Suicide Tree: মানুষের ‘ভবলীলা সাঙ্গ’ করতে সিদ্ধহস্ত এই গাছ, দূরে থাকুন সর্বদা
Suicide Tree: কোনও গভীর জঙ্গল নয়, কেরলের উপকূলবর্তী জনবসতি, জলাশয় ও খালের ধারেই স্বাভাবিকভাবে জন্মায় এই ওথালাঙ্গা। স্থানীয় ভৌগোলিক পরিবেশে এর অবাধ উপস্থিতিই একে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
Suicide Tree: অনেকেই আছেন, যাদের গাছের (Plants) শখ আছে। সকাল থেকে রাত সবুজ প্রকৃতির পরিচর্যা করেন তারা। গাছে ফোটা ফুলের জন্য় অপেক্ষা করেন বছরভর। অনেকে নিজ হাতে মরসুমি ফল ফলান। কিন্তু আপনি কী জানেন, প্রাণীজগতের ‘বন্ধু’ এই গাছও মানুষ সহ যে কোনও প্রাণীর প্রাণ কেড়ে নিতে পারে এক মুহূর্তে। কেরলের নদীনালা, খাড়ি আর ব্যাকওয়াটারের ধারে বেড়ে ওঠা এক অতি সাধারণ গাছ। ঝকঝকে সবুজ কচি পাতা বাতাসে দোল খায়, ডালপালায় ফুটে থাকে ধবধবে সাদা ফুল। তার ডালে ঝুলে থাকা কাঁচা আমের মতো সবুজ ফলটি দেখে যে কেউই ভাববেন প্রকৃতির এক নিরীহ সৃষ্টি। কিন্তু এই আপাত নিরীহ ফলের বীজেই লুকিয়ে রয়েছে মানব হৃদযন্ত্র নিমেষে স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো এক ভয়ানক মারণ বিষ।

সাধারণ ফলে লুকানো মারণ বিষ
স্থানীয়ভাবে ওথালাঙ্গা নামে পরিচিত এই গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম সেরবেরা ওডোলাম। ওথালাঙ্গার সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক শুধু এর বিষাক্ততা নয়; বরং ঐতিহাসিকভাবে চিকিৎসক এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কাছে এই বিষ শনাক্ত করাটাই ছিল এক বড় ধাঁধা। ওথালাঙ্গার বীজে থাকে 'সারবেরিন' (Cerberin) নামের এক শক্তিশালী কার্ডিয়াক গ্লাইকোসাইড টক্সিন। এই বিষ শরীরে প্রবেশ করামাত্রই মানব হৃদপিণ্ডের বৈদ্যুতিক সংকেত ও ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্যাহত করে হৃদস্পন্দনকে অনিয়মিত করে দেয় এবং অল্প সময়ের মধ্যে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মাধ্যমে মৃত্যু ডেকে আনে। স্বাদ বা গন্ধের দিক দিয়ে তীব্র না হওয়ায় এটি খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দিলে সহজে বোঝা যায় না। উপরন্তু, সাধারণ টক্সিকোলজি স্ক্রিনিংয়ে অনেক সময় এর উপস্থিতি চট করে ধরা পড়ত না, যার ফলে অনেক মৃত্যুই প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ হৃদরোগের কারণে ঘটেছে বলে ভুল ধারণা তৈরি করত।
গবেষণায় চমকে দেওয়া তথ্য
২০০৪ সালের এক যুগান্তকারী আন্তর্জাতিক গবেষণায় জানা যায়, কেরলে সামগ্রিক উদ্ভিদজাত বিষক্রিয়ার ঘটনার প্রায় ৫০ শতাংশ এবং যে কোনও ধরণের বিষক্রিয়ায় মৃত্যুর প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রেই দায়ী এই একটি মাত্র গাছের ফল। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে কেরলতেই পাঁচ শতাধিক মৃত্যুর সঙ্গে এই ফলের সরাসরি যোগ পাওয়া গিয়েছিল। গবেষকরা এও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, নিখুঁত ফরেনসিক পরীক্ষার অভাবে আত্মহত্যার পাশাপাশি একাধিক সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে বা গোপন বিষপ্রয়োগেও এই ফল ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে, যা হয়তো কখনও নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করাই যায়নি। এর প্রমাণ মেলে ২০১৫ সালের মে মাসে, যখন আলাপ্পুঝায় স্পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (SAI)-র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে চার তরুণী অ্যাথলিট এই বিষাক্ত ফল খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে একজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
প্রকৃতির অংশ বনাম আতঙ্কের প্রতীক
কোনও গভীর জঙ্গল নয়, কেরলের উপকূলবর্তী জনবসতি, জলাশয় ও খালের ধারেই স্বাভাবিকভাবে জন্মায় এই ওথালাঙ্গা। স্থানীয় ভৌগোলিক পরিবেশে এর অবাধ উপস্থিতিই একে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। তবে মারাত্মক বদনাম সত্ত্বেও ওথালাঙ্গা কেবলই কেটে ফেলার মতো বিপজ্জনক আগাছা নয়। এটি কেরলের উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ম্যানগ্রোভ ও জলসংলগ্ন এলাকায় ভূমিক্ষয় রোধে এই গাছের শিকড় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ পরিবেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্যে এর অবদান অনস্বীকার্য। কেরলের ব্যাকওয়াটারের ধারে আজও নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে সারি সারি ওথালাঙ্গা গাছ, যার ডালে ডালে ঝুলতে থাকে লোভনীয় কিন্তু প্রাণঘাতী সবুজ ফল। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ইতিহাস বারবার একটাই সতর্কবার্তা দেয়—বাইরের রূপ দেখে সবসময় বাস্তবতা বোঝা যায় না, আর কোনও মৃত্যুর আসল কারণ উদঘাটন করতে গেলে জানতে হয় কোন সঠিক প্রশ্নটি তদন্তকারীদের জিজ্ঞাসা করা উচিত।
E-Paper

