নয় নয়, ভয় নয়। বিবিধ আশঙ্কা উপেক্ষা করে প্রশান্তির গহিনে ডুব দেওয়াই হল অ্যাডভেঞ্চার। শিহরণ কি শুধু আতঙ্কের ছাপ? রহস্যময়ী প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্যসুধা পান করার চরম ইচ্ছাই তো আমাদের টেনে নিয়ে যায় দুর্গম থেকে দুর্গমতর গন্তব্যে। এখানে জীবন মানে প্রতিপদে ঝুঁকি। ‘রিস্ক হ্যায়, তভি তো ইশক হ্যায়’।
ইস্ট সিকিমের পথে ভালোবাসার জায়গা। (ছবি সৌজন্যে অভিষেক কোলে)
বাঙালিরা বরাবর ভ্রমণপ্রিয়। বাসে, ট্রেনে, প্রাইভেট কারে অথবা প্লেনে, সাধ্যমতো পাহাড়, সমতল, সমুদ্র সৈকত চষে বেড়ান অনেকেই। তবে জেনারেশন নির্বিশেষে এর বাইরেও একটা শ্রেণীর ভ্রমণ পিপাসুর দেখা মেলে, যাঁদের ডেস্টিনেশন ট্যুর পছন্দ নয় একদমই। যাঁদের কাছে ‘সফর খুবসুরত হ্যায় মঞ্জিল সে ভি’। আর লম্বা সফরেই যাঁরা আনন্দ খুঁজে পান, তাঁরা বাসে-ট্রেনে-প্লেনে নয়, বরং ঘুরতে পছন্দ করেন দু’চাকায়। হ্যাঁ, আমি তাঁদের কথাই বলছি, যাঁরা নিজেদের রাইডার হিসেবে পরিচয় দিতেই ভালোবাসেন। যাঁরা বাইকে কয়েক হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়েও ক্লান্ত হন না মোটেও। আমি নিজেও তাঁদেরই একজন।
বাঙালি রাইডারদের মধ্যে বেশিরভাগেরই স্বপ্ন পাহাড়ে বাইক নিয়ে ঘোরার। হিমালয়ের কোলে ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগিয়ে পাইনের ছায়ায় হারিয়ে যাওয়ার আমোঘ সুখের হাতছানি উপেক্ষা করা কঠিন। মেঘ আর কুয়াশার বুক চিরে ছুটে যাওয়ার সময় বাইকের ডিপ ডিপ শব্দ যে নেশার আমেজে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তা বাইকপ্রেমী ছাড়া আর কারও পক্ষে যথাযথ অনুভব করা মুশকিল। রোদ-বৃষ্টি-ঠান্ডা, এক্ষেত্রে কোনও কিছুই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে না লং-রাইডারদের সামনে।
অধুনা কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদের একাংশকেও বাণিজ্যিক স্বার্থে বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় পাহাড়ে। তবে লং-রাইডের নেশা না থাকলে শুধু ভিডিও বানানোর জন্য এমন কৃচ্ছসাধন সম্ভব নয় মোটেও। বাঙালির কাছে পাহাড় বলতে সবার আগে চলে আসে দার্জিলিংয়ের নাম। এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে যে শব্দবন্ধ, তা হল ‘অফবিট দার্জিলিং’। কার্শিয়াং, কালিম্পং, তাগদা, তিনচুলে, ইচ্ছেগাঁও, সিলেরিগাঁও, লাভা, রিশপ, লং-রাইডারদের ডেস্টিনেশনে কী নেই! এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যে, বাইকাররা স্পট ভিজিটে বিশ্বাসী নয় বলেই বেছে নেন দু’চাকা। না হলে সাধারণ ভ্রমণপ্রেমীদের বেশিরভাগই তো চারচাকা ভাড়া করে ফাইভ-পয়েন্ট, সেভেন পয়েন্টের মতো কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখাকেই পাহাড় ভ্রমণ হিসেবে বিবেচনা করেন।
তবে দার্জিলিং সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলের সবটাই সবুজ। একটু স্বাদবদল হয় পার্শ্ববর্তী সিকিমে। সেখানে পাহাড় সবুজের বুক চিরে মাথা তুলেছে বরফের দেশে। যদিও সিকিমের পাহাড় সারা বছর বরফে ঢাকা থাকে, এমনটা নয় মোটেও। ঋতুভেদে সিকিমের পাহাড়ের সৌন্দর্য্য ভিন্ন ভিন্ন হয়। তাছাড়া সিকিমের বেশ কিছু জায়গার রাস্তা বেশ দুর্গম। অফ-রোডিং যাঁদের নেশা, তাঁরা সিকিমে বাইক চালাতে বেশি পছন্দ করেন। তাই বাঙালি রাইডারদের মধ্যে সিকিম রাইড এখন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনারা ইউটিউবে বহু ভিডিয়ো পাবেন, যার শিরোনাম কলকাতা টু দার্জিলিং, কলকাতা টু সিকিম বাইক রাইড।
বাইক নিয়ে পাহাড়ে ঘোরার বিশেষ কোনও সিজন হয় না। হ্যাঁ, ভরা বর্ষায় পাহাড়ি রাস্তা বিপজ্জনক। সেই সময়টায় পাহাড়ে রাইড এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। তবে বর্ষার শুরুতে মনসুন রাইড হিসেবে পাহাড় অত্যন্ত মোহময়ী। সম্প্রতি ইস্ট সিকিম রাইড সেরে আমার অন্তত তেমনটাই মনে হয়েছে। ইস্ট সিকিম রাইডের সেই অভিজ্ঞতা নতুন রাইডার প্রজন্মের সঙ্গে ভাগ নেওয়ার ইচ্ছে থেকেই কলম ধরা। কলকাতা বা পার্শ্ববর্তী জেলাগুলি থেকে ইস্ট সিকিম রাইডে গেলে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার, কোন কোন জায়গায় ভিজিট করা ভালো, রাত্রিযাপনের সেরা অবস্থান এবং আরও কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য শেয়ার করলাম এখানে।
প্রথমত, কলকাতা থেকে সিকিম রাইডের জন্য আপনারা অনেক গ্রুপের সন্ধান পাবেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। একসঙ্গে ২০-৩০ জন রাইডারকে নিয়ে গ্রুপ ট্যুরের আয়োজন করে বেশ কয়েকটি সংস্থা। তবে কোনও গ্রুপের সঙ্গে লং-রাইডে গেলে নিজের ইচ্ছেমতো পাহাড় ঘুরে দেখা সম্ভব নাও হতে পারে। আপনাকে অন্যদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনুযায়ী চলতে হয় অনেক সময়। আবার সোলো রাইড বা একাকী লং-রাইড সব সময় নিরাপদ নাও হতে পারে। যদিও আসল মজা আসে তাতেই। আপনি নিজের ইচ্ছার মালিক। যতক্ষণ বাইক চালাতে ইচ্ছা করবে চালাবেন। যেখানে বিশ্রাম নিতে মন চাইবে নেবেন। যেখানে রাত্রিযাপনের ইচ্ছা হবে, থাকতে পারবেন সেখানে। পাহাড়ের কোলে যেখানে কয়েক ঘণ্টা হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করবে, চুপচাপ পড়ে থাকতে পারবেন। কেউ তাড়া দেবে না আপনাকে। তবে বাইকের যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা ছোটখাটো দুর্ঘটনার সময় আপনাকে তড়িঘড়ি সাহায্য করার মতো কেউ পাশে থাকা জরুরি। তাই আমার পরামর্শ এই যে, ২-৩ জন রাইডারের ছোট গ্রুপে ইস্ট সিকিম ট্যুরে যাওয়া তুলনায় ভালো বিকল্প হবে।
ইস্ট সিকিম রাইডে গেলে আপনাকে সবার আগে পৌঁছতে হবে গ্যাংটক। সেটিই সব থেকে সুবিধাজনক। কলকাতা থেকে গ্যাংটকের দূরত্ব কমবেশি ৭০০ কিলোমিটার। যদি ওভার-নাইট রাইড করার মানসিকতা থাকে, তাহলে মাঝে কোথাও হোটেল ভাড়া করে লম্বা বিরতি নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তবে লং-রাইডাররা সচরাচর একটা সাধারণ নিয়ম মেনে চলেন। ভোরের আলো ফোটার পরে যাত্রা শুরু এবং দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগে যাত্রা শেষ করা। যদি কলকাতা থেকে ভোর ভোর বাইক নিয়ে রওনা দেন, তবে শিলিগুড়িতে একটা রাত কাটিয়ে পরের দিন সকালে গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে পারেন। শিলিগুড়িতে এমন বহু হোটেল রয়েছে, যেখানে ৭০০ থেকে ১০০০ টাকায় আপনারা রুম পেয়ে যাবেন রাত্রিযাপনের জন্য। কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলি থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব কম-বেশি ৬০০ কিলোমিটার। শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকের দূরত্ব ১০০ কিলোমিটারের একটু বেশি।
দ্বিতীয় দিনে গ্যাংটকে পৌঁছে প্রয়োজনীয় পারমিট বানিয়ে নিতে হবে আপনাকে। ইস্ট সিকিমের পুরো সার্কিটের জন্য একটি পারমিট, যেটি সাদা কাগজে প্রিন্ট করে দেওয়া হয় এবং ইন্দো-চিন সীমান্ত নাথুলা পাসের জন্য আলাদা পারমিট, যেটি সাধারণত হলুদ কাগজে প্রিন্ট করা থাকে। আপনি তৃতীয় দিনে গ্যাংটক থেকে যাত্রা শুরু করবেন ইস্ট সিকিমের জন্য এবং মাঝে কোথাও সেই রাত্রি কাটিয়ে চতুর্থ দিনে পদমচেন-রংপো হয়ে শিলিগুড়ির দিকে রওনা হতে পারেন এবং তার পরের দিন সেখান থেকে কলকাতায় ফেরার রাস্তা ধরতে পারেন।
ইস্ট সিকিমে কোন কোন জায়গা ঘুরে দেখবেন
গ্যাংটক থেকে রওনা দেওয়ার পরে তিন কিলোমিটার এগিয়েই আপনাকে থার্ডমাইল চেকপোস্টে প্রথমবার পারমিট দেখাতে হবে। এই থার্ডমাইল চেকপোস্ট থেকে একটি রাস্তা সিকিমের হনুমান টকের দিকে উঠে যাচ্ছে এবং একটি রাস্তা তুলনায় নীচের দিকে মোড় নিচ্ছে নাথুলার উদ্দেশ্যে। আপনি সেই রাস্তা ধরে ২০ কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই পেয়ে যাবেন কাঞ্চনজঙ্ঘা ভিউ পয়েন্ট। আকাশ পরিস্কার থাকলে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দেখা যায় দুর্দান্ত। তবে জুনের পর থেকে সিকিমের আকাশে মেঘের আনাগোনা এতটাই বেশি থাকে যে, বর্ষার সময়ে নীচের উপত্যকাও ভালো করে দেখা যায় না এখান থেকে।
আরও ৮ কিলোমিটার সামনে এগলে আপনারা পাবেন মন্দাকিনী জলপ্রপাত। তার ঠিক ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছাঙ্গু লেক, যা ইস্ট সিকিমের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। ছাঙ্গু থেকে নাথুলা পাসের দূরত্ব ১৭ কিলোমিটার। নাথুলার কয়েক কিলোমিটার আগে আপনাকে দ্বিতীয়বার পারমিট দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে জেনে রাখা ভালো যে, আপনারা এই জায়গায় কোনও অ্যাকশন ক্যামেরা অন করে বাইক চালাতে পারবেন না। ইস্ট সিকিম রাইডের প্রধান আকর্ষণ নাথুলার ইন্দো-চিন সীমান্ত দেখে আসার পরে ৫ কিলোমিটার পিছনে এলে আপনারা পাবেন শেরথাং ওয়ার মেমোরিয়াল।
সেখান থেকে হাঙ্গু লেককে পাশে ফেলে আরও তিন কিলোমিটার সামনে এগোলে আপনারা পৌঁছে যাবেন নিউ বাবা মন্দির অর্থাৎ বাবা হরভজন সিং মেমোরিয়াল টেম্পল। তার পর আপনাদের গন্তব্য চার কিলোমিটার দূরের কুপুপ লেক, যা এলিফ্যান্ট লেক নামেও খ্যাত। কুপুপ থেকে কমবেশি ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওল্ড বাবা মন্দির। এই ওল্ড বাবা মন্দির থেকে নাথাং ভ্যালি যাবার ২টি রাস্তা রয়েছে। এক কিলোমিটার পিছনে এসে অফ-রোডিং করে ৫ কিলোমিটার দূরের নাথাং ভ্যালিতে পৌঁছনো যায়। আবার ওল্ড বাবা মন্দির টপকে সোজা ১১ কিলোমিটার গেলে লক্ষণচক হয়ে যাওয়া যায় নাথাং ভ্যালি। এই রাস্তাটি তুলনায় ভালো। তবে নাথাং ভ্যালির ছোট্ট গ্রামে ঢুকতে হলে কয়েক কিলোমিটার খারাপ রাস্তা আপনাকে পেরোতেই হবে। আপনারা এই নাথাং ভ্যালিতেই রাত্রিযাপন করতে পারেন। অনেকে জুলুকে গিয়ে নাইট স্টে করার কথা বিবেচনা করেন। তবে বর্ষার সময় আমার ব্যক্তিগত পরামর্শ, নাথাং ভ্যালিতে রাত কাটানোই সব থেকে ভালো। ছোট্ট গ্রামের মনমুগ্ধকর পরিবেশ আপনাকে পরম প্রশান্তি এনে দেবে। মোবাইল নেটওয়ার্ক না পেলেও এখানে হোমস্টে পেয়ে যাবেন বেশ কয়েকটা। থাকা-খাওয়ার মাথাপিছু খরচ ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা।
নাথাং ভ্যালি থেকে ভোর ভোর বেরোলে থাম্বি ভিউ পয়েন্ট থেকে দুর্দান্ত সূর্যোদয় দেখা যায়। যদিও বর্ষার সময়, সেই সম্ভাবনা নিতান্ত কম। তার পরেই আসে জুলুকের বিখ্যাত জিগজ্যাগ ভিউ। আকাশের মুখ ভার না থাকলে ভাসতে থাকা মেঘের উপর দিয়ে মাথা তুলে থাকা পাহাড় চূড়া ও ঝকঝকে সূর্যের এক অপরূপ দৃশ্য দেখা যায় জুলুকের এই সিল্করুটে।
জুলুকেও বেশ কিছু হোমস্টে রয়েছে। চাইলে নাথাং ভ্যালির পরিবর্তে এখানেও আপনারা রাত্রিযাপন করতে পারেন। কিছুটা এগিয়ে আপনারা পেয়ে যাবেন ইকো-নেচার পার্ক। সেখান থেকে পদমচেন হয়ে ১৩ কিলোমিটার এগোলে কিউখোলা জলপ্রপাত পাবেন, যা ইস্ট সিকিম রাইডের শেষ দর্শনীয় স্থান। এই কিউখোলা থেকে রংলি-রংপো হয়ে শিলিগুড়ি যাওয়া যায়। আবার লাভা হয়েও ঘুরপথে ফেরা যায় শিলিগুড়িতে। রংলি থেকে লাভা হয়ে শিলিগুড়ির দূরত্ব কমবেশি ১৫৫ কিলোমিটার। রংপো হয়ে শিলিগুড়ি ফিরতে হলে আপানাকে অতিক্রম করতে হবে কমবেশি ১০০ কিলোমিটার। লাভার রাস্তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য তুলনায় মনমুগ্ধকর।
এক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যে, ইস্ট সিকিমের ক্ষেত্রে জুলুকের পর থেকে কিউখোলা পর্যন্ত রাস্তা একজন রাইডারের কাছে সব থেকে চ্যালেঞ্জিং হবে। এই মুহূর্তে জায়গায় জায়গায় রাস্তা অত্যন্ত খারাপ। যদিও রাস্তা তৈরির কাজ চলছে। তবে খুব দ্রুত রাস্তা মসৃণ হয়ে যাবে, এমনটা ভাবা বোকামি হবে।
কলকাতা থেকে ইস্ট সিকিম রাইডে আপনাকে অতিক্রম করতে হবে কম-বেশি ১৬০০ কিলোমিটার। ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকায় বাইকের পিছনে একজন পিলিয়নকে সঙ্গে নিয়ে অনায়াসে ঘুরে আসতে পারবেন ইস্ট সিকিম থেকে। তাহলে অকারণ দেরি কেন? আবহাওয়া সম্পর্কে একটু খোঁজ-খবর নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন ইস্ট সিকিমের উদ্দেশ্যে। সারা জীবনের স্মৃতি হয়ে থাকবে এই অভিজ্ঞতা।
রাইডিং গিয়ার কতটা জরুরি এবং কী কী নিরাপত্তা সরঞ্জাম দরকার হয়
হ্যাঁ, সেফটি ফার্স্ট। শুধু লং-রাইডের ক্ষেত্রেই নয়, বরং সিটি-রাইডেও নিরাপত্তার বিষয়টা মাথায় রাখা জরুরি। আপনার ফার্স্টপার্টি বিমা আপনাকে আর্থিকভাবে কতটা সহায়তা করবে, সেকথা না ভেবে বিমার টাকার প্রয়োজন যাতে না হয়, সেটা সুনিশ্চিত করাই বুদ্ধিমানের কাজ। সিটি-রাইডে আমরা গ্লাভস ও রাইডিং সু-এর কথা অতটা বিবেচনা করি না। শুধুমাত্র একটা হেলমেটই যথেষ্ট মনে হয় আমাদের। তাও আবার যেমন তেমন হাফ হেলমেট নিয়েই রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি আমরা অনেকেই।
লং-রাইডের ক্ষেত্রে এমন গাফিলতি একেবারেই চলবে না। প্রপার রাইডিং গিয়ারের কমপ্লিট সেট ব্যয়বহুল। পাঁচ থেকে সাত হাজারের কমে ভালো রাইডিং জ্যাকেট মেলে না। রাইডিং প্যান্টের জন্য খরচ করতে হয় প্রায় সমপরিমাণ অর্থ। সাড়ে তিন হাজারের কমে ভালো রাইডিং বুট পাওয়া যায় না। হাজার টাকার নীচে ভালো মানের গ্লাভস পাওয়া মুশকিল। লং-রাইডে যেমন তেমন হাফ হেলমেট মোটেও চলবে না। সঠিক মাপের ফুল হেলমেট ব্যবহার করা অনিবার্য।
বার্ডস আই ভিউ (ছবি সৌজন্যে অভিষেক কোলে)
নতুন রাইডারদের ক্ষেত্রে একসঙ্গে এত টাকা ব্যয় করা একটু কঠিন। তার মানে এই নয় যে, কমপ্লিট রাইডিং গিয়ার ছাড়া লং-রাইডে যাওয়া যায় না। জ্যাকেট না হলেও চলবে, অন্তত এলবো-গার্ড ব্যবহার করা উচিত। আরামদায়ক কোনো মোটা প্যান্টের সঙ্গে নি-গার্ড ব্যবহার করলে নিরাপত্তা অনেকটাই সুনিশ্চিত করা যায়। গ্লাভস, হেলমেট আর বুট, এগুলো নিয়ে আপস না করাই ভালো।
শুধু বর্ষাতেই নয়, পাহাড়ে যখন তখন বৃষ্টি হয়। বিশেষ করে সিকিম রাইডে গেলে আপনাকে রেইন-লাইনার সঙ্গে রাখতেই হবে। জুতো যদি ওয়াটারপ্রুফ না হয়, সেক্ষেত্রে জল আটকাতে জুতোর বাড়তি কভার ব্যবহার করা উচিত। পাহাড়ে যত উপরে উঠবেন, উষ্ণতা ততই কমতে থাকবে। তাই জুতো ও মোজা যদি ভিজে থাকে, কষ্টের শেষ থাকবে না। ঠিক এই কারণেই হ্যান্ড গ্লাভস ওয়াটারপ্রুফ হওয়া দরকার। যদি উইন্টার-লাইনার না থাকে, তাহলে জ্যাকেটের নীচে থার্মাল ব্যবহার করে ঠান্ডা হাওয়া আটকানো যায়। হেলমেটের নীচে মাথায় বালাক্লাভা ব্যবহার করাটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
শুধু রাইডারের নয়, পিলিয়নের নিরাপত্তার বিষয়টাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এলবো ও নি-গার্ডের পাশাপাশি ভালো জুতো এবং ফুল হেলমেট চাই-ই-চাই। সেফটি গিয়ার একজন রাইডারকে অনেকটা নিশ্চিন্ত ও আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে। পাহাড়ে বাইক চালানোর জন্য স্কিল ছাড়াও আত্মবিশ্বাসের দরকার হয়।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য যা না জানলেই নয়
প্রথমত, গ্যাংটক পর্যন্ত আপনি যে কোনও বাইক নিয়ে পৌঁছে যেতে পারেন। তবে নর্থ ও ইস্ট সিকিমে রাইড করার জন্য আপনাকে পারমিশন করাতে হবে গ্যাংটকেই। এক্ষেত্রে আপনার জেনে রাখা দরকার যে, ১৫০ সিসির নীচের কোনও বাইক নিয়ে নর্থ ও ইস্ট সিকিমে রাইড করার অনুমতি দেওয়া হয় না। কোনও রকম স্কুটি নিয়ে আপনি নর্থ ও ইস্ট সিকিমে রাইড করতে পারবেন না। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বাইকটি রাইডার অথবা পিলিয়নের নামে হতে হবে। অথরাইজেশন লেটার থাকলেও কোনও বন্ধুর বাইক নিয়ে আপনি নর্থ বা ইস্ট সিকিমে ভ্রমণ করতে পারবেন না। বাবা অথবা দাদার নামে কেনা বাইক নিয়ে রাইড করতে গেলেও আপনাকে সমস্যায় পড়তে হতে পারে। এক্ষেত্রে অথরাইজেশন লেটার দেখিয়েও যে আপনি পারমিশন পাবেন, তা ১০০ শতাংশ নিশ্চিত নয়।
সঙ্গে রাখবেন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, রাইডার ও পিলিয়নের ভোটার আইডি। আধার কার্ড সব জায়গায় গ্রাহ্য হয় না। বাইকের পলিউশন সার্টিফিকেট ও বীমার কাগজপত্র থাকাও একান্ত জরুরী। আর সঙ্গে রাখবেন কয়েক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
যাঁরা ইস্ট সিকিমে রাইড করতে চান, জেনে রাখা দরকার যে, সোমবার নাথুলা পাস বন্ধ থাকে। ইস্ট সিকিম রাইডের প্রধান গন্তব্যই হল নাথুলা। সুতরাং, সোমবার দিনটি ইস্ট সিকিম রাইডের ক্ষেত্রে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
অনেকে গ্যাংটক থেকে বাইক ভাড়া নিয়ে ইস্ট অথবা নর্থ সিকিম রাইড করার কথা ভাবেন। গ্যাংটকেই বাইক ভাড়া পেয়ে যাবেন। সেক্ষেত্রে গাড়ির কাগজপত্র সঙ্গে রাখা আপনার দায় নয়। এজেন্সিগুলির অথরাইজেশন লেটার সঙ্গে রাখলেই হবে। হোটেলের রিসেপশন, অথবা বাইক রেন্টাল সেন্টার, কিংবা স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সিগুলির কাছ থেকে আপনি ইস্ট ও নর্থ সিকিম রাইডের পারমিট করাতে পারবেন সহজেই। ইস্ট সিকিমের ক্ষেত্রে বাইক, রাইডার ও পিলিয়নের পারমিট বানানোর জন্য খরচ হয় হাজার থেকে দু হাজার টাকার মধ্যে।
ইস্ট সিকিমের কার্যত পুরো সার্কিটটাতেই আপনি মোবাইল নেটওয়ার্ক পাবেন কদাচিৎ। তাই আপনার ফোনের নেভিগেশন যথাযথ কাজ করা মুশকিল। এক্ষেত্রে অফলাইন ম্যাপ ডাউনলোড করে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। জিও সিম ব্যবহারকারীরা সমস্যায় পড়বেন বেশি। কোথাও কোথাও এয়ারটেল ও বিএসএনএল-এর নেটওয়ার্ক মেলে সমান্য। নেটওয়ার্কের সমস্যার জন্যই অনলাইন পেমেন্টের উপর ভরসা করা বোকামি হবে। তাই সঙ্গে রাখবেন নগদ টাকা।
ইস্ট সিকিমের পুরো সার্কিটটি ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে। তাই আপনার যত সিসিরই বাইক হোক না কেন, ট্যাঙ্ক ফুল করিয়ে নিলে অনায়াসে কভার করতে পারবেন এই ২০০ কিলোমিটার। সুতরাং আপনি গ্যাংটক থেকে বাইকের পেট্রল ট্যাঙ্ক ফুল করে নিলেই চলবে। আলাদা করে জ্যারিকেনে পেট্রোল বয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সঙ্গে জলের বোতল রাখবেন অবশ্যই। আর মনে করে সঙ্গে নেবেন বাইকের ডুপ্লিকেট চাবি।
ছাঙ্গু লেকের পর থেকে আপনি রাস্তার ধারে ছোটখাটো রেস্টুরেন্ট দেখতে পাবেন না তেমন। তাই ব্রেকফাস্ট ও লাঞ্চ সেরে নেবেন নাথুলায় পৌঁছনোর আগেই। অবশ্য বাবা মন্দিরে ভারতীয় সেনার ক্যান্টিন রয়েছে। সেখানে আপনারা মধ্যাহ্নভোজ সারতে পারেন। খাবার-দাবার বলতে চা, মোমো, ম্যাগি, থুকপা এইসবের উপরেই নির্ভর করতে হবে। যতক্ষণ না হোমস্টেতে পৌঁছচ্ছেন, ভাত, রুটি এইসব পাবেন না কোথাও। ইস্ট সিকিম রাইডের সব থেকে ইতিবাচক দিক হলো, পথে কোনও রকম সমস্যায় পড়লে সেনাকর্মীরা আপনার সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবেন সর্বদা।
বাইকের পরিচর্যার জন্য ন্যূনতম কী কী সঙ্গে রাখবেন
মনে রাখবেন, লং-রাইডে আপনার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য যেমন ভালো থাকা দরকার, ঠিক তেমনই আপনার বাইকের স্বাস্থ্যও সঠিক থাকা একান্ত জরুরি। বাইকে কোনও সমস্যা দেখা দিলে সমতলে তা ঠিক করিয়ে নেওয়ার মতো সার্ভিস সেন্টার অনেক পেয়ে যাবেন। কিন্তু পাহাড়ে যেখানে লোক বসতিই বিরল, সেখানে বাইকে কোনও সমস্যা দেখা দিলে তা তড়িঘড়ি সারিয়ে নেওয়ার মতো পরিস্থিতি নাও থাকতে পারে। সিকিম রাইডের ক্ষেত্রে আপনি গ্যাংটকে বাইকের সার্ভিস সেন্টার পাবেন অনেক। কিন্তু যত উপরে উঠবেন, আপনার ভরসা আপনার বাইক আর আপনার বাইকের ভরসা আপনি।
মাথায় রাখবেন, বাইকের ফ্রন্ট ও রিয়ার টায়ারের এয়ার প্রেসার যেন ঠিক থাকে। টিউবলেস টায়ার হলে পাংচার কিট সঙ্গে রাখবেন। যাতে টায়ার পাংচার হলে নিজেই সারিয়ে নিতে পারেন। সঙ্গে রাখবেন টায়ার ইনফ্লেটার অর্থাৎ হাওয়া দেওয়ার মেশিন। দেড় থেকে দু'হাজার টাকায় ডিজিটাল টায়ার ইনফ্লেটার পাওয়া যায় অনেক। শুধু হাওয়া দেওয়ার ক্ষেত্রেই নয়, সময়ে সময়ে টায়ারের এয়ার প্রেসার যাচাই করার ক্ষেত্রেও এই মেশিন আপনার কাজে লাগবে।
লং-রাইডে বাইকের চেইন ঠিক থাকা অত্যন্ত আবশ্যক। বিশেষ করে বর্ষার সময়ে চেইনের বাড়তি পরিচর্যা দরকার হয়। চেষ্টা করবেন একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের পরেই চেইন পরিষ্কার করে নেওয়ার। চেইন ক্লিন করার পরেই তা লুব্রিকেটও করতে হবে অবধারিত ভাবে। তাই লং-রাইডের ক্ষেত্রে সঙ্গে রাখবেন চেইন ক্লিনার ও চেইন লুব্রিকেটর। বাকি টুকিটাকি নাট-বোল্ট অ্যাডজাস্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাইকের সঙ্গেই থাকে। কয়েকটি ক্লাচ কেবল সঙ্গে রাখতে পারেন। বাইকের কভার সঙ্গে নিতে পারলে ভালো হয়। কেননা পাহাড়ি অঞ্চলে রাত্রিযাপন করলে সব হোমস্টেতে গাড়ি রাখার মতো ছাউনি থাকে না।
ফার্স্ট এইডের জন্য কী কী সঙ্গে রাখবেন
আপনি সিঙ্গেল রাইড করবেন নাকি পিলিয়ন-সহ, সেইমতো আপনার লাগেজ ব্যাগে জামা কাপড় থাকবে এটা স্বাভাবিক। তবে সঙ্গে রাখতে ভুলবেন না ফার্স্ট এইড কিট। পাহাড়ে বাইক চালানো মানে আপনি মসৃণ রাস্তা পাবেন না সব সময়। অফরোডিং-এ ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়াটা নিতান্তই স্বাভাবিক বিষয়। তাই কাটা-ছড়ার জন্য অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড ও ব্যান্ড-এইড সঙ্গে রাখা দরকার। জ্বর-সর্দি, পেট খারাপের ওষুধ, মাথা ও গা ব্যাথার ওষুধ, এগুলি সঙ্গে নেওয়া দরকার। অফবিট কোনও জায়গায় থাকা খাওয়ার জন্য হোমস্টে পেয়ে যাবেন অনায়াসে। তবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল এমনকি ওষুধের দোকানও খুঁজে পাওয়া ভার হবে। সঙ্গে রাখতে পারেন একটা অক্সিজেনের ক্যান। ৫০০ টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন অনায়াসে। উচ্চতা নিয়ে যাদের সমস্যা আছে, পপকর্ন, চকলেট ও ন্যাপথলিন সঙ্গে রাখতে পারেন তাঁরা। এগুলি শ্বাসকষ্ট কমাতে সাহায্য করে বলেই সবার বিশ্বাস।