গান্ধী, ভগৎ সিং থেকে সোনাম ওয়াংচুক! ভারতের ইতিহাসে অনশন আন্দোলনের ঐতিহ্য ও বদলে দেওয়া রূপ
Legacy of hunger strikes in India: ভারতে অনশনের এই ঐতিহ্য কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি নৈতিক প্রতিরোধ এবং অধিকার আদায়ের এক অদম্য প্রতীক।
Mahatma Gandhi satyagraha: ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে ‘অনশন’ বা ‘ভুখ হরতাল’ (Hunger Strike) সবসময়ই এক অন্যতম ও শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন থেকে শুরু করে শহীদ ভগৎ সিং-এর জেলের ভেতরের ঐতিহাসিক প্রতিবাদ, এবং বর্তমান ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে লাদাখের জলবায়ু কর্মী সোনাম ওয়াংচুকের আন্দোলন—প্রতিবাদ ও অনশনের এই পরম্পরা যুগে যুগে ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

ভারতে অনশনের এই ঐতিহ্য কেবল একটি রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি নৈতিক প্রতিরোধ এবং অধিকার আদায়ের এক অদম্য প্রতীক। মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে ভগৎ সিং এবং সোনাম ওয়াংচুক পর্যন্ত ভারতের অনশন আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরা হল।
অনশন হলো এমন একটি আত্মত্যাগ, যেখানে কোনো হিংসার আশ্রয় না নিয়ে কেবল নিজের শরীরকে কষ্ট দিয়ে প্রতিপক্ষের বিবেককে জাগ্রত করার চেষ্টা করা হয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বাধীন ভারতের আধুনিক আন্দোলনগুলোতেও এই অস্ত্রের ধার কমেনি।
১. মহাত্মা গান্ধী: অহিংসা এবং সত্যাগ্রহের প্রধান হাতিয়ার
অনশন আন্দোলনের কথা উঠলে প্রথমেই যার নাম স্মরণে আসে, তিনি হলেন জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী। তিনি অনশনকে কেবল একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখেননি, বরং একে ‘সত্যাগ্রহ’ ও আত্মশুদ্ধির এক পরম মাধ্যম হিসেবে গণ্য করেছিলেন। ১৯১৮ সালের আমদাবাদ মিল ধর্মঘট থেকে শুরু করে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রুখতে গান্ধীজি বারবার আমরণ অনশনে বসেছিলেন। তাঁর এই অনশন ব্রিটিশ সরকারকে যেমন কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তেমনই দেশের মানুষকেও অহিংসার পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
২. শহীদ ভগৎ সিং ও যতীন দাস: জেলের ভেতর বিপ্লব ও চরম আত্মত্যাগ
মহাত্মা গান্ধীর অহিংস অনশনের সমান্তরালেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপ্লবী ধারার অনশনের এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস রয়েছে। ১৯২৯ সালে লাহোর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি থাকা অবস্থায় শহীদ ভগৎ সিং এবং তাঁর সহযোদ্ধারা রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার আদায়ের দাবিতে এক ঐতিহাসিক অনশন শুরু করেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে এই অনশন টানা ১১৬ দিন চলেছিল। এই অনশন চলাকালীনই মাত্র ২৩ বছর বয়সে ৬৩ দিন অন্ন-জল ত্যাগ করে দেশের জন্য শহীদ হন মহান বিপ্লবী যতীন দাস। তাঁদের এই আত্মত্যাগ দেশের যুবসমাজকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অগ্নিগর্ভ করে তুলেছিল।
৩. স্বাধীন ভারতের আন্দোলন: পোট্টি শ্রীরামুলু এবং ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন
স্বাধীন ভারতেও অনশনের প্রভাব ছিল অপরিসীম। ১৯৫২ সালে মাদ্রাজ রাজ্য থেকে তেলুগু ভাষাভাষী মানুষের জন্য আলাদা ‘অন্ধ্রপ্রদেশ’ রাজ্যের দাবিতে আমরণ অনশনে বসেন গান্ধীবাদী নেতা পোট্টি শ্রীরামুলু। টানা ৫৬ দিন অনশনের পর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর এই চরম আত্মত্যাগের পরই জওহরলাল নেহরুর সরকার ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়েছিল, যা আধুনিক ভারতের মানচিত্র গঠনে এক নতুন মোড় এনে দেয়।
৪. স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ (জিডি আগরওয়াল): গঙ্গা রক্ষার জন্য পরিবেশগত অনশন ও বলিদান
স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে পরিবেশ ও নদীর সুরক্ষায় অনশনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুড়ে রয়েছেন বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও আইআইটি (IIT)-র প্রাক্তন অধ্যাপক ড. জিডি আগরওয়াল, যিনি পরবর্তীতে ‘স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ’ নামে পরিচিত হন। পবিত্র গঙ্গা নদীকে দূষণমুক্ত করা, অববাহিকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণ বন্ধ করা এবং গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার জন্য একটি বিশেষ আইন পাসের দাবিতে তিনি ২০১৮ সালে উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে আমরণ অনশনে বসেন। টানা ১১১ দিন অন্ন ত্যাগ করে থাকার পর ৮৬ বছর বয়সে এই মহান পরিবেশ যোদ্ধা দেশের পরিবেশ রক্ষার তাগিদে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেন। তাঁর এই অনশন পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে রয়েছে।
৫. সোনাম ওয়াংচুক এবং বর্তমান লাদাখ আন্দোলন
ইতিহাসের সেই পথ বেয়ে অনশনের এই ঐতিহ্য বর্তমান ২০২৬ সালেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে লাদাখের শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ কর্মী সোনাম ওয়াংচুকের (Sonam Wangchuk) মাধ্যমে। লাদাখের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা এবং সংবিধানে এটিকে ষষ্ঠ তপশিলের (Sixth Schedule) অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে তিনি একাধিকবার মাইনাস তাপমাত্রায় খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘমেয়াদী অনশন করেছেন। ওয়াংচুকের এই প্রতিবাদ ভারতের মূলধারার মানুষের নজর লাদাখের দিকে আকর্ষণ করেছে এবং প্রমাণ করেছে যে, আজও অহিংস ও peaceful বা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানানো সম্ভব।
৬. ইরম শর্মিলার দীর্ঘতম অনশন আন্দোলন
ইরম শর্মিলাও জড়িত হন। সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন (AFSPA)-এর প্রতিবাদে তিনি ১৬ বছর ধরে অনশন করেন। বিশ্বে দীর্ঘতম অনশনের রেকর্ডটি তাঁর দখলে। তাঁর নাকে একটি নল ঢুকিয়ে জোর করে তরল খাবার খাওয়ানো হতো। ইরম শর্মিলা ২০০০ সালের ৫ নভেম্বর তাঁর অনশন শুরু করেন। ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট অনশন শেষ করার আগে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তাঁকে বেশ কয়েকবার গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনি আফস্পা (AFSPA) সম্পর্কে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করলেও তাঁর মূল দাবিগুলো আদায় করতে ব্যর্থ হন। ২০১৭ সালে তিনি মণিপুর বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ১০০-এরও কম ভোট পান।
৭. অন্না হাজারের ১১ দিনের অনশন
সমাজকর্মী অন্না হাজারে ২০১১ সালের অগস্ট মাসে দিল্লিতে একটি দুর্নীতিবিরোধী আইন প্রণয়নের দাবিতে অনশন শুরু করেন। এই আন্দোলন ১১ দিন ধরে চলে এবং ব্যাপক সমর্থন আদায় করে।
অনশন কেবল খাবার বর্জন করা নয়, এটি হল এক আত্মিক ও নৈতিক প্রতিবাদ। মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে ভগৎ সিং, যতীন দাস, পোট্টি শ্রীরামুলু, জিডি আগরওয়াল এবং আজকের সোনাম ওয়াংচুক পর্যন্ত—প্রত্যেকেই দেখাতে চেয়েছেন যে, নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কীভাবে বৃহত্তর স্বার্থে লড়াই করা যায়। অনশন আন্দোলনের ঐতিহ্য আজীবন অধিকার ও প্রকৃতি রক্ষার আন্দোলনে এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্য়ম হয়ে থাকবে।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


