আগে নীল বলে কোনও রংই ছিল না, সমুদ্রের জলও ছিল ‘ওয়াইনের মতো লাল’! কোথা থেকে এল এই নীল? জানলে চমকে যাবেন
প্রাচীন কালে তো বটেই কয়েক শতক আগেও নীল বলে কোনও রং ছিল না। তাহলে এই রং এল কোথা থেকে? হালে বিজ্ঞানীরা রঙের ইতিহাস খুঁজতে গিয়ে বিস্মিত হয়েছেন।
আকাশ নীল, সমুদ্র নীল—আমাদের চোখে আজ নীল রঙের অস্তিত্ব এতটাই স্বাভাবিক যে কল্পনা করা কঠিন এক সময় মানুষের কাছে এই রঙের কোনও নাম বা অস্তিত্বই ছিল না। বিজ্ঞানী, নৃতাত্ত্বিক এবং ভাষাবিদদের মতে, কয়েক শতাব্দী আগে মানুষের চেতনায় নীল রঙের কোনও স্থান ছিল না। এমনকি হোমারের 'ওডিসি' থেকে শুরু করে প্রাচীন ভারতের বেদ বা চীনা লোকগাথা—কোথাও নীল রঙের উল্লেখ পাওয়া যায় না।

আমরা আজ যে নীল রঙকে এত ভালোবাসি, প্রাচীন মানুষের কাছে তা ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত। উনবিংশ শতাব্দীতে উইলিয়াম গ্ল্যাডস্টোন যখন হোমারের 'ওডিসি' বিশ্লেষণ করেন, তিনি লক্ষ্য করেন যে সমুদ্রকে সেখানে 'সুরার মতো গাঢ় লাল' বলা হয়েছে, কিন্তু কোথাও 'নীল' শব্দটির ব্যবহার নেই। পরবর্তীতে ফিলোলজিস্ট লাজারাস গিগার বিভিন্ন প্রাচীন ভাষা (সংস্কৃত, চীনা, হিব্রু, আরবি) পরীক্ষা করে দেখেন যে, মানুষের ভাষার বিবর্তনে নীল রঙের নাম এসেছে সবার শেষে।
কেন নীল রং ছিল অদৃশ্য?
বিজ্ঞানীদের মতে, নীল রঙ প্রকৃতিতে আসলে খুব একটা সহজলভ্য নয়। আকাশে নীল রঙ থাকলেও তা ধরা বা ছোঁয়া যায় না। নীল ফুল বা নীল রঙের প্রাণীর সংখ্যাও অত্যন্ত নগণ্য। আদিম মানুষের কাছে রঙের গুরুত্ব ছিল মূলত টিকে থাকার প্রয়োজনে। লাল ছিল রক্তের রঙ (বিপদ বা শিকার), কালো ও সাদা ছিল আলো-আঁধারির প্রতীক। যেহেতু নীল রঙ জীবনধারণের জন্য সরাসরি কোনো সংকেত বহন করত না, তাই মানুষের মস্তিষ্ক এবং ভাষা একে আলাদা রঙ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন বোধ করেনি।
রঙের বিবর্তনের ক্রম
লাজারাস গিগার লক্ষ্য করেন যে, প্রায় সব ভাষাতেই রঙের নামের একটি নির্দিষ্ট ক্রম রয়েছে:
১. কালো ও সাদা (আলো ও অন্ধকার)
২. লাল (রক্ত ও জীবন)
৩. হলুদ ও সবুজ (খাদ্য ও প্রকৃতি)
৪. নীল (সবার শেষে আসা রঙ)
আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রাচীন গুহাচিত্রেও লাল, কালো বা গেরুয়া রঙের ছড়াছড়ি থাকলেও নীল রঙের ব্যবহার ছিল না বললেই চলে।
নীল রঙের আবিষ্কার ও মিশরীয়দের অবদান
ইতিহাসে প্রথম নীল রঙের ব্যবহার এবং এর নাম তৈরির কৃতিত্ব প্রাচীন মিশরীয়দের। প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে তারা 'ল্যাপিস লাজুলি' (Lapis Lazuli) নামক একটি মূল্যবান পাথর থেকে নীল রঞ্জক বা পিগমেন্ট তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করে। মিশরীয়রা নীল রঙকে আভিজাত্য এবং পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে গণ্য করত। এরপর ধীরে ধীরে বাণিজ্য ও শিল্পের মাধ্যমে এই রঙ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নীল রঙের ব্যবহার আসতে আরও কয়েক শতাব্দী সময় লেগেছিল।

চোখ বনাম মস্তিষ্ক
বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রাচীন মানুষের চোখের গঠন আজকের মতোই ছিল, অর্থাৎ তারা নীল আলো দেখতে পেত। কিন্তু তাদের 'মস্তিষ্ক' সেই রঙকে আলাদা কোনো সত্তা হিসেবে চিনত না। অনেকটা এমন—যতক্ষণ না আমরা কোনো কিছুর নাম দিচ্ছি, ততক্ষণ আমাদের সচেতন মন তাকে আলাদাভাবে গ্রহণ করে না। নামহীন হওয়ার কারণে নীল রঙটি তখন সবুজ বা কালোর একটি অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতো।
শেষ কথা
নীল রঙের ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, আমাদের চারপাশের জগত কেবল দেখার বিষয় নয়, এটি বোঝার ও সংজ্ঞায়িত করার বিষয়। আজ নীল রঙ আমাদের প্রশান্তি ও আস্থার প্রতীক, কিন্তু একসময় এটি ছিল কেবল একটি অনাবিষ্কৃত বিস্ময়। শিল্পের বিবর্তন এবং ভাষার জয়যাত্রাই আজ আমাদের চোখের সামনে আকাশ ও সমুদ্রের এই মায়াবী রঙকে মূর্ত করে তুলেছে।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper











