পরমাণু বিজ্ঞানে ইতিহাস! থোরিয়াম সম্পদকে কাজে লাগিয়ে শক্তি স্বনির্ভরতার পথে ভারত

তামিলনাড়ুর কল্পক্কমে ইন্দিরা গান্ধী সেন্টার ফর অ্যাটমিক রিসার্চ ক্যাম্পাসে অবস্থিত এই ৫০০ মেগাওয়াটের রিঅ্যাক্টরটি ভারতীয় ন্যাবিকীয় বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড (ভাভিনি) দ্বারা পরিচালিত।

Published on: Apr 7, 2026, 22:39:11 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

দীর্ঘ কয়েক দশকের অপেক্ষা এবং বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রমের অবসান। ভারতের পরমাণু শক্তিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হল। তামিলনাড়ুর উপকূলীয় শহর কালপক্কমের পরমাণু চুল্লি-‘প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর’ (পিএফবিআর) প্রথমবার ‘ক্রিটিক্যালিটি’ অর্জন করল। অর্থাৎ, এই চুল্লিতে পরমাণু বিভাজন বা নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়া এখন নিয়ন্ত্রিত এবং স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে শুরু হয়েছে।

শক্তি স্বনির্ভরতার পথে ভারত (সৌজন্যে টুইটার)
শক্তি স্বনির্ভরতার পথে ভারত (সৌজন্যে টুইটার)

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই সাফল্যকে ভারতের পারমাণবিক যাত্রার একটি 'নির্ণায়ক পদক্ষেপ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আজ ভারতের বেসামরিক পরমাণু প্রকল্প একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মাধ্যমে পরমাণু প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছানো হল। স্বদেশীয়ভাবে ডিজাইন ও নির্মিত কল্পক্কমের প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যালিটি অর্জন করেছে।’ তিনি আরও বলেছেন যে, 'এই রিঅ্যাক্টর আমাদের বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা ও ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতার গভীরতা প্রমাণ করে।' এই বিষয়ে ব্যাখ্যা করার আগে পরমাণু শক্তির বিষয়ে জানা প্রয়োজন। পরমাণু হল যে কোনও কিছুর ক্ষুদ্রতম সাংগঠনিক একক যার কেন্দ্রে থাকে নিউক্লিয়াস নামের এক গোলক। অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এতে বিস্ফোরণ ঘটালে প্রচুর পরিমাণে তাপশক্তি উৎপন্ন করে। যা জলকে বাষ্পে পরিণত করে সেই বাষ্পের মাধ্যমে ঘোরানো হয় টারবাইন। এখান থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় তাকেই বলে পারমাণবিক শক্তি। যা পরিবেশ বান্ধব। ভারতের এই বিশেষ পারমাণবিক চুল্লি পিএফবিআর পৌঁছে গিয়েছে এক বিশেষ পর্যায়ে যাকে বলা হচ্ছে ‘ক্রিটিক্যালিটি।'

তামিলনাড়ুর কল্পক্কমে ইন্দিরা গান্ধী সেন্টার ফর অ্যাটমিক রিসার্চ ক্যাম্পাসে অবস্থিত এই ৫০০ মেগাওয়াটের রিঅ্যাক্টরটি ভারতীয় ন্যাবিকীয় বিদ্যুৎ নিগম লিমিটেড (ভাভিনি) দ্বারা পরিচালিত। সোডিয়াম-কুলড ফাস্ট ব্রিডার প্রযুক্তিতে তৈরি এই রিঅ্যাক্টর বিশেষ কারণ এটি নিজে যতটা জ্বালানি খরচ করে, তার চেয়ে বেশি জ্বালানি উৎপাদন করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে ভারত তার তিন-স্তরের নিউক্লিয়ার কর্মসূচির দ্বিতীয় স্তরে সফলভাবে পা রাখল। থোরিয়াম সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশকে শক্তিতে স্বনির্ভর করার পথে এটি এক সিদ্ধান্তমূলক অগ্রগতি। এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে আমাদের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের দীর্ঘদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম। ২০০৪ সালে নির্মাণ শুরু হয়েছিল এই প্রকল্পের। বহু বছর ধরে নানা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, নিরাপত্তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করে অবশেষে এই মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধী সেন্টার ফর অ্যাটমিক রিসার্চ (আইজিসিএআর)-এর বিজ্ঞানীরা এবং ভাভিনির টিমের অবদান অসামান্য।

ফাস্ট ব্রিডার রিঅ্যাক্টর সাধারণ নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ। এটি ইউরেনিয়াম-২৩৮ থেকে প্লুটোনিয়াম-২৩৯ তৈরি করে, যা আবার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ফলে জ্বালানির অপচয় কমে এবং বর্জ্যও অনেক কম হয়। ভারতের বিশাল থোরিয়াম রিজার্ভ (বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ) কে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় স্তরে থোরিয়াম-ভিত্তিক রিঅ্যাক্টর চালু করার পথ প্রশস্ত করবে এই পিএফবিআর। এর ফলে দেশের শক্তি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়বে। ভারত ২০৪৭ সাল নাগাদ পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানের আট গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এখনও এই চুল্লির মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডের জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়নি, পরবর্তী পর্যায়ে তা অর্জিত হবে। এই অর্জন এসেছে এমন সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির সরবরাহ সংকট ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেল-গ্যাসের সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। ভারত ২০৭০ সালের মধ্যে ‘শূন্য কার্বন উদ্গিরণ’ লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।