প্রশ্ন মুখস্থ করা, চিরকুট ব্যবহার! নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁসের চার্জশিটে চাঞ্চল্যকর দাবি CBI-র
NEET-UG Paper Leak Case: জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা প্রশ্নপত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত তিনজন বিষয় বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে সিবিআই। অভিযোগ, সরকারি কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তাঁরা বিশ্বাসভঙ্গ ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত ছিলেন।
NEET-UG Paper Leak Case: দেশজুড়ে তুমুল আলোচিত নিট-ইউজি (NEET-UG) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এনেছে সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বা সিবিআই (CBI)। সম্প্রতি ৯৪ পৃষ্ঠার একটি চার্জশিট জমা দিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-র (NTA) গাফিলতি এবং অভ্যন্তরীণ 'ত্রুটির' সুযোগ নিয়েই এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা প্রশ্নপত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত তিনজন বিষয় বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেছে সিবিআই। অভিযোগ, সরকারি কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তাঁরা বিশ্বাসভঙ্গ ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত ছিলেন। সিবিআইয়ের চার্জশিটে নাম রয়েছে বোটানি-জুলজির বিশেষজ্ঞ মানিশা গুরুনাথ মান্ধারে, কেমিস্ট্রির বিশেষজ্ঞ প্রহ্লাদ কুলকার্নি এবং মানিশা সঞ্জয় হাভালদারের। তাঁরা নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্বে থাকা বিষয় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের জেরে বাতিল হওয়া ওই পরীক্ষার সঙ্গে তাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। এই ঘটনায় সিবিআই দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউয়ের বিশেষ সিবিআই আদালতে মোট ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা দিয়েছে।
আদালতে জমা দেওয়া চার্জশিটে সিবিআই জানিয়েছে, অভিযুক্ত তিন বিশেষজ্ঞ রসায়ন, জীববিদ্যা এবং পদার্থবিদ্যার প্রশ্নপত্রের অনুবাদ, ব্যাক-ট্রান্সলেশন ও প্রুফরিডিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তাঁরা ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষার আগেই প্রশ্নফাঁস করেন বলে অভিযোগ। সিবিআইয়ের দাবি, অভিযুক্তদের মধ্যে একজন রসায়নের ১৩৫টি প্রশ্ন ও উত্তর বিকল্প ছোট ছোট কাগজে লিখে গোপনে এনটিএ অফিসের বাইরে নিয়ে যান। অন্য দুই অভিযুক্ত প্রশ্নগুলি মুখস্থ করে হোটেল বা বাড়িতে ফিরে লিখে রাখতেন অথবা এনসিইআরটি বইয়ের সংশ্লিষ্ট অংশ চিহ্নিত করে রাখতেন। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, এনটিএ-র গোপনীয় বিভাগে কাজের জন্য বিশেষজ্ঞদের সাদা কাগজ দেওয়া হতো। অভিযুক্ত পি. ভি. কুলকার্নি সেই কাগজ ব্যবহার করে প্রশ্ন ও উত্তর সংক্ষেপে লিখে ছোট চিরকুট তৈরি করেন এবং তা গোপনে বাইরে নিয়ে যান।
সিবিআই জানিয়েছে, এনটিএ-র গোপনীয় বিভাগে প্রবেশ বা বেরোনোর সময় বিশেষজ্ঞদের কোনও তল্লাশি করা হতো না, যার সুযোগই কাজে লাগানো হয়। আরও অভিযোগ, অভিযুক্ত মানিশা গুরুনাথ মান্ধারে, যিনি উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যার অনুবাদের দায়িত্বে ছিলেন, দীর্ঘদিন এনসিইআরটি পাঠ্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকায় প্রশ্নগুলিকে সহজেই পাঠ্যবইয়ের নির্দিষ্ট অংশের সঙ্গে মিলিয়ে পুনর্গঠন করতে সক্ষম হন। অন্যদিকে, পদার্থবিদ্যার অনুবাদ ও প্রুফরিডিংয়ের দায়িত্বে থাকা অভিযুক্ত মানিশা সঞ্জয় হাভালদার প্রতিদিনের কাজ শেষে দিল্লিতে নিজের থাকার জায়গায় ফিরে প্রশ্নগুলি লিখে রাখতেন বলে দাবি করেছে তদন্তকারী সংস্থা। সিবিআই চার্জশিটে এনটিএ-র নিরাপত্তা ব্যবস্থার একাধিক দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেছে। তদন্তে জানা গিয়েছে, এনটিএ অফিসের সিসিটিভি ফুটেজ মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিন সংরক্ষিত থাকত। যেহেতু নিট-ইউজি ২০২৬-এর গোপনীয় কাজ শেষ হয় ৭ এপ্রিল এবং মামলা দায়ের হয় ১২ মে, তাই তদন্তের সময় সংশ্লিষ্ট সময়ের কোনও সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, এনটিএ-তে সিসিটিভির লাইভ ফিড পর্যবেক্ষণের জন্য কোনও নির্দিষ্ট কন্ট্রোল রুমও ছিল না, ফলে গোপনীয় বিভাগে বিশেষজ্ঞদের কার্যকলাপ নজরদারির বাইরে থেকে যায়। এই মামলার তদন্তে সিবিআই ৩৬০ জন সাক্ষী, ৪২২টি নথি এবং ৪৩টি আলামত আদালতে পেশ করেছে। শিক্ষা মন্ত্রকের উচ্চশিক্ষা বিভাগের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে ১২ মে সিবিআই মামলা রুজু করে। এরপর ৭২ জন আধিকারিক এবং আটজন সাইবার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ নিয়ে একাধিক তদন্তকারী দল গঠন করা হয়। মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, হরিয়ানা, দিল্লি-সহ বিভিন্ন রাজ্যে মোট ৯২টি স্থানে তল্লাশি চালিয়ে ডিজিটাল ডিভাইসা নথি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উদ্ধার করা হয়েছে। সিবিআইয়ের দাবি, তদন্তে প্রশ্নফাঁসের উৎস থেকে শুরু করে সুবিধাভোগী পরীক্ষার্থী পর্যন্ত পুরো চক্রের সন্ধান মিলেছে। এই ঘটনায় কয়েকজন কোচিং সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের জেরে ৩ মে অনুষ্ঠিত মূল নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষা বাতিল করা হয়। পরে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ২১ জুন পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হয়। বর্তমানে চার্জশিটভুক্ত ১৩ জন অভিযুক্তই বিচারবিভাগীয় হেফাজতে রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৮৮ এবং পাবলিক এক্সামিনেশনস (প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিনস) আইন, ২০২৪-এর বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
E-Paper

