ওল্ড মঙ্কের সঙ্গে যোগ আছে জালিয়ানওয়ালাবাগের! FSSAI-র নিষেধাজ্ঞা তালিকায় থাকা পানীয়ের এই ‘কালো’ ইতিহাস অনেকেরই অজানা
দেশের বহু মানুষের কাছে নস্টালজিয়ার সমার্থক এই রামের ইতিহাস কিন্তু সাধারণের অজানা। যে সংস্থা ওল্ড মঙ্ক তৈরি করে, সেই মোহন মিকিন-এর শিকড় প্রোথিত ঔপনিবেশিক আমলে, এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক নিষ্ঠুরতম অধ্যায়ও।
গুণমান সংক্রান্ত অভিযোগে সম্প্রতি একাধিক মদের ব্র্যান্ডের বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ভারতের খাদ্য সুরক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (FSSAI)। ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট FSSAI ছয়টি বড় হুইস্কি ও রাম ব্র্যান্ডের নির্দিষ্ট কিছু ভ্যারিয়েন্টের বিক্রি বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে, আর এর কারণ দূষণ বা কোনও ক্ষতিকর উপাদান নয়। পরীক্ষাগারে প্রাপ্ত রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, প্রকৃত বার্ধক্যজনিত (এজিং) পদ্ধতি ও খাঁটি উপাদানের বদলে কৃত্রিম ফ্লেভার ব্যবহার করা হচ্ছিল এই সব পানীয়ে। এই তালিকায় রয়েছে ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ও পুরনো রামের ব্র্যান্ড ওল্ড মঙ্কও। মোহন মিকিন-এর মহারাষ্ট্রের খোপোলি ইউনিটে তৈরি হওয়া ওল্ড মঙ্ক দ্য লিজেন্ড, ওল্ড মঙ্ক গোল্ড রিজার্ভ এবং ওল্ড মঙ্ক ট্রিপল এক্স ম্যাচিওরড রামকে চিহ্নিত করা হয়েছে এই তালিকায়, পাশাপাশি রয়েছে ম্যাকডাওয়েলস, ব্যাগপাইপার, অ্যান্টিকুইটি ব্লু-র মতো ব্র্যান্ডও। তবে স্বস্তির কথা এই যে, এই নির্দেশ নির্দিষ্ট কিছু ভ্যারিয়েন্টের ওপর প্রযোজ্য, গোটা ব্র্যান্ড লাইনের ওপর নয় — অর্থাৎ ওল্ড মঙ্ক সম্পূর্ণভাবে বাজার থেকে উঠে যাচ্ছে না।

ওল্ড মঙ্কের অজানা ইতিহাস
দেশের বহু মানুষের কাছে নস্টালজিয়ার সমার্থক এই রামের ইতিহাস কিন্তু সাধারণের অজানা। যে সংস্থা ওল্ড মঙ্ক তৈরি করে, সেই মোহন মিকিন-এর শিকড় প্রোথিত ঔপনিবেশিক আমলে, এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক নিষ্ঠুরতম অধ্যায়ও। ১৮৫৫ সালে এডওয়ার্ড আব্রাহাম ডায়ার হিমাচল প্রদেশের কাসৌলিতে ব্রিটিশ সেনাদের সস্তায় বিয়ার সরবরাহের জন্য একটি ব্রিউয়ারি চালু করেছিলেন, আর এই এডওয়ার্ড ডায়ারই ছিলেন ১৯১৯ সালে অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে গণহত্যার নেতৃত্বদানকারী কর্নেল রেজিনাল্ড ডায়ারের পিতা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্রিউয়ারি হাত বদল হয়ে যুক্ত হয় মিকিন পরিবারের সঙ্গে, আর গড়ে ওঠে 'ডায়ার মিকিন ব্রিউয়ারিজ' নামে সংস্থা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যাই ছিল ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক টার্নিং পয়েন্ট, যা সরাসরি স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করেছিল, অথচ ডায়ার পরিবারের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই সংস্থাটি সেই ঘটনার প্রভাবমুক্ত থেকেই ব্যবসা চালিয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ মালিকানাধীন ব্যবসাগুলি যখন প্রবল জনরোষের মুখে পড়ে, তখন প্রাক্তন কর্মী নরেন্দ্র নাথ মোহনের প্রস্তাব মেনে নিয়ে ১৯৪৮ সালে সংস্থাটি তাঁর হাতে তুলে দেয় ডায়ার ও মিকিন পরিবার, এবং ১৯৪৯ সালে মোহন এর একমাত্র মালিক হয়ে ওঠেন।
এরপরই শুরু হয় নতুন অধ্যায়। নরেন্দ্র নাথ মোহনের পুত্র, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্নেল বেদ রতন মোহন ইউরোপ ভ্রমণের সময় বেনেডিক্টাইন সন্ন্যাসীদের তৈরি সুরার প্রতি আকৃষ্ট হন। সেই অনুপ্রেরণা থেকেই ওক ব্যারেলে বছরের পর বছর পাকানো এক বিশেষ রাম তৈরির পরিকল্পনা করেন তিনি, যার নাম দেওয়া হয় 'ওল্ড মঙ্ক' — সেই সন্ন্যাসীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। ১৯৫৪ সালে বাজারে আসে এই রাম, এবং দ্রুতই তা হয়ে ওঠে দেশের সেনাবাহিনীর ক্যান্টিন থেকে শুরু করে কলেজ হস্টেলের ঘরে ঘরে সবচেয়ে প্রিয় পানীয়।
ইতিহাস আর বর্তমানের সংযোগ
অর্থাৎ, যে ব্র্যান্ড আজ ভারতের ঘরে ঘরে পরিচিত নাম, তার সংস্থার সূচনা হয়েছিল এমন এক ব্যক্তির হাতে, যাঁর পুত্র ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায়ের জন্য দায়ী। পরবর্তীকালে ভারতীয় মালিকানায় আসার পর এই সংস্থাই তৈরি করে এমন একটি রাম, যা কয়েক প্রজন্ম ধরে আমজনতার আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। এখন গুণমান সংক্রান্ত বিতর্কে এই ব্র্যান্ডের নাম জড়ানোয় ফের একবার আলোচনায় উঠে এসেছে ওল্ড মঙ্কের এই বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাস।
(দ্রষ্টব্য: FSSAI-র নিষেধাজ্ঞা নির্দিষ্ট কিছু ভ্যারিয়েন্টের ওপর প্রযোজ্য, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির বক্তব্য ও পরবর্তী তদন্তের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।)
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


