The Banker: বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যাঙ্কের তালিকায় চিনের দাপট, ভারতের অবস্থান কোথায়?

The Banker: তালিকাভুক্ত চিনা ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৫৪.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই তালিকায় থাকা মার্কিন ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ২৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে, কেবল সম্পদের আকারই সবকিছু নয়। লাভের হিসেব করলে এখনও এগিয়ে রয়েছে মার্কিন ব্যাঙ্কগুলো।

Published on: Jul 15, 2026, 23:56:52 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

The Banker: সম্পদের (অ্যাসেট) আকারের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় চারটি ব্যাঙ্কের মালিক এখন চিন। একই সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যাঙ্কের মধ্যে সাতটিই চিনের এবং সবগুলোই চিনা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক। বৈশ্বিক আর্থিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে চিনের এই সাফল্যের খবর প্রকাশ করেছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যাঙ্কের তালিকায় চিনের দাপট, ভারতের অবস্থান কোথায়? File Photo (REUTERS)
বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যাঙ্কের তালিকায় চিনের দাপট, ভারতের অবস্থান কোথায়? File Photo (REUTERS)

দ্য ব্যাংকার সাময়িকীর প্রকাশিত র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ চারে রয়েছে-১) ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাঙ্ক অব চায়না (আইসিবিসি), ২) চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাঙ্ক, ৩) এগ্রিকালচারাল ব্যাঙ্ক অব চায়না ৪) ব্যাঙ্ক অব চায়না। পঞ্চম স্থানে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জেপিমরগ্যান চেজ। টিয়ার-ওয়ান মূলধনের ভিত্তিতে তৈরি করা তালিকায় বিশ্বের শীর্ষ ১০ ব্যাঙ্কের মধ্যে সাতটিই চিনের এবং সবগুলোই চিনা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। প্রথমবারের মতো পোস্টাল সেভিংস ব্যাঙ্ক অব চায়না শীর্ষ ১০-এ জায়গা করে নিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা ও সিটিগ্রুপ যথাক্রমে ষষ্ঠ ও অষ্টম স্থানে রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত চিনা ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৫৪.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই তালিকায় থাকা মার্কিন ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ২৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে, কেবল সম্পদের আকারই সবকিছু নয়। লাভের হিসেব করলে এখনও এগিয়ে রয়েছে মার্কিন ব্যাঙ্কগুলো। যদিও শীর্ষ এক হাজার ব্যাঙ্কের মধ্যে চিনা ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত কর-পূর্ব মুনাফা ৩৯২ বিলিয়ন ডলার যেখানে মার্কিন ব্যাঙ্কগুলোর কর-পূর্ব মুনাফা ৩২৮ বিলিয়ন ডলার। দ্য ব্যাংকার জানিয়েছে, মুনাফার গুণগত মান ও দক্ষতার দিক থেকে মার্কিন ব্যাঙ্কগুলো এখনও স্পষ্টভাবে এগিয়ে। অন্যদিকে, তুলনামূলক ভাবে আগের বছরের থেকে দুর্বল অবস্থান কাটিয়ে ইউরোপীয় ব্যাঙ্কগুলো আয় বৃদ্ধিতে ভালো অগ্রগতি দেখিয়েছে।

চিনের লক্ষ্য কী?

বিশ্লেষকদের মতে, চিনের ব্যাঙ্ক খাতের এই সম্প্রসারণ বেজিংয়ের বৃহত্তর আর্থিক কৌশলের অংশ। এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো, বিকল্প আন্তঃসীমান্ত অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বিদেশে ব্যাঙ্ককিং কার্যক্রমের মাধ্যমে চিনের প্রভাব বিস্তার করা। দ্য ব্যাংকার-এর প্রধান সম্পাদক সিলভিয়া পাভোনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে চিনা ব্যাঙ্কগুলোর সম্প্রসারণ এবং ইউয়ানের আন্তর্জাতিকীকরণের প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি ও মুনাফার গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। তিনি আরও বলেন, চিনের বৃহত্তম ব্যাঙ্কগুলো তাদের আধিপত্য ধরে রেখেছে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশটির ব্যাঙ্কিং খাতের ব্যাপ্তি ও স্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্য।

ভারতের অবস্থান

বিশ্ব ব্যাঙ্কিংয়ের এই মহাশক্তিশালী লড়াইয়ে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারত? এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল-এর ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৮৭৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পত্তি বা অ্যাসেট নিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ব্যাঙ্কগুলোর তালিকায় ৪৫তম স্থানে রয়েছে দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (এসবিএই)। আর বেসরকারি খাতের এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক রয়েছে ৭৬তম স্থানে। ভারতের এই অবস্থান কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাবে নয়। ১৯৯১ সালের নভেম্বর মাসে এম. নরসিমহমের সভাপতিত্বে গঠিত ফিনান্সিয়াল সিস্টেম কমিটি তাদের রিপোর্টে সুপারিশ করেছিল যে, দেশে অন্তত তিন থেকে চারটি বড় মাপের ব্যাঙ্ক থাকা উচিত (যার মধ্যে স্টেট ব্যাঙ্ক অন্যতম), যা আন্তর্জাতিক চরিত্র ও সুনামের অধিকারী হবে। কিন্তু দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবং ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দফায় দফায় সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সংখ্যা ২৭ থেকে কমিয়ে ১২-তে নামিয়ে আনার পরেও, নরসিমহম কমিটির সেই দূরদর্শী লক্ষ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক স্তরে ছাপ ফেলার মতো জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি কোনও ভারতীয় ব্যাঙ্ক।

ভারতের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ

তাহলে কী সরকারি নির্দেশে জোরাজুরি করে ব্যাঙ্কের আকার বড় করা উচিত? এই যুক্তির দুটি দিকই খতিয়ে দেখতে হবে। স্রেফ বিশ্ব তালিকায় নাম তোলার অন্ধ দৌড় যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ সুমিতোমো ব্যাঙ্ক। ১৯৯০ সালে বিশ্বের শীর্ষ স্থানে থাকা এই জাপানি ব্যাঙ্কটি ২০০১ সালের মধ্যে অবলুপ্তির পথে হেঁটে অন্য ব্যাঙ্কের সঙ্গে মিশে যেতে বাধ্য হয়। তাই আসল প্রশ্ন টিয়ার-ওয়ান মূলধন কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তোলা নয়, বরং সেই পুঁজি বা ক্যাপিটাল ঠিক কী কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটাই মূল বিবেচ্য। ভারত আগামী প্রতি দশকে শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করে নিজের পরিকাঠামো খাতের উন্নয়ন করতে চায়। আর ভারতের ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার বা মূলধনী ব্যয়ের গুণক কার্যকারিতা প্রায় ২.৪৫ গুণ, যেখানে সাধারণ রেভিনিউ ব্যয়ের ক্ষেত্রে এটি মাত্র ১ গুণ। এর পাশাপাশি, ভারত নিজের প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছেও এক প্রভাবশালী ঋণদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ২০২২ সালে যখন শ্রীলঙ্কা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছিল, তখন ভারত ক্রেডিট লাইন এবং কারেন্সি সোয়াপের মাধ্যমে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ই ভারত টের পায় যে, এই ধরণের বিপুল চাহিদা মেটাতে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিকাঠামো কতটা অপর্যাপ্ত।

অথচ এক দশক আগে এই একই প্রতিবেশী অঞ্চলে চিনের পলিসি ব্যাঙ্ক এবং শীর্ষ চারটি ব্যাঙ্ক কোনও ধরণের পুঁজির টানাটানি ছাড়াই অবাধে ঋণ বিলিয়েছে। যে দেশ প্রতিবেশীদের সামনে বিকল্প ঋণদাতা হওয়ার প্রস্তাব দিতে চায়, সেই দেশ ও তার পেমেন্ট নেটওয়ার্কের আকারও সেই প্রস্তাবের মতোই বড় হওয়া জরুরি। বিদেশে ইউপিআই-এর ধীরগতির বিস্তার এবং রুপিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নবীকৃত প্রচেষ্টা আসলে ভারতীয় অর্থনৈতিক পরিকাঠামো বা ‘প্লাম্বিং’-এর এক মৃদু ইতিবাচক সূচনা মাত্র। ১৯৯০ সালের বৈশ্বিক ব্যাঙ্কিং র‍্যাঙ্কিং এই শিক্ষা দিয়েছিল যে-ব্যাঙ্কের অতিকায় আকার আসলে একটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থর সূচক এবং কখনও কখনও তা চরম সংকটেরও পূর্বাভাস। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের বর্তমান র‍্যাঙ্কিং দ্বিতীয় একটি শিক্ষা দিচ্ছে। অর্থনৈতিক মডেলের ভাগ্য যাই হোক না কেন, সুসময়ে গড়ে তোলা নিজস্ব নেটওয়ার্কগুলো চরম সংকটের দিনেও অবিচল থাকে। আর এই নিজস্ব নেটওয়ার্কই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রতিরোধ এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আসল চাবিকাঠি। ভারতের আজ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি ব্যাঙ্কের তালিকায় নাম তোলার কোনও প্রয়োজন নেই। ভারতের প্রয়োজন এমন গভীর পুঁজি সম্পন্ন ব্যাঙ্ক, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের জোগান দিতে পারবে; এবং প্রয়োজন এমন নিজস্ব অর্থনৈতিক পাইপলাইন, যাতে অন্য কোনও দেশের ‘প্লাম্বার’ এসে ভারতের জলের কল বন্ধ না করে দিতে পারে।