রাজনীতিতে ফের চর্চায় ‘বন্দে মাতরম’, কীভাবে এটি বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্র হয়ে ওঠে? জানুন বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুবার্ষিকীতে
বিশেষ করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় এই গানটি কেবল একটি সংগীত থাকেনি, বরং তা হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার এবং আপামর বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার মূলমন্ত্র।
আজ, ৮ এপ্রিল, বাংলা সাহিত্যের সম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখে তাঁর অমর সৃষ্টি 'বন্দে মাতরম' গানটি কীভাবে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় বিপ্লবের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছিল, তা জেনে নেওয়া যাক।

আজ বাংলা তথা ভারতের সাহিত্যাকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৮৯৪ সালের এই দিনে তিনি প্রয়াত হলেও, তাঁর রেখে যাওয়া একটি কালজয়ী গান—'বন্দে মাতরম'—ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিনশ্বর স্থান দখল করে আছে। বিশেষ করে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় এই গানটি কেবল একটি সংগীত থাকেনি, বরং তা হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার এবং আপামর বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার মূলমন্ত্র।
'আনন্দমঠ' থেকে আন্দোলনের রাজপথ
বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর 'আনন্দমঠ' উপন্যাসের জন্য ১৮৭৫ সালে গানটি লিখেছিলেন। কিন্তু তার প্রকৃত শক্তি উন্মোচিত হয় ৩০ বছর পর, যখন লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার ঘোষণা দেন। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে কলকাতার রাজপথ থেকে গ্রামের মেঠো পথ—সর্বত্র 'বন্দে মাতরম' ধ্বনি আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলেছিল। ব্রিটিশ শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আট থেকে আশি, প্রত্যেকের কণ্ঠে তখন এই গানটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গান।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে গানের প্রভাব
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় বন্দে মাতরম গানটি সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
ঐক্যের প্রতীক: এই গানটি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল বাঙালিকে এক সুতোয় গেঁথেছিল। ১৬ই অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিনে রাখিবন্ধন উৎসবে শামিল হয়ে হাজার হাজার মানুষ বন্দে মাতরম গেয়ে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
ব্রিটিশদের আতঙ্ক: এই গানের জনপ্রিয়তা ব্রিটিশ সরকারকে এতটাই আতঙ্কিত করে তুলেছিল যে, তারা প্রকাশ্যে 'বন্দে মাতরম' বলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই নিষেধাজ্ঞা গানটির আবেদনকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কার্লাইল সার্কুলার জারি করে ছাত্রদের এই আন্দোলনে যোগ দিতে বাধা দেওয়া হলেও, তারা রাজপথে নেমে বন্দে মাতরম গেয়ে ব্রিটিশ আইন ভঙ্গ করেছিল।
বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা: অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তরের মতো বিপ্লবী সংগঠনগুলোর কাছে এটি ছিল পরম পবিত্র মন্ত্র। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় ক্ষুদিরাম বসু থেকে শুরু করে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার—সবার ঠোঁটে ছিল এই চিরন্তন বন্দনা।
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলমন্ত্র
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গানে সুরারোপ করেন এবং ১৮৯৬ সালের জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে নিজেই তা গেয়ে শোনান। পরবর্তীতে ঋষি অরবিন্দ ঘোষ 'বন্দে মাতরম' নামে একটি ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশ করেন, যা বিপ্লবীদের ভাবধারা প্রচারে মুখ্য ভূমিকা নেয়। ১৯০৫ সালে বারাণসী অধিবেশনে কংগ্রেস গানটিকে জাতীয় সংহতির প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। বঙ্কিমচন্দ্রের সেই 'সুজলাং সুফলাং' বর্ণনা কেবল বাংলার নয়, সমগ্র ভারতের মাতৃরূপ হয়ে ওঠে।

বঙ্কিমচন্দ্রের উত্তরাধিকার ও আজকের প্রাসঙ্গিকতা
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর লেখনীর মাধ্যমে যে দেশপ্রেমের বীজ বপন করেছিলেন, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ছিল তার পূর্ণ প্রস্ফুটিত রূপ। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পিছন ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি 'বন্দে মাতরম' কেবল একটি গান নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের নির্যাস। এই মন্ত্রটি আমাদের শিখিয়েছে মা ও মাতৃভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সেই অগ্নিগর্ভ দিনগুলো আজ ইতিহাস, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্ট সেই সুর ও বাণী আজও প্রতিটি ভারতবাসীর হৃদয়ে দেশপ্রেমের স্পন্দন জাগিয়ে তোলে। আগামীকাল এই মহান সাহিত্যিকের প্রয়াণ দিবসে আমাদের শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে তাঁর আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করা।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper











