কিছু দিনের বৃষ্টিতেই করুণ দশা, অথচ টানা ২০ লক্ষ বছর মেঘভাঙা বৃষ্টি দেখেছে পৃথিবী! আবার ফিরতে পারে তেমন অবস্থা
আজ থেকে প্রায় ২৩ কোটি ২০ লাখ বছর আগে এই পৃথিবীতে ঠিক এমনই এক অলৌকিক ও ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছিল। বিজ্ঞানের ভাষায় এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে বলা হয় 'কার্নিয়ান প্লুভিয়াল এপিসোড' (Carnian Pluvial Episode)।
টানা কয়েকদিনের মুষলধারে বৃষ্টিতে জলমগ্ন শহরের অলিগলি। জল জমে মশার উপদ্রব, ডেঙ্গির বাড়বাড়ন্ত আর সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ দেখে আমরা অনেকেই আকুল হয়ে বলি, বৃষ্টি আর থামবে কবে? মাত্র কয়েক সপ্তাহের টানা বর্ষণেই যখন মানবসভ্যতার এই অবস্থা, তখন কল্পনা করুন তো, যদি এই পৃথিবীতে একটানা একদিন বা দুই দিন নয়, এক বা দুই বছরও নয়—একটানা ২০ লাখ (২ মিলিয়ন) বছর ধরে বৃষ্টি চলতে থাকে, তবে কেমন হবে?

বিজ্ঞানের ইতিহাস এবং ভূ-তত্ত্ববিদদের মতে, আজ থেকে প্রায় ২৩ কোটি ২০ লাখ বছর আগে এই পৃথিবীতে ঠিক এমনই এক অলৌকিক ও ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছিল। বিজ্ঞানের ভাষায় এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে বলা হয় 'কার্নিয়ান প্লুভিয়াল এপিসোড' (Carnian Pluvial Episode)। এই দীর্ঘস্থায়ী বর্ষণ কেবল পৃথিবীর জলবায়ু বদলে দেয়নি, বরং স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিকাশ এবং ডাইনোসরদের রাজত্ব শুরুর মূল পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিল।
১. কেন এবং কীভাবে শুরু হয়েছিল টানা ২০ লাখ বছরের বর্ষণ?
আজকের পৃথিবী যেমন বিভিন্ন মহাদেশে বিভক্ত, ২৩ কোটি বছর আগে ট্রায়াসিক যুগে পৃথিবীর মানচিত্র তেমন ছিল না। তখন সমস্ত মহাদেশ একত্রিত হয়ে গঠিত ছিল এক বিশাল ভূখণ্ড, যার নাম ছিল 'প্যানজিয়া' (Pangaea)। প্যানজিয়ার ভেতরের আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত শুষ্ক ও মরুভূমিপ্রধান।
- বিশাল আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ: কানাডার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রেঞ্জেলিয়া (Wrangellia) এলাকায় বিশাল আকৃতির আগ্নেয়গিরিগুলোর ধারাবাহিক ও প্রচণ্ড বিস্ফোরণ শুরু হয়। বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টন গ্রিনহাউস গ্যাস, বিশেষ করে কার্বন ডাই অক্সাইড ও সালফার ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে।
- বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সাগরের বাষ্পীভবন: কার্বন ডাই অক্সাইডের অতিমাত্রায় বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা হু হু করে বাড়তে থাকে। মহাসাগরের জল অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে মেঘে পরিণত হতে শুরু করে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতার মাত্রা এমন এক চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যা এক নজিরবিহীন ও দীর্ঘস্থায়ী মেঘভাঙা বৃষ্টির সৃষ্টি করে।
২. জলবায়ু ও প্রাণের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির প্রভাব
এই টানা ২০ লাখ বছরের বর্ষণ পৃথিবীর আদিম বাস্তুতন্ত্রে এক ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও নতুন সৃষ্টির বার্তা নিয়ে আসে:
- বিপুল জীবপ্রজাতির বিলুপ্তি: একটানা বৃষ্টি ও জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনের ফলে ডাঙ্গার ও সমুদ্রের অসংখ্য আদিম উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিশেষ করে মরু এলাকার শুষ্ক পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া বিশাল সংখ্যক প্রজাতি এই অতিবৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে মুছে যায়।
- নতুন উদ্ভিদের আত্মপ্রকাশ: অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে পৃথিবীতে বিশাল আকার ঘন সবুজ অরণ্য ও কনিফার (Conifer) জাতীয় গাছের উৎপত্তি ঘটে। আর্দ্র আবহাওয়া পুরো পৃথিবীর পরিবেশকে একসবুজ শ্যামল রূপ প্রদান করে।
- ডাইনোসর যুগের স্বর্ণযুগ: কার্নিয়ান প্লুভিয়াল এপিসোডের আগে ডাইনোসররা ছিল পৃথিবীর অত্যন্ত সাধারণ ও ক্ষুদ্র এক প্রজাতি। কিন্তু এই দীর্ঘ বৃষ্টির ফলে বিশাল আকারের অরণ্য ও পর্যাপ্ত খাদ্যের সৃষ্টি হয়। আগের প্রতিযোগী প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় ডাইনোসররা দ্রুত বিবর্তিত হয়ে পৃথিবীর সর্বেসর্বা অধিপতি হয়ে ওঠে।
- প্রবাল প্রাচীর ও নতুন প্রাণ: সাগরের জলের রাসায়নিক পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আজকের আধুনিক প্রবাল প্রাচীর (Coral Reefs) ও প্লাঙ্কটনের বিকাশ ঘটে, যা বর্তমান মহাসাগরের বাস্তুতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
৩. বর্তমান পৃথিবীর জন্য এই অতীত ইতিহাসের শিক্ষা
পৃথিবীর বুকে ২৩ কোটি বছর আগে ঘটে যাওয়া এই অতিবৃষ্টি মানবজাতির জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। মাত্রাতিরিক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড কীভাবে জলবায়ুকে চরম ভাবাপন্ন করে তুলতে পারে, তার বড় প্রমাণ কার্নিয়ান প্লুভিয়াল এপিসোড। আজও মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও দূষণের ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে, পরিবর্তন আসছে বর্ষাকালের ধরণ ও প্রকৃতির নিয়মে।
টানা ২০ লাখ বছরের সেই বৃষ্টি পৃথিবীকে মরুভূমির হাত থেকে বাঁচিয়ে এক নতুন সবুজ জীবজগৎ উপহার দিয়েছিল। তবে তার পেছনে থাকা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে প্রকৃতি নিজের মতো করে উত্তর দেয়, যা পৃথিবীর মানচিত্র ও প্রাণীকুলকে চিরতরে বদলে দিতে সক্ষম।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


