আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন থেকে পতনের ইতিহাস! ‘ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস’ কেন বন্ধ হয়ে গেল?

Indian Airlines history and origin: আজকের ২০২৬ সালের দাঁড়িয়েও ভারতের এভিয়েশন সেক্টরের এই সোনালী অধ্যায়ের গল্প সমান রোমাঞ্চকর। কীভাবে এই বিমান সংস্থার সূচনা হয়েছিল, এর সাথে জড়িয়ে থাকা কিছু মজার ও অজানা গল্প এবং কেনই বা এটি বন্ধ হয়ে গেল—তা জেনে নিন।

Published on: Jul 7, 2026, 19:35:31 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

Indian Airlines history and origin: ভারতের বিমান চলাচলের ইতিহাসের কথা উঠলেই যে নামটি সবার আগে স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে, তা হলো ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস (Indian Airlines)। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই বিমান সংস্থাটি কয়েক দশক ধরে ভারতের আকাশপথের অবিসংবাদিত রাজা ছিল। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার সাথে সংযুক্তিকরণের মাধ্যমে এর পথচলা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও, ভারতীয়দের আবেগের সাথে এর নাম জড়িয়ে রয়েছে আজও।

আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন থেকে পতনের ইতিহাস! ‘ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস’ কেন বন্ধ হয়ে গেল?
আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন থেকে পতনের ইতিহাস! ‘ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস’ কেন বন্ধ হয়ে গেল?

আজকের ২০২৬ সালের দাঁড়িয়েও ভারতের এভিয়েশন সেক্টরের এই সোনালী অধ্যায়ের গল্প সমান রোমাঞ্চকর। কীভাবে এই বিমান সংস্থার সূচনা হয়েছিল, এর সাথে জড়িয়ে থাকা কিছু মজার ও অজানা গল্প এবং কেনই বা এটি বন্ধ হয়ে গেল—তা জেনে নিন।

কীভাবে হয়েছিল এর সূচনা?

ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের জন্মের ইতিহাস ভারতের বিমান পরিবহন জাতীয়করণের সাথে সরাসরি যুক্ত। ১৯৫৩ সালে ভারত সরকার একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। তৎকালীন সময়ে ভারতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আটটি অভ্যন্তরীণ বেসরকারি বিমান সংস্থাকে (যার মধ্যে ছিল ডেকান এয়ারওয়েজ, এয়ারওয়েজ ইন্ডিয়া, ভারত এয়ারওয়েজ, হিমালয়ান এভিয়েশন, কলিঙ্গ এয়ারলাইনস, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল এয়ারওয়েজ, এয়ার ইন্ডিয়া এবং এয়ার সার্ভিসেস অফ ইন্ডিয়া) একত্রিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৯৫৩ সালের ২৮ মে ‘এভিয়েশন কর্পোরেশন অ্যাক্ট’ পাস করার মাধ্যমে দুটি নতুন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থা গঠিত হয়। আন্তর্জাতিক রুটের জন্য তৈরি হয় ‘এয়ার ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল’ এবং দেশের ভেতরের অভ্যন্তরীণ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর রুটের দায়িত্ব পায় ‘ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস কর্পোরেশন’ (IAC)। ১৯৫৩ সালের ১ আগস্ট থেকে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস আনুষ্ঠানিকভাবে তার বাণিজ্যিক উড়ান শুরু করে। শুরুতে এদের বিমান বহরে ছিল মূলত ডগলাস ডিসি-৩ (Douglas DC-3) ‘ডাকোটা’ বিমান।

ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের সঙ্গে জড়িত কিছু মজার ও রোমাঞ্চকর গল্প

ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের ৫ দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে জড়িয়ে রয়েছে অনেক স্মরণীয় ও মজার ঘটনা:

  • রাজকীয় ট্রাভেলার ও ফ্যামিলি মেম্বার: সেই যুগে বিমানে চড়া সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে ছিল। ফলে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের নিয়মিত যাত্রী ছিলেন দেশের নামী রাজনীতিবিদ, বলিউড তারকা এবং শিল্পপতিরা। পাইলট ও এয়ার হোস্টেসদের সাথে যাত্রীদের এতটাই মধুর ও পারিবারিক সম্পর্ক তৈরি হতো যে, অনেক সময় মাঝআকাশে পাইলট ককপিট থেকে বেরিয়ে এসে চেনা যাত্রীদের সাথে আড্ডা দিতেন এবং রাজনীতির খবর নিতেন!
  • টাটা-র সেই ঐতিহাসিক প্রথম ফ্লাইট: ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস গঠনের ঠিক ৩০ বছর পূর্তিতে অর্থাৎ ১৯৮৩ সালের ১৫ অক্টোবর, ভারতের বিমান চালনার জনক জেআরডি টাটা (JRD Tata) ১৯৩২ সালের তাঁর সেই ঐতিহাসিক করাচি-আহমেদাবাদ-বোম্বে রুটের উড়ানের স্মৃতি ফিরিয়ে আনেন। তিনি একটি প্রাচীন ‘চিতা মথ’ বিমান চালিয়ে বোম্বেতে অবতরণ করেন। এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত উদযাপনে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস বিশেষ এয়ার শো এবং গ্রাউন্ড ক্রুদের জন্য ভিন্টেজ পোশাকের আয়োজন করেছিল, যা সেই সময় বেশ শোরগোল ফেলে দেয়।
  • ‘মহারাজা’ বনাম ‘কমন ম্যান’: এয়ার ইন্ডিয়ার প্রতীক যেমন ছিল রাজকীয় ‘মহারাজা’, ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস নিজেকে তুলে ধরত ভারতের সাধারণ মানুষের বাহন হিসেবে। এর ফলে দুটি সরকারি সংস্থার কর্মীদের মধ্যে এক ধরণের মিষ্টি রেষারেষি বা রাইভালরি চলত। এয়ার ইন্ডিয়ার কর্মীরা রসিকতা করে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসকে ‘ফ্লাইং বাস সার্ভিস’ বলতেন, কারণ এর বিমানগুলো দেশের ছোট ছোট শহরের প্রত্যন্ত রানওয়েতেও ল্যান্ড করত!
  • কিংবদন্তি ডকোটা বিমান এবং মহারাজা টেকঅফ: সূচনার সময়ে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস উত্তরাধিকার সূত্রে ৯৯টি বিমানের একটি বিশাল বহর পেয়েছিল, যার মধ্যে ৭৪টিই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের বিখ্যাত ‘ডকোটা’ (Douglas DC-3) বিমান। এই ডকোটা বিমানগুলো এতই মজবুত ছিল যে পাইলটরা মজা করে বলতেন, "এই বিমানগুলোকে আকাশ থেকে ফেলা হলেও এদের কিছু হবে না।"
  • পাইলট যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী: ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের সাথে জড়িয়ে রয়েছে ভারতের এক রাজনৈতিক ইতিহাস। ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী আশির দশকে এই ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসেরই একজন পেশাদার কমার্শিয়াল পাইলট ছিলেন। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি দীর্ঘদিন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই সংস্থার বিমান উড়িয়েছেন।
  • টাকার বদলে আনাজ আর মুরগি!: সত্তরের দশকে ভারতের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলের (বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলো) মানুষের কাছে বিমান ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। সেই সময়ে অনেক সাধারণ উপজাতি মানুষ বিমানের টিকিট কাটার জন্য বা বুকিং কাউন্টারে কাগজের টাকার বদলে ঘরের মুরগি, ডিম বা টাটকা আনাজ নিয়ে চলে আসতেন। সংস্থার কর্মকর্তারাও অনেক সময় নিয়ম শিথিল করে তাঁদের বিমানে জায়গা দিতেন!

কেন বন্ধ হয়ে গেল এই ঐতিহাসিক বিমান সংস্থা?

২০০৭ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের ডানা চিরতরে গুটিয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ ছিল:

১. খোলা আকাশের নীতি ও তীব্র প্রতিযোগিতা: ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারত সরকার বিমান চলাচলের ক্ষেত্রটি বেসরকারি সংস্থার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। বাজারে আসে জেট এয়ারওয়েজ, এয়ার সাহারা এবং পরবর্তীতে ইন্ডিগোর মতো সস্তার লো-কস্ট ক্যারিয়ার। এদের আধুনিক বিমান, নিখুঁত সময়ানুবর্তিতা এবং ঝকঝকে পরিষেবার সামনে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের আমলাতান্ত্রিক ও প্রাচীন ঢিমেতালে পরিষেবা টিকতে পারছিল না।

২. বিপুল আর্থিক ক্ষতি ও ঋণের বোঝা: সরকারি সংস্থা হওয়ার কারণে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসকে লাভ না হওয়া সত্ত্বেও দেশের প্রত্যন্ত এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রুটে বিমান চালাতে হতো। অতিরিক্ত কর্মী, জ্বালানির চড়া দাম এবং অব্যবস্থাপনার কারণে সংস্থাটি প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার লোকসান গুনতে শুরু করে।

৩. ২০০৭ সালের সেই একীভূতকরণ (Merger): লোকসানের হাত থেকে বাঁচতে এবং আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমান পরিষেবাকে এক ছাতার নিচে এনে খরচ কমাতে, ২০০৭ সালে ভারত সরকার ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসকে ‘এয়ার ইন্ডিয়া’র সাথে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়। একটি নতুন মাদার কোম্পানি ‘ন্যাশনাল এভিয়েশন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড’ (NACIL) গঠন করা হয় এবং ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের নাম বদলে এয়ার ইন্ডিয়া করে দেওয়া হয়। কিন্তু দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির সংস্থার এই মার্জার সফল হয়নি, উল্টে তা ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং ভারতের আকাশ থেকে ‘ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস’ নামটি চিরতরে হারিয়ে যায়।

ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনস আজ আর আকাশে ওড়ে না ঠিকই, তবে ভারতের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিল এই সংস্থাই। সাদা ও কমলা রঙের লোগো সম্বলিত সেই বিমানগুলোর স্মৃতি আজও প্রবীণ ভারতীয়দের মনে নস্টালজিয়া তৈরি করে।

  • Suman Roy
    ABOUT THE AUTHOR
    Suman Roy

    সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More