রক্তাক্ত পশ্চিম এশিয়া! সৌদির তেল শোধনাগারে হামলা ইরানের, পাল্টা লক্ষ্যবস্তু নৌঘাঁটি
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে রাস তানুরা শোধনাগারটি চালায় 'সৌদি আরামকো।' এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনাল।
ইরান, ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘর্ষে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ পশ্চিম এশিয়া। সে দেশের সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যুর পরই ইরান 'প্রতিশোধের প্রতিশ্রুতি' দিয়েছিল। তারপর থেকে একের পর এক হামলা করেছে ইরান। পাল্টা আক্রমণ করেছে ইজরায়েলও। সম্প্রতি সৌদি আরবের অ্যারামকোর রাস তানুরা রিফাইনারিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে সেই ছবি, ভিডিও। আর এই হামলা এমন সময়ে ঘটেছে যখন বিশ্বের তেলের বাজারে দেখা দিয়েছে প্রবল চাপের পরিস্থিতি।
সৌদি আরবের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল শোধনাগার রাস তনুরায়। সেখানেই ড্রোন হামলা করেছে ইরান। মূলত মার্কিন এবং ইজরায়েলি ঘাঁটিই লক্ষ্য ইরানের। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর, অ্যারামকোর ওই তেল শোধনাগারে আঘাত হেনেছে ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন। শেষ খবর, ওই হামলার জেরে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে রাস তানুরা শোধনাগার। ফলে সৌদি ও বিশ্বে তেল সরবারহে বিশাল ধাক্ক হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। হামলার ফলে সেখানে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হলেও আগুন ছিল অল্প এবং নিয়ন্ত্রণে। এখন পর্যন্ত কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে এখনও অবধি অ্যারামকোর মিডিয়া অফিস এই হামলার বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। আল আরাবিয়া টিভিকে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র জানান, দুটি ড্রোন শোধনাগার লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল, তবে সেগুলো আকাশেই ধ্বংস করা হয়।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশে রাস তানুরা শোধনাগারটি চালায় 'সৌদি আরামকো।' এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি টার্মিনাল। এই কেন্দ্রটি অপরিশোধিত তেল উৎপাদন এবং পরিশোধন-উভয় কাজের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিপোর্ট অনুযায়ী, এখানে প্রতিদিন ৫,৫০,০০০ ব্যারেলেরও বেশি তেল পরিশোধন করা সম্ভব। এই কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত রপ্তানি টার্মিনালটি প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল তেল ট্যাঙ্কারে লোড করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাতে পারে, যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছে একে। বিশাল এই অবকাঠামোতে রয়েছে তেল শোধনাগার, বিশাল স্টোরেজ ট্যাঙ্ক, পাইপলাইন এবং একটি বিশাল বন্দর, যেখান থেকে সারা বিশ্বে তেল পাঠানো হয়। এর গুরুত্ব বিবেচনা করে রাস তানুরায় অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে তেলের বাজারে গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অস্থিরতা চলছে। ইরান ও সংলগ্ন দেশগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু পথটি দিয়েই সরবরাহ করা হয়। ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই পথ বন্ধ না করলেও, নিরাপত্তার অভাবে অনেক জাহাজ কোম্পানি এখান দিয়ে চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পথে এক ধরণের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়া
শনিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও ইজরায়েল-সহ সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা সিরিজ হামলা চালিয়েছে। এরপরেই সৌদি আরবের বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, 'সৌদি আরব ইরানের এই নগ্ন ও কাপুরুষোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রত্যাখ্যান জানাচ্ছে।' বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই হামলা কোনও অজুহাতে বা কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। বিশেষ করে ইরান ভালো করেই জানত যে, সৌদি আরব আগেই নিশ্চিত করেছিল যে তারা তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের ওপর কোনও হামলা চালাতে দেবে না। এই হামলার প্রতিবাদে সৌদি কর্তৃপক্ষ রিয়াদে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলিরেজা এনায়াতিকে তলব করেছে।
ইরানের নৌঘাঁটিতে হামলা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় ওমান উপসাগরের তীরে দক্ষিণ ইরানের কোনারক নৌঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর সেই দৃশ্য ধরা পড়েছে স্যাটেলাইট ছবিতে। তবে এই হামলায় হতাহতের সংখ্যা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। হামলা চালিয়ে ইরানের নৌবাহিনীর ৯টি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ট্রুথ সোশ্যালে করা এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ৯টি জাহাজের মধ্যে ‘কয়েকটি বেশ বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ।’ ইরানে গত শনিবার হামলা চালিয়ে সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে হত্যা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল। এরপর দ্রুত পাল্টা হামলা চালায় তেহরান। এরমধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান সর্বোচ্চ চার সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড।
E-Paper

