বিমান নিজে চালিয়ে দেশে ফিরেছিলেন এই রাষ্ট্রপ্রধান! কোনও পাইলট নয়, পাশে সহকারীর ভূমিকায় ছিলেন বউ! কী হয়েছিল সেদিন

যেকোনো স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাজা যখন কোনো রাষ্ট্রীয় সফরে অন্য দেশে যান, তখন আন্তর্জাতিক প্রোটোকল অনুযায়ী বেশ কিছু বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটি সেখানে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। 

Published on: Aug 17, 2026, 13:16:58 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান যখন অন্য কোনো রাষ্ট্রে সফর করেন, তখন তাঁর জন্য নির্ধারিত থাকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সুনির্দিষ্ট প্রোটোকল। বিশেষ করে বিমানবন্দর থেকে রাজকীয় অভিবাদন গ্রহণ, বিশেষ ভিভিআইপি ফ্লাইট এবং উচ্চপর্যায়ের সুরক্ষাবেষ্টনী ছাড়া রাষ্ট্রপ্রধানের যাতায়াত কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির সমস্ত নিয়মকানুনের বাইরে গিয়ে একবার এমন এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটিয়েছিলেন হিমালয়ের কোল ঘেঁষে থাকা ছোট্ট দেশ ভুটানের তরুণ রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক ও তাঁর সহধর্মিণী রানি জেতসুন পেমা।

নিজে বিমান চালিয়ে দেশে ফিরেছিলেন এই রাষ্ট্রপ্রধান, পাশে সহকারীর ভূমিকায় ছিলেন বউ
নিজে বিমান চালিয়ে দেশে ফিরেছিলেন এই রাষ্ট্রপ্রধান, পাশে সহকারীর ভূমিকায় ছিলেন বউ

থাইল্যান্ড সফর শেষে অন্য কোনো চালক বা পাইলটের ওপর ভরসা না করে ভুটানের রাজা নিজেই ককপিটে বসে রাজকীয় বিমান চালিয়ে নিজ দেশে ফিরে এসেছিলেন! রাষ্ট্রপ্রধানদের কূটনৈতিক সফরের ইতিহাসে এই ঘটনা কেবল এক বিরল ব্যতিক্রমই নয়, বরং রাজপরিবারের সাধারণ মানুষের সাথে কানেক্ট হওয়ার এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছিল। রাষ্ট্রপ্রধানের সফর, প্রোটোকলের কঠোর নিয়ম এবং ভুটানের রাজদম্পতির সেই অবিশ্বাস্য থাইল্যান্ড সফরের বিশদ ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো।

১. আন্তর্জাতিক সফরের সাধারণ কূটনৈতিক ও বিমান নিরাপত্তা প্রোটোকল

যেকোনো স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা রাজা যখন কোনো রাষ্ট্রীয় সফরে অন্য দেশে যান, তখন ভিয়েনা কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক প্রোটোকল অনুযায়ী বেশ কিছু বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়:

  • আকাশপথ ও বিমান নিরাপত্তা: প্রধান রাষ্ট্রপ্রধানদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত বিমানে থাকে অত্যাধুনিক ডিফেন্স সিস্টেম। বিমান চলাচলের সময় নির্ধারিত আকাশপথ বা ‘এয়ার করিডোর’ সম্পূর্ণ ফাঁকা বা সুরক্ষিত রাখা হয়। বিমানের চালক থাকেন সামরিক বাহিনী বা সরকারি বিমান সংস্থার সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত পাইলটরা।
  • ভিভিআইপি গ্রাউন্ডিং ও লাল গালিচা সংবর্ধনা: বিমানবন্দরে পৌঁছানো এবং বিদায় জানানোর সময় স্বাগতিক দেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রতিনিধি উপস্থিত থাকেন। ২১টি তোপধ্বনি, গার্ড অব অনার এবং রেড কার্পেট ওয়েলকাম জানানো হয়।
  • বিশেষ কম্ব্যাট ক্রু: বিমানে ককপিটের ভেতরে ও বাইরে সবসময় অ্যান্টি-হাইজ্যাকিং এবং ইমার্জেন্সি ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম প্রস্তুত থাকে।

২. থাইল্যান্ডের মাটিতে কী ঘটেছিল সেদিন?

ঘটনাটি ঘটেছিল থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে। থাইল্যান্ডের প্রয়াত রাজা ভুমিবল আদুল্যাদেজের শেষকৃত্য ও শোকজ্ঞাপন অনুষ্ঠান কিংবা বিশেষ দ্বিপাক্ষিক সফরের সময় উপস্থিত হয়েছিলেন ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক এবং রানি জেতসুন পেমা।

থাইল্যান্ড সফর শেষ করে ভুটানের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার সময় বিমানবন্দরে স্বাগতিক দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, মন্ত্রী ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা হাজির হয়েছিলেন তাঁদের আনুষ্ঠানিক রাজকীয় বিদায় জানাতে। নির্ধারিত বিমানে (ড্রুক এয়ারের বিশেষ চার্টার্ড বিমান) ওঠার পর উপস্থিত সাধারণ বিমানকর্মী ও অতিথিরা এক অভাবনীয় দৃশ্যের সাক্ষী হন।

  • পাইলটের আসনে স্বয়ং রাজা: রাজকীয় পোশাক ও প্রোটোকলের ঘেরাটোপ পেছনে ফেলে বিমানে ওঠার পরেই রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক সাধারণ বিমানের ক্যাপ্টেন বা পাইলটের পোশাকে ককপিটের চালকের আসনে গিয়ে বসেন।
  • সহ-পাইলটের ভূমিকায় রানি: শুধু তাই নয়, রানির আসনে থাকা জেতসুন পেমাও ককপিটে সহ-পাইলটের পাশে থেকে পুরো প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন।
  • রানওয়ে থেকে সগৌরবে টেক-অফ: থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ভুটানের রাজা নিজেই বাণিজ্যিক ড্রুক এয়ারের এয়ারবাসের স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে রানওয়ে ধরে বিমান ছুটিয়ে আকাশে উড্ডয়ন করেন।

৩. কেন এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলেছিল?

বিশ্ব রাজনীতিতে অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নিজস্ব শখের বশে বিমান বা যুদ্ধবিমান চালালেও, আন্তর্জাতিক কোনো রাষ্ট্রীয় সফরের শেষ মুহূর্তে বিদায় নেওয়ার সময়ে সমস্ত কূটনৈতিক প্রোটোকল নিজ হাতে তুলে নিয়ে নিজেই রাজকীয় প্লেন চালানোর ঘটনা বিরল।

  • রাজার ব্যক্তিগত দক্ষতায় বিস্ময়: অত্যন্ত বিনয়ী ও জনগণের প্রিয় হিসেবে খ্যাত ভুটানের এই রাজা কেবল এক সুশাসক নন, তিনি একজন প্রশিক্ষিত কমার্শিয়াল পাইলটও বটে। তাঁর এই নিখুঁত দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস সবাইকে অবাক করে দেয়।
  • থাই-ভুটান বন্ধুত্বের নজির: রাজ পরিবার দুটির মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও কূটনৈতিক বন্ধুত্ব বিদ্যমান। থাইল্যান্ডের সাধারণ মানুষের কাছেও ভুটানের রাজদম্পতি অত্যন্ত জনপ্রিয়। রাজাকে পাইলটের আসনে বসে বিমান চালাতে দেখে থাই নেটপাড়া ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসার ঝড় উঠেছিল।
  • সহজ-সরল জীবনযাত্রার প্রতীক: আধুনিক বিশ্বে যেখানে সামান্য নিরাপত্তার কারণে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ভিভিআইপি সিকিউরিটি প্রোটোকল তৈরি করা হয়, সেখানে ভুটানের রাজার নিজ হাতে সাধারণ বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালিয়ে দেশে ফেরা তাঁর নিরহংকারী মনোভাব ও সাধারণ জীবনযাত্রারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

কূটনৈতিক প্রোটোকল ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কড়াকড়ির মাঝে ভুটানের রাজা ও রানির এই থাইল্যান্ড থেকে বিদায়ের ঘটনা এক অমর ও ব্যতিক্রমী গল্প হয়ে রয়ে গেছে। এটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত রাজকীয়তা দামি পোশাকে বা প্রোটোকলের সুরক্ষায় থাকে না, তা থাকে সততা, যোগ্যতা এবং মানুষের মন জয় করার অনন্য ক্ষমতায়।

  • Suman Roy
    ABOUT THE AUTHOR
    Suman Roy

    সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More