JNU: পুকুরের শ্যাওলা থেকে মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ! চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল জয়ের নেপথ্যে ভারতীয় অধ্যাপকের যুগান্তকারী গবেষণা

Published on: Oct 07, 2026 12:50 pm IST

JNU's Nobel Link: কানপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর জেএনইউ, জার্মানি এবং পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে সুনীল কাটেরিয়ার। বর্তমানে জেএনইউ-তেই নিজের গবেষণাগার পরিচালনা করছেন।

JNU's Nobel Link: এ বছরের শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে সরাসরি জুড়ে গিয়েছে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) নাম। নোবেলজয়ী পিটার হেগেমানের গবেষণার ছাত্র ছিলেন জেএনইউ-র অধ্যাপক সুনীল কাটেরিয়া। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ মঞ্চে এমন সরাসরি ও বিরল সংযোগ ভারতীয় বৈজ্ঞানিক মহলে এক নতুন আশা ও আনন্দের জোয়ার নিয়ে এসেছে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল জয়ের নেপথ্যে ভারতীয় অধ্যাপকের যুগান্তকারী গবেষণা(সৌজন্যে এক্স )
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল জয়ের নেপথ্যে ভারতীয় অধ্যাপকের যুগান্তকারী গবেষণা(সৌজন্যে এক্স )

এ বছরের শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেমান এবং জর্জ নাগেল। আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং অপ্টোজেনেটিকস নিয়ে তাঁদের কাজ বিজ্ঞানীদের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো ব্যবহার করে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করার সুযোগ দিয়েছে। ফলে মস্তিষ্ক কীভাবে কাজ করে, স্মৃতি বা আচরণের মতো জটিল বিষয় নিয়ে নতুন দরজা খুলেছে গবেষণার। এই গবেষণার গোড়ায় ছিল একেবারে সাধারণ দেখতে এককোষী সবুজ শ্যাওলা। জলে থাকা এই জীব কীভাবে আলো চিনে তার দিকে এগিয়ে যায়, সেটা দেখতে চেয়েছিলেন হেগেমানরা। গবেষণাগারে সেই রহস্যের সন্ধানেই কাজ শুরু করেন তরুণ গবেষক সুনীল কাটেরিয়া।

১৯৩০ সালে অধ্যাপক সি ভি রমন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়ার পর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ভারতে আর কোনও নোবেল আসেনি। নোবেলের এই দীর্ঘ খরা আজও ভারতীয় গবেষকদের আক্ষেপের কারণ। তবে সেই খরাকে খানিকটা ভুলিয়ে আশার আলো জাগিয়েছে জেএনইউ-এর অধ্যাপক সুনীল কাটেরিয়ার ভূমিকা। ২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত জার্মানিতে হেগেমানের গবেষণাগারে কাজ করেন তিনি। সেই সময় কাটেরিয়ার গবেষণাই পরবর্তীতে মস্তিষ্কের কোষকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণের যুগান্তকারী প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গবেষণার সময় শ্যাওলার বংশগত উপাদান বিশ্লেষণ করে দু'টি অজানা জিন শনাক্ত করেন কাটেরিয়া। ওই জিনগুলিই এমন আলোকসংবেদী প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয়, যা আলো পেলে কোষের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপে পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

২০০২ এবং ২০০৩ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই কাজের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল সামনে আসে। পরবর্তী গবেষণায় দেখা যায়, ওই প্রোটিনগুলি কার্যত ক্ষুদ্র দরজার মতো কাজ করে। নির্দিষ্ট আলো পড়লে দরজা খুলে যায় এবং কোষের ভিতর বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় অপ্টোজেনেটিকসের ধারণা। তাঁর মতে, শ্যাওলার জিনোম থেকে আলোকসংবেদী প্রোটিন প্রস্তুতকারী দুটি নতুন জিন শনাক্ত করার উদ্যোগটি ছিল তাঁর নিজেরই—যা পরবর্তীকালে গোটা স্নায়ুবিজ্ঞানকে চিরতরে বদলে দেয়। কাটেরিয়ার কাছে অবশ্য এই নোবেল শুধু বৈজ্ঞানিক সাফল্যের গল্প নয়। তাঁর গবেষণার শিক্ষক হেগেমানের প্রতি কৃতজ্ঞতাও স্পষ্ট। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর কাছেই বিজ্ঞান শেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। দেশে ফেরার পরও দু’জনের গবেষণার যোগাযোগ থামেনি। একসঙ্গে একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

গল্পটি শুরু হয়েছিল এককোষী আণুবীক্ষণিক সবুজ শ্যাওলা 'ক্ল্যামাইডোমোনাস' (Chlamydomonas) নিয়ে, যা ভারতের যে কোনও পুকুর ও মিঠা জলের জলাশয়ে সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই জানতেন যে এই শ্যাওলা আলোকে বুঝতে পারে এবং আলোর অনুকূল উৎসের দিকে এগিয়ে যেতে পারে—বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় 'ফোটোট্যাক্সিস।' কিন্তু এই অতিক্ষুদ্র জীবটি ঠিক কীভাবে আলোকে অনুভব করে এবং সেই অনুভূতিকে চলনে রূপান্তরিত করে, তা এক বিরাট রহস্য ছিল। অধ্যাপক হেগেমানের পরীক্ষাগারে তরুণ গবেষক সুনীল কাটেরিয়া সেই ধাঁধার সমাধান খুঁজতে যুক্ত হন। কম্পিউটেশনাল বায়োলজি এবং মলিকিউলার বায়োলজির আধুনিক হাতিয়ার ব্যবহার করে তিনি সেই দুটি জিন শনাক্ত করেন, যা পূর্বে অজ্ঞাত আলোকসংবেদী প্রোটিন তৈরি করত। এই প্রোটিনের ওপর আলো পড়লেই কোষের ভেতরে এক ধরণের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ (Electrical activity) তৈরি হতো।

কানপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর জেএনইউ, জার্মানি এবং পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে সুনীল কাটেরিয়ার। বর্তমানে জেএনইউ-তেই নিজের গবেষণাগার পরিচালনা করছেন। আলোকসংবেদী নতুন প্রোটিন নিয়ে কাজের পাশাপাশি অপ্টোজেনেটিকস ও শৈবাল-ভিত্তিক জৈবপ্রযুক্তি নিয়েও কাজ চলছে সেখানে। জেএনইউ-র জীবপ্রযুক্তি বিভাগেও অপ্টোজেনেটিকস গবেষণা বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলির একটি। নোবেল ঘোষণার পর নিজের ভূমিকা নিয়ে অতিরিক্ত কৃতিত্ব নিতে চাননি ভারতের কাটেরিয়া। তাঁর মতে, বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কখনও এক জনের একার সাফল্য নয়। মৌলিক বিজ্ঞানের উপর জোর দিলে সেখান থেকেই নতুন আবিষ্কার, আর সেই আবিষ্কার থেকেই তৈরি হয় ভবিষ্যতের উদ্ভাবনের রাস্তা।

SHARE THIS ARTICLE ON
SHARE
close
Story Saved
Saved Articles
Following
My Reads
Sign out
Get App
crown-icon
Subscribe Now!