বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধাক্কা! হরমুজ প্রণালীতে আটকে ৭০০ ট্যাঙ্কার, জ্বালানি ভাণ্ডারে টান ভারতের?

ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮০ ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

Published on: Mar 3, 2026, 18:29:35 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এই আবহে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস। ফলে এই জলপথ হয়ে স্বাভাবিক পূর্ব-পশ্চিমমুখী অপরিশোধিত তেল পরিবহনের প্রায় ৮৬ শতাংশই থমকে গিয়েছে। যার জেরে বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জ্বালানি ভাণ্ডারে টান ভারতের? (REUTERS)
জ্বালানি ভাণ্ডারে টান ভারতের? (REUTERS)

সামুদ্রিক চলাচল বিশ্লেষণ সংস্থা উইন্ডওয়ার্ড ও বাজার বিশ্লেষণী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুসারে, এই জলপথটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়নি। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যত অচল। ১ মার্চ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে মাত্র তিনটি ট্যাঙ্কার, যেগুলো বহন করছিল ২৮ লক্ষ ব্যারেল তেল। ২০২৬ সালের দৈনিক গড় ১ কোটি ৯৮ লক্ষ ব্যারেলের তুলনায় এটি ৮৬ শতাংশ কম। ২ মার্চের শুরুতে মূল নৌপথ দিয়ে গেছে কেবল একটি ছোট ট্যাঙ্কার ও একটি ছোট কার্গো জাহাজ। হরমুজ প্রণালীর দুই পাশে বর্তমানে প্রায় ৭০৬টি অ-ইরানি ট্যাঙ্কার আটকে রয়েছে। এরমধ্যে ৩৩৪টি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ, ১০৯টি ‘ডার্টি’ বা মিশ্রিত জ্বালানি পণ্যবাহী ট্যাঙ্কার এবং ২৬৩টি ‘ক্লিন’ বা পরিচ্ছন্ন জ্বালানিবাহী জাহাজ। আরও ২৬টি ট্যাঙ্কার উপসাগরের ভেতরে স্পষ্ট গন্তব্য ছাড়া ভেসে রয়েছে। ওমান উপসাগরেও শত শত জাহাজ অপেক্ষায় রয়েছে।

বিশ্বব্যাপী অপেক্ষা

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮০ ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপে গ্যাসের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে গিয়েছে। কারণ, সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগার এবং কাতারের একটি এলএনজি স্থাপনায় হামলা হয়েছে, যার ফলে উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে। যদি এই অচলাবস্থা আরও কয়েকদিন স্থায়ী হলে ট্যাঙ্কারের সারি আরও দীর্ঘ হবে। সরবরাহের সময়সূচি ভেঙে পড়বে। উপসাগরীয় জলসীমায় যুদ্ধ ঝুঁকির বিমা ইতিমধ্যেই কঠোর হয়েছে। হরমুজের কাছে যেতে রাজি এমন জাহাজের ভাড়া ও অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বাড়ছে। এর সব খরচ শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দামে যোগ হবে।

যদি এই পরিস্থিতি সপ্তাহজুড়ে চলতে থাকে, তাহলে পরিণতি আরও ভয়ঙ্কর হবে। ইতিমধ্যে এশিয়া ও ইউরোপের পরিশোধনাগারগুলো বিকল্প উৎস খুঁজছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চল, পশ্চিম আফ্রিকা, ব্রাজিল ও রাশিয়া থেকে তেল আনার চেষ্টা করছে। উপসাগরীয় তেলের উপর নির্ভরশীল ভারত ও চিন তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এই আবহে নয়া দিল্লিতে জরুরি পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা চলছে। একাধিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ রক্ষায় ভারত পেট্রোল ও ডিজেল রপ্তানি কমাতে পারে। রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানি বাড়াতে পারে। সরবরাহ সংকট দীর্ঘ হলে এলপিজি রেশনিং-সহ চাহিদা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে। তবে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলা স্বাধীনভাবে এসব সম্ভাব্য পদক্ষেপ যাচাই করতে পারেনি। ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার পর এক্স বার্তায় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক জানিয়েছে, ‘আমরা পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি। দেশে প্রধান পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রাপ্যতা ও সহনীয় দাম নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

শিল্পখাতের হিসাবে, ভারত তার পরিশোধিত জ্বালানির একটি বড় অংশ রপ্তানি করে। মোট উৎপাদিত পেট্রোলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং ডিজেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিদেশে যায়। এলপিজি সবচেয়ে ঝুঁকিতে। ভারতের মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ আমদানি নির্ভর। এর বড় অংশই উপসাগরীয় উৎপাদকদের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালী হয়ে আসে। শিল্পমহলের হিসাবে, নতুন কার্গো আসা বন্ধ হলে বর্তমান মজুত দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের চাহিদা মেটাতে পারবে। রাষ্ট্রায়ত্ত পরিশোধনাগার ইন্ডিয়ান ওয়েল করপোরেশন, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম এবং ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন লিমিটেড নির্বাচিত স্থাপনায় এলপিজি উৎপাদন বাড়াতে শুরু করেছে। হরদীপ সিং পুরী বলেছেন, কৌশলগত গুহামজুত, পরিশোধনাগার, বন্দর ও ভাসমান সংরক্ষণ মিলিয়ে ভারতের অপরিশোধিত তেল ও পণ্যের মজুত প্রায় ৭৪ দিনের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এর মধ্যে শিল্পখাতের হিসাবে কৌশলগত গুহায় সংরক্ষিত অপরিশোধিত তেল প্রায় ১৭ থেকে ১৮ দিনের চাহিদা মেটাতে পারে। পরিশোধিত জ্বালানি মজুত আছে প্রায় ২০ থেকে ২১ দিনের জন্য। এলএনজি মজুত রয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১২ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো।

এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ‘দিন নয়, কয়েক সপ্তাহ’ স্থায়ী হতে পারে। এতে ভারতের সামনে শিগগিরই কঠিন সমীকরণ দাঁড়াতে পারে-দেশের ভেতরে জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষা করবে, নাকি বিশ্ব বাজারে বড় রপ্তানিকারক হিসেবে তার ভূমিকা বজায় রাখবে।