India-Oman trade deal: অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী! যুদ্ধ আবহে ভারতের বাণিজ্যে ওমান কী নয়া দিগন্ত?
India-Oman trade deal: বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীর আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর।
India-Oman trade deal: ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরুদ্ধ। যার জেরে অশোধিত তেলের আমদানি-রফতানি নিয়ে বড় সমস্যায় বিশ্ব। এই অবস্থায় আজ, সোমবার থেকে ওমানের সঙ্গে ভারতের আর্থিক চুক্তি কার্যকর হল। এই কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সিইপিএ)-এর দিকে অনেক দিন ধরেই তাকিয়ে ছিল ভারত। এই চুক্তির ফলে ওমানের বাজারে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের প্রায় সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার মিলবে, যা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মাস্কাট সফরের সময় এই চুক্তিতে উভয় দেশ স্বাক্ষর করেছিল।

সোমবার কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল ভারত-ওমান সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) কার্যকরের ঘোষণা করে, একে ভারতের অর্থনীতির জন্য একটি ‘যুগান্তকারী মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র ‘সমৃদ্ধির বৈশ্বিক পথ নির্মাণ’-এর লক্ষ্যে এই চুক্তি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রী, কারিগর, মহিলা, কৃষক, মৎস্যজীবী এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই)-র জন্য নতুন বাজার উন্মুক্ত হবে, রফতানি বৃদ্ধি পাবে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে।
কেন এই চুক্তি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীর আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর। বিশ্বের মোট দৈনিক খনিজ তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের ২৫ শতাংশ এই সংকীর্ণ নৌপথটি দিয়ে যাতায়াত করে। ফলে একে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের সবচেয়ে সংবেদনশীল ‘চোকপয়েন্ট’ বা প্রতিবন্ধক বিন্দু বলা হয়। এই সংকটের সময়েই ভারত-ওমান বাণিজ্য চুক্তির আসল গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে। ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (ইউএই) থেকে ভারতে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। কিন্তু পারস্য উপসাগরের অন্যান্য দেশের মতো ওমানকে পণ্য বা জ্বালানি পরিবহনের জন্য সম্পূর্ণভাবে হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভর করতে হয় না। ওমানের দীর্ঘ উপকূলরেখার সিংহভাগই হরমুজ প্রণালীর বাইরে- সরাসরি আরব সাগর এবং ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত।
থিঙ্ক ট্যাংক 'গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ'-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব জানান, ওমানের এই কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালীতে ট্রাফিক বা যুদ্ধবিগ্রহজনিত অচলাবস্থা তৈরি হলেও ওমানের প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর- 'সালালাহ' এবং 'দুকম' সম্পূর্ণ সচল ও নিরাপদ থাকে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'বর্তমান উপসাগরীয় সংঘাত স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে চরম অস্থিতিশীলতা বা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও ওমান বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য বাণিজ্য ও জ্বালানি ট্রানজিট রুট হিসেবে কাজ করতে পারে।'
চলমান যুদ্ধের প্রভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যাপক হ্রাস পেয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ভারতের আমদানি যেখানে ছিল ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, তা ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়ায় মাত্র ৯.৮ বিলিয়ন ডলারে। একইভাবে ওই অঞ্চলে ভারতের রপ্তানিও ৪.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে হ্রাস পেয়ে মাত্র ২.৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তবে এই মন্দার বাজারে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ওমান। হরমুজ সংকটের মধ্যেও ওমান থেকে ভারতের আমদানি ২৪৬.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর যেখানে আমদানির পরিমাণ ছিল ৪৩০ মিলিয়ন ডলার, তা এবার একলাফে বেড়ে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, ওমানে ভারতের সামগ্রিক রপ্তানি হ্রাসের হার ছিল অত্যন্ত নগণ্য- মাত্র ১০.৩ শতাংশ। অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, 'এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, হরমুজ প্রণালী ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে ওমান ভারতের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য এবং চমৎকার বিকল্প অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে।'
এই চুক্তির ফলে ভারতের সুবিধা
সিইপিএ-এর আওতায় ওমানের মাস্কাট প্রশাসন ভারতের মোট রপ্তানি পণ্যের ৯৮.০৮ শতাংশ ট্যারিফ লাইনের ওপর শূন্য-শুল্ক সুবিধা দিচ্ছে। এর ফলে ওমানে ভারতের মোট রপ্তানির ৯৯.৩৮ শতাংশ পণ্যই এখন কোনও শুল্ক ছাড়াই প্রবেশ করতে পারবে। এই চুক্তির আগে ভারতের মাত্র ১৫.৩ শতাংশ পণ্য ওমানে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেত। ভারতের প্রধান শ্রম-নিবিড় শিল্পগুলো এই করমুক্ত সুবিধার ফলে সরাসরি লাভবান হবে। এর মধ্যে রয়েছে- রত্ন ও অলঙ্কার, তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য, চামড়া, জুতো এবং ক্রীড়াসামগ্রী, প্লাস্টিক, আসবাবপত্র এবং প্রকৌশল পণ্য, ওষুধ চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং মোটরগাড়ি।
২০২৬ অর্থবর্ষে ওমানে ভারতের মোট রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে শীর্ষস্থানে ছিল পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য, যেমন- পেট্রোল (৭৮১ মিলিয়ন ডলার) এবং ন্যাপথা (৭৪৬ মিলিয়ন ডলার)। এর পাশাপাশি ক্যালসাইন্ড অ্যালুমিনা (২৭৭ মিলিয়ন ডলার), লোহা ও ইস্পাত পণ্য (২৩০ মিলিয়ন ডলার), ভারী যন্ত্রপাতি (১৭৮ মিলিয়ন ডলার) এবং বাসমতি চাল (১৬৭ মিলিয়ন ডলার) উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রপ্তানি হয়েছে। যদিও পূর্বে ভারতের ৮০ শতাংশের বেশি পণ্য ওমানে মাত্র ৫ শতাংশের মতো গড় শুল্কে প্রবেশ করলেও কিছু নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর ওমান ১০০ শতাংশ পর্যন্ত চড়া শুল্ক আরোপ করে রেখেছিল। 'গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ'-এর প্রতিষ্ঠাতা জানান, নতুন চুক্তিতে এই শুল্কের সম্পূর্ণ বিলোপ ঘটায় ওমানের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। তবে ওমানের জনসংখ্যা ৫৫ লক্ষ এবং জিডিপি প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় ভারতের রপ্তানি বৃদ্ধির গতি একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ওমানের প্রাপ্তি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এর বিনিময়ে ওমানও ভারতের বিশাল বাজার থেকে ব্যাপক সুবিধা পাবে, বিশেষ করে যে সব খাতে ওমান ইতিমধ্যে ভারতকে পণ্য সরবরাহ করে আসছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত তার মোট ট্যারিফ লাইনের প্রায় ৭৮ শতাংশের ওপর থেকে শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার বা হ্রাস করবে। এর ফলে ওমানের প্রধান রপ্তানি খাত- জ্বালানি, সার এবং শিল্প কাঁচামাল ভারতের বাজারে সস্তায় প্রবেশাধিকার পাবে। ২০২৬ অর্থবর্ষে ভারত ওমান থেকে প্রায় ৭.২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করেছে। যার সিংহভাগ জুড়ে ছিল অপরিশোধিত তেল (১.৬ বিলিয়ন ডলার), তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি (১.২ বিলিয়ন ডলার) এবং সার (৮৪৩ মিলিয়ন ডলার)। এছাড়াও ওমান ভারতের বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের একটি প্রধান উৎস, যেখান থেকে গত অর্থবর্ষে ৪৬৫ মিলিয়ন ডলারের মিথানল এবং ৪২৪ মিলিয়ন ডলারের অ্যামোনিয়া আমদানি করেছে ভারত।
E-Paper

