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
এই তদন্ত স্বাভাবিক ভাবেই দেশের সামরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব উপকূলে ভারতের নৌ-পরিকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বিশাখাপত্তনমকে ঘিরে কোনও বিদেশি গুপ্তচর নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। ইস্টার্ন নেভাল কমান্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য ফাঁসের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
তবে তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। ১৮ জনের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন এক নয় এবং কতটা সংবেদনশীল তথ্য আদৌ বাইরে গিয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফলে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই।
একই সঙ্গে ‘অপারেশন ফায়ারওয়াল’ দেখিয়ে দিল, আধুনিক গুপ্তচরবৃত্তির লড়াই আর শুধু সীমান্তের ওপারে সীমাবদ্ধ নেই। এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ, ডিজিটাল পরিচয় এবং মানবসূত্র—সবকিছুকে ব্যবহার করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করতে পারে। এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ, এই নেটওয়ার্কের শিকড় কত দূর পর্যন্ত ছড়িয়েছে এবং দেশের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত কতটা তথ্য তাদের হাতে পৌঁছেছে, তার উত্তর বের করা।
ABOUT THE AUTHORAbhijit Chowdhury২০২১ সাল থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন অভিজিৎ চৌধুরী। ২০১৮ সালে সালে তাঁর পেশাদার জীবনের শুরু। জাতীয়, আন্তর্জাতিক বিষয়, বাংলার রাজনীতি এবং খেলাধুলোর বিষয়ে লেখার ক্ষেত্রে ৮ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমেরিকা, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের বিষয়ে তাঁর আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পাশ করেই সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেছেন অভিজিৎ। হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় যোগদানের আগে ওয়ানইন্ডিয়া এবং ইটিভি ভারতে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে অভিজিতের। এছাড়া আকাশবাণীতে রেডিও জকি হিসেবেও কাজ করেছিলেন তিনি। খবরের জগৎ ছাড়া খেলাধুলো, ইতিহাসে অভিজিতের আগ্রহ রয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা: সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন নিয়ে অভিজিৎ তাঁর স্নাতক স্তরের পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন আশুতোষ কলেজ থেকে। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিস ছাড়া প্রায় সব ধরনের খেলা দেখতে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন। কাজের বাইরে তাঁর অবসর কাটে বই পড়ে এবং বিভিন্ন বিষয়ে ডকুমেন্টারি দেখে।Read More
E-Paper


