পরিবেশ আন্দোলনে নেতৃত্বে ভূমিকা বাড়ছে ভারতের তরুণ প্রজন্মের, আশার আলো দেখছে সারা বিশ্ব
উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ভারত এক অত্যন্ত জটিল পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। একদিকে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অন্যদিকে বিপুল জনসংখ্যা ও জনমিতিক কাঠামো (demographic structure)—সব মিলিয়ে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এখানে বহু গুণ বেশি।
জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর কেবল পরিবেশ সংক্রান্ত কোনও দূরবর্তী বিষয় নয়; এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নির্মম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা, তীব্র বায়ু দূষণ, পানীয় জলের সংকট এবং জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি—আজ বিশ্বের প্রায় সমস্ত সমাজকেই গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কা তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের। কারণ, আজ যে সমস্ত রাজনৈতিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তার মূল প্রভাব বহন করতে হবে তাদেরই ভবিষ্যৎ জীবনকে। ফলে পরিবেশ সুরক্ষা আজ আর কেবল বনাঞ্চল রক্ষা কিংবা দূষণ কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্য ও জীবিকার সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ভারত এক অত্যন্ত জটিল পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। একদিকে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অন্যদিকে বিপুল জনসংখ্যা ও জনমিতিক কাঠামো (demographic structure)—সব মিলিয়ে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এখানে বহু গুণ বেশি। সবচেয়ে বড় কথা, ভারতের যুবসমাজ জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সরাসরি প্রত্যক্ষ করছে। সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (CSE)-র সাম্প্রতিক তথ্য উদ্ধৃত করে ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক (University College Cork)-এর একটি নিবন্ধে জানানো হয়েছে, ভারতের প্রায় ৯৪ শতাংশ তরুণ বিশ্বাস করেন যে জলবায়ু পরিবর্তন তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি ৮৮ শতাংশ তরুণ নিজেদের চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছে, যা তাঁদের শিক্ষা, বিনোদন, কর্মক্ষমতা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।
এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতীয় তরুণরা কেবল পরিবেশগত পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন হচ্ছেন, তা-ই নয়; তাঁরা কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক-এর উক্ত নিবন্ধে যেমনটা বলা হয়েছে: ‘তাঁরা এই সংকটের নেহাত কোনও নিষ্ক্রিয় ভুক্তভোগী নয়, বরং তাঁরা পরিবর্তনের এক মহাশক্তিশালী অনুঘটক হয়ে উঠতে পারেন।’
জলবায়ু পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক অগ্রাধিকার
পরিবেশগত সংকট অত্যন্ত গুরুতর হওয়া সত্ত্বেও ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে জলবায়ু আন্দোলন কিন্তু অন্যান্য রাজনৈতিক আন্দোলনের মতো অতটা অগ্রাধিকার পায় না। এর প্রধান কারণ হলো, পরিবেশগত সমস্যাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, যেখানে সাধারণ ভোটাররা কর্মসংস্থান, অর্থ, খাদ্য, মৌলিক পরিকাঠামো কিংবা তাৎক্ষণিক সুযোগ-সুবিধার মতো স্বল্পমেয়াদী বিষয়গুলো নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকেন।
ভারতে পরিবেশগত সমস্যাগুলো কর্মসংস্থান ও জীবিকার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত হলেও, সেগুলোকে রাজনৈতিক মঞ্চে সরাসরি ‘পরিবেশগত সংকট’ হিসেবে তুলে ধরা হয় না। বিশুদ্ধ পানীয় জল, বায়ু দূষণ, জমির অধিকার, বনাঞ্চল রক্ষা কিংবা জনস্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু এগুলোকে আলাদা কোনো পরিবেশ আন্দোলনের অংশ হিসেবে না দেখে কল্যাণমূলক প্রকল্প, স্থানীয় উন্নয়ন কিংবা জীবিকার তাগিদ হিসেবেই দেখা হয়। ভারতীয় রাজনীতি সংক্রান্ত একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভোটারদের তাৎক্ষণিক লাভের মানসিকতার কারণেই পরিবেশগত ইস্যুগুলো নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে না।
এটি একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। কারণ পরিবেশের অবনমনকে রাজনীতি বা অর্থনৈতিক উন্নয়ন থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। দূষণ জনস্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে; চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া কৃষিক্ষেত্রকে ধ্বংস করে; তীব্র জলসংকট মানুষের জীবিকাকে বিপন্ন করে এবং পরিবেশের এই ক্ষয়ক্ষতির সবচেয়ে বড় শিকার হন আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষগুলোই।
বহু বিশেষজ্ঞ এই সমস্যাটিকে খুব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এই বলে যে, বায়ু দূষণ বা জলবায়ু পরিবর্তন সমস্যাটি যতই তীব্র হোক না কেন, তা নিজে থেকে কোনোদিন রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হবে না। এটিকে সচেতনভাবে রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপান্তরিত করতে হবে।
অতএব, আসল প্রশ্নটি এটি নয় যে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নাকি পরিবেশ—কোন্ দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত; আসল চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন প্রক্রিয়াকেই সম্পূর্ণ টেকসই বা সাস্টেইনেবল (Sustainable) করে তোলা। আর এই প্রক্রিয়াটিকে সম্ভব করে তুলছে তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ। তাঁরা তাঁদের নানা ধরনের প্রচেষ্টার মাধ্যমে উন্নয়ন ও পরিবেশের এই মেলবন্ধনকে স্পষ্ট করে তুলছে।
বৈশ্বিক যুব আন্দোলন থেকে ভারতের জলবায়ু সংগ্রাম
পরিবেশ আন্দোলনে যুবসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ কিন্তু নতুন কিছু নয়। ১৯৭০ সালে আয়োজিত প্রথম 'আর্থ ডে' (Earth Day)-র মাধ্যমে আধুনিক পরিবেশ আন্দোলন এক অভূতপূর্ব গতি পেয়েছিল, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রকৃতির ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিলেন। ধীরে ধীরে নানা পরিবেশবাদী সংস্থা আন্তর্জাতিক স্তরে তাদের প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেয় এবং এই আন্দোলনগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলার অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে।
তবে বর্তমানে জলবায়ু আন্দোলন এক সম্পূর্ণ নতুন রূপ ধারণ করেছে। আজকের তরুণ আন্দোলনকারীরা রাজপথের প্রতিবাদের সাথে সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন, আইনগত পদক্ষেপ (Litigation), ডিজিটাল অর্গানাইজিং এবং গণ-অবস্থানকে যুক্ত করেছেন। গ্রেটা থুনবার্গ এবং তাঁর 'ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার' (Fridays for Future) আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে এক তরুণীর একক প্রতিবাদ মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী তরুণদের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে 'এক্সটিঙ্কশন রেবেলিয়ন' (Extinction Rebellion)-এর মতো সংগঠনগুলো এই সংকটের জরুরি অবস্থাকে বোঝাতে আরও বেশি আক্রমণাত্মক প্রতিবাদের পথ বেছে নিয়েছে।
বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে গ্রেটা থুনবার্গের সেই বিখ্যাত বার্তাটি প্রজন্মগত এই বৈষম্যকে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল, যেখানে তিনি বলেছিলেন: "আপনারা মুখে বলেন যে সন্তানদের ভালোবাসেন, অথচ আপনারা তাদের থেকেই তাদের ভবিষ্যৎ চুরি করছেন।"
ভারতের তরুণ জলবায়ু কর্মীরাও এই বৈশ্বিক গতিকে নিজেদের স্থানীয় লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে মাটিতে নামিয়ে এনেছেন। ছাত্রসমাজ ও সাধারণ নাগরিকরা বায়ু দূষণ, বনাঞ্চল ধ্বংস, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জল সংকট, গণপরিবহন এবং জলবায়ু সংক্রান্ত ন্যায়বিচারের (Climate Justice) দাবিতে নানা অভিযানে সামিল হয়েছেন। ২০১৯ সালে 'ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার'-এর বৈশ্বিক ডাকে সাড়া দিয়ে ভারতের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ক্লাইমেট স্ট্রাইকে অংশ নেয়। অন্যদিকে রিধিমা পান্ডের মতো খুদে জলবায়ু কর্মীরা পরিবেশ রক্ষায় সরকারি নীতি রূপায়ণের দাবি জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।
এই স্থানীয় আন্দোলনগুলোর সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো, তারা বৈশ্বিক পরিবেশ সংকটকে সাধারণ মানুষের স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছে। উদাহরণস্বরূপ, দিল্লিতে বায়ু দূষণের বিরুদ্ধে তরুণদের আন্দোলনকে কেবল একটি পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে নয়, বরং স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের সংকট হিসেবেও সফলভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।
একজন তরুণ ভারতীয় শিক্ষার্থীর মতে, এই জরুরি অবস্থাটি এখন অত্যন্ত ব্যক্তিগত: "আমার মনে হয় আজকের তরুণরা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন, কারণ আমরা আমাদের চারপাশে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখতে পাচ্ছি।"
কীভাবে নতুন পরিবেশ আন্দোলন গড়ে তুলছে ভারতীয় যুবসমাজ?
ভারতে তরুণদের এই পরিবেশ আন্দোলন কেবল রাজপথের প্রতিবাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিভিন্ন অলাভজনক সংস্থা, স্কুল-কলেজ, স্থানীয় সম্প্রদায়, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে প্রতিদিন ডালপালা মেলছে।
২০০৮ সালে গঠিত 'ইন্ডিয়া ইউথ ক্লাইমেট নেটওয়ার্ক' (IYCN)-এর মতো প্রাচীন যুব সংগঠনগুলো এই আন্দোলনের একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছিল। তারা কর্মশালা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং 'ক্লাইমেট সৎসঙ্গ'-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে জলবায়ু সচেতনতা তৈরি করে। পাশাপাশি অন্যান্য কিছু নেটওয়ার্ক ভারতীয় তরুণদের আন্তর্জাতিক পরিবেশ মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত করতে সাহায্য করেছে।
আজকের এই আন্দোলনের গতি বাড়াতে প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম। স্মার্টফোন এবং সস্তা ইন্টারনেটের দৌলতে তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিবেশ সংক্রান্ত তথ্যের পৌঁছানো এবং আন্দোলন সংগঠিত করা অনেক সহজ হয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে তরুণরা স্থানীয় বা গ্রাসরুট লেভেলে সরাসরি কাজের দায়িত্ব নিচ্ছেন। বিভিন্ন যুব দল বর্জ্য পৃথকীকরণ, বৃক্ষরোপণ, জল সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, বায়ু দূষণ প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক ভাষায় জলবায়ু সচেতনতামূলক উপাদান তৈরিতে কাজ করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও এখন বড় আকারে পরিবেশ চর্চা হচ্ছে—পরিবেশ ক্লাব গঠন, ফিল্ড ওয়ার্ক এবং সোশ্যাল মিডিয়া সচেতনতামূলক প্রচারের মাধ্যমে তা পাঠ্যপুস্তকের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাস্তব সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এক তরুণ শিক্ষার্থী জানান: ‘আমার মনে হয় সোশ্যাল মিডিয়া পরিবেশের সমস্যাগুলোকে আমাদের প্রজন্মের সামনে অনেক বেশি দৃশ্যমান ও স্পষ্ট করে তুলেছে।’
তবে প্রযুক্তি নির্ভর এই আন্দোলনের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কেবল হ্যাশট্যাগ (Hashtags) বা পোস্টের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু তা কখনোই বাস্তব পদক্ষেপের বিকল্প হতে পারে না।
অনলাইন সচেতনতার বাইরে এসে কাজ করার ওপর জোর দিয়ে আরেক শিক্ষার্থী বলেন: ‘তরুণদের উচিত কেবল জলবায়ু নিয়ে অনলাইনে আলোচনা না করে বাস্তব পরিবেশমূলক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া।’ অতএব, ভারতীয় যুবসমাজের মূল চ্যালেঞ্জ হলো ডিজিটাল জগতের এই সচেতনতাকে বাস্তব সমাজসেবা, রাজনৈতিক চাপ এবং কার্যকর স্থানীয় সমাধানের দিকে পরিচালিত করা।
বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনা ও ভারতের তরুণদের বার্তা
ভারতের তরুণ পরিবেশ কর্মীরা বিশ্বমঞ্চে ‘জলবায়ু ন্যায়বিচার’ (Climate Justice) সংক্রান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁরা কেবল কার্বন নির্গমন কমানোর কথা বলছেন না, বরং তার সাথে সাম্য, উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরছেন।
ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে দারিদ্র্য দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শক্তির চাহিদার কথা মাথায় রাখতেই হবে। তাই পরিবেশবান্ধব অর্থনীতিতে (Green Economy) রূপান্তরের সময় কীভাবে ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করা যায়, সেই আলোচনায় তরুণরা প্রধান ভূমিকা নিচ্ছেন।
ভারতের বিপুল তরুণ জনসংখ্যা একটি বিরাট সুযোগ। তাদের গবেষক, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, স্বেচ্ছাসেবক এবং কমিউনিটি লিডার হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, ভারতীয় তরুণরা প্রমাণ করেছেন যে জলবায়ু আন্দোলন কেবল সরকারের ওপর নির্ভরশীল নয়। ব্যক্তি পর্যায়ে সৌরশক্তি উৎপাদন, উদ্যোক্তাদের টেকসই প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং স্থানীয় স্তরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো ছোট ছোট উদ্যোগগুলো একত্রিত হয়ে সমাজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর বড় ইতিবাচক চাপ তৈরি করতে পারে।
উন্নয়ন বনাম পরিবেশ: ভুল ধারণার অবসান
পরিবেশ আন্দোলনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো এই ভুল ধারণাটি যে—পরিবেশ রক্ষা করতে গেলে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বিসর্জন দিতে হবে। কিন্তু বাস্তব তা বলে না।
ভারতের অবশ্যই অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রয়োজন। কর্মসংস্থান, উন্নত পরিকাঠামো, নিরবচ্ছিন্ন শক্তি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ভারতের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কোন্ ধরনের উন্নয়ন বেছে নিচ্ছি? দূষিত বাতাস, ভূগর্ভস্থ জলশূন্যতা, বনাঞ্চল ধ্বংস এবং জলবায়ু বিপর্যয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক উন্নয়ন কখনও দীর্ঘস্থায়ী বা টেকসই হতে পারে না।
এখানেই গুরুত্ব পায় ‘গ্রিন ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’ বা পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন। এর অর্থ হলো নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, উন্নত ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, টেকসই কৃষি ব্যবস্থা এবং নতুন নতুন 'সবুজ কর্মসংস্থান' (Green Jobs) তৈরি করা।
আজকের যুব আন্দোলন এই বার্তাটিই খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। তরুণরা কেবল সরকারের ওপর পরিবেশ রক্ষার চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং তারা নিশ্চিত করতে চাইছে যে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে যেন তাদের ভবিষ্যতের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে।
তবে এই কণ্ঠস্বরগুলোকে সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এখন সময়ের দাবি। তরুণদের প্রয়োজন সঠিক পরিবেশ শিক্ষা, নীতি নির্ধারণের উপযুক্ত মঞ্চ, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য।
বিখ্যাত পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানী জেমস লাবলক (James Lovelock) যেমনটা সতর্ক করে বলেছিলেন: ‘টেকসই উন্নয়নের (Sustainable Development) জন্য সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে; এখন আমাদের প্রয়োজন প্রকৃতির সাথে একটি টেকসই পিছু হটা (Sustainable Retreat)।’ বক্তব্যটি তীব্র হলেও এটি মানবজাতির সামনে উপস্থিত বিপদের ভয়াবহতাকে নির্দেশ করে।
আগামী দিনের সংকল্প
ভারতের পরিবেশ আন্দোলন এক সম্পূর্ণ নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে এবং তরুণরাই তার মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। রাস্তায় নেমে আন্দোলন থেকে শুরু করে ডিজিটাল সচেতনতা, কিংবা স্থানীয় স্তরে বর্জ্য মুক্ত করার কাজ—ভারতীয় তরুণরা দেখিয়ে দিচ্ছেন যে পরিবেশ রক্ষায় কত রূপ হতে পারে।
তবে তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো পরিবেশ সম্পর্কিত সামাজিক ধ্যান-ধারণাকে বদলে দেওয়া। জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর কেবল বিজ্ঞানী বা পরিবেশবিদদের গবেষণার বিষয় নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চাকরি, সমতা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের সাথে যুক্ত বিষয়।
তাই পরিবেশ আন্দোলনকে রাজনীতির প্রান্তিক আলোচনা থেকে তুলে এনে মূলধারার উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রে বসাতে হবে। বৈশ্বিক যুব আন্দোলন যেমনটা দেখিয়েছে, ভবিষ্যতের ভয়কে ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করার এক অসীম ক্ষমতা তরুণদের রয়েছে। এখন সরকার, প্রশাসন এবং সমাজের দায়িত্ব হলো তরুণদের এই শক্তিকে কেবল প্রশংসা না করে, তা কার্যকর সরকারি নীতিতে রূপান্তর করা।
ভারতের ক্ষেত্রে উন্নয়ন আর পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে যে কোনও একটিকে বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং এমন উন্নয়ন বেছে নিতে হবে যা একই সঙ্গে মানবসমাজ ও প্রকৃতি—উভয়কেই সুরক্ষিত রাখবে। আর এই সবুজ ও টেকসই ভারত গড়ার পথে তরুণ প্রজন্ম কেবল সুফলভোগী নয়, তারা হবেন এর মূল কারিগর।
(মতামত ব্যক্তিগত)
E-Paper

