UK-Pakistan: গ্রুমিং গ্যাং মাস্টার মাইন্ডের প্রত্যর্পণ: ব্রিটেনের কাছে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের ফেরত চাইল পাকিস্তান
UK-Pakistan: ৭৩ বছর বয়সি শাবির আহমেদ সম্প্রতি তার সাজার একটি অংশ ভোগ করে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর, লন্ডন যখন তাঁকে ইসলামাবাদে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) উপায় খুঁজছিল, তখনই পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিতর্কিত বিনিময়ের প্রস্তাব দেয়।
UK-Pakistan: ব্রিটেনের রচডেলের গ্রুমিং গ্যাংয়ের মাস্টার মাইন্ড-যে নাবালিকাদের টার্গেট করত, সেই পাকিস্তানি নাগরিককে যদি ব্রিটেন নিজের দেশে ফেরত পাঠাতে চায়, তবে ইসলামাবাদও লন্ডনের কাছে তাদের দেশের প্রতিরক্ষা প্রধান আসিম মুনিরের সমালোচক ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে।

ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম 'দ্য টেলিগ্রাফ' এবং 'দ্য ড্রপ সাইট'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭৩ বছর বয়সি শাবির আহমেদ সম্প্রতি তার সাজার একটি অংশ ভোগ করে জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর, লন্ডন যখন তাঁকে ইসলামাবাদে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) উপায় খুঁজছিল, তখনই পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিতর্কিত বিনিময়ের প্রস্তাব দেয়। নির্যাতিতাদের কাছে 'ড্যাডি' নামে পরিচিত শাবির আহমেদ ২০১২ সালের আগস্টে ধর্ষণ-সহ ৩০টি শিশু যৌন অপরাধের জন্য ২২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার আগে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি-উভয় দেশেরই দ্বৈত নাগরিক ছিল। তবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর শাবির ব্রিটিশ নাগরিকত্ব হারায়।
ব্রিটেনের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া সত্ত্বেও শাবির আহমেদকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো যাচ্ছে না, কারণ ব্রিটেনের 'ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট ১৯৭১' অনুযায়ী কমনওয়েলথভুক্ত দেশের যেসব নাগরিক ১৯৭৩ সালের আগে ব্রিটেনে এসেছেন এবং অন্তত পাঁচ বছর সেখানে বসবাস করেছেন, তাঁদের এই বহিষ্কারাদেশ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের বিতর্কিত প্রস্তাব
'টেলিগ্রাফ'-এর প্রতিবেদনে পাকিস্তানের একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে, শিশু ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্তকে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ প্রয়োগ বা হুমকি দেওয়ার পরিবর্তে ব্রিটেনের উচিত ইসলামাবাদের জন্য 'গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে মূল্যায়ন করা।' এর আগে, রচডেল গ্রুমিং গ্যাংয়ের আহমেদ-সহ অন্য দুই প্রধান অভিযুক্তকে ফেরত নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল ইসলামাবাদ; তাদের দাবি ছিল, এই ব্যক্তিরা নাগরিকত্ব ত্যাগ করায় তারা আর পাকিস্তানি নাগরিক নয়। তবে ওই পাকিস্তানি কর্মকর্তা ব্রিটিশ সংবাদপত্রটিকে জানিয়েছেন, আহমেদকে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়ার পথ সুগম করতে ইসলামাবাদ এখন প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে 'ব্যতিক্রমী কিছু' ভাবতেও প্রস্তুত।
পাকিস্তানের দাবি
এর বিনিময়ে ইসলামাবাদ ব্রিটেনে বসবাসরত বেশ কয়েকজন ভিন্নমতাবলম্বী এবং রাজনৈতিক কর্মীকে নিয়ে ব্রিটেনের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থার দুই কড়া সমালোচক-শাহজাদ আকবর এবং আদিল রাজা রয়েছেন, যাদের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের জন্য ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মন্ত্রিসভার সদস্য আকবর এবং পাকিস্তানের প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা ও সাংবাদিক আদিল রাজার বিরুদ্ধে 'ভুয়ো খবর' ও রাষ্ট্রবিরোধী প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগে গত বছরের ডিসেম্বরে তাঁদের প্রত্যর্পণ চেয়েছিল ইসলামাবাদ। এছাড়াও, গত তিন দশক ধরে ব্রিটেনে নির্বাসিত জীবনযাপন করা মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা আলতাফ হোসেনকেও পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য লন্ডনের কাছে বারবার অনুরোধ করেছে তারা।
পাকিস্তানি কর্মকর্তা 'টেলিগ্রাফ'-কে বলেন, 'এমন কিছু মানুষ আছেন যারা ব্রিটিশ আইন লঙ্ঘন করে পাকিস্তানের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে ব্রিটেনের মাটি ব্যবহার করছেন, কিন্তু ব্রিটেন তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করছে না।' তিনি আরও বলেন, 'ব্রিটেন আমাদের বলে যে এই দুষ্কৃতকারীরা আইন মেনে চলে এবং সে দেশের আইন অনুসরণ করছে। তারা আমাদের বলে যে তাদের মানবাধিকার এবং বাকস্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। আমরা প্রমাণ শেয়ার করেছি যে তারা ঘৃণা, সহিংসতা এবং সামাজিক অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে, কিন্তু ব্রিটেন আমাদের কথা শুনছে না। এই দ্বিমুখী নীতি কেন?'
ব্রিটেন-পাকিস্তান আলোচনার অন্তরালে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রুমিং গ্যাংয়ের মাস্টার মাইন্ড আহমেদের মুক্তির বিষয়টি মাথায় রেখে তাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ব্রিটিশ ও পাকিস্তান সরকার গত প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা করছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, 'আমাদের যুক্তি হলো তাদেরও (ব্রিটেন) আমাদের কথা শুনতে হবে। উভয় পক্ষকেই নিয়ম মেনে চলতে হবে। পাকিস্তান কেবল ব্রিটেনের সুবিধাজনক শর্ত ও নিয়মকানুন মেনে নিতে বাধ্য নয়।' তিনি আরও বলেন, 'ব্রিটেন ভালো করেই জানে আমাদের দাবিগুলো কী। আমরা আমাদের দাবি এবং উদ্বেগের কথা ব্রিটেনের কাছে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছি। ব্রিটেনের কিছু মানুষ কেবল মিডিয়া গেম খেলছে। তারা সৎ আচরণ করছে না।'
ব্রিটেনের হুমকি
পাকিস্তানি কর্মকর্তার অভিযোগ, ইসলামাবাদ যদি আহমেদকে ফেরত নিতে বাধা দেয়, তবে পাকিস্তানের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং দেশটিতে বৈদেশিক সাহায্য কাটছাঁট করার বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার 'গোপনে এবং প্রকাশ্যে' হুমকি দিয়েছে। 'এমন একজন ব্যক্তির জন্য এই দাবিগুলো করা হচ্ছে যার বয়স এখন প্রায় ৭৫ বছর এবং যিনি আপনাদের দেশেই ৬০ বছরেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন। তিনি যখন আসলেই আমাদের নাগরিক নন, তখন তিনি কীভাবে আমাদের নাগরিক হন? এটি অহংকার এবং একটি ঔপনিবেশিক মানসিকতা। এটি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়,' বলেন ওই কর্মকর্তা। তিনি আরও বলেন, 'আমাদের নিজস্ব ব্যবস্থা ও আইন রয়েছে এবং ব্রিটেন সরকার ও রাজনীতিবিদদের উচিত আমাদের আইনি অবস্থান এবং আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে সম্মান জানানো।'
ব্রিটেনের বাড়তে থাকা দাবি
প্রতিবেদন অনুসারে, ইসলামাবাদ এর আগে 'সৌহার্দ্যের নিদর্শন হিসেবে গ্রুমিং গ্যাংয়ের কিছু সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীকে ফেরত নিতে' সম্মত হয়েছিল, তবে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের দাবি, লন্ডনের চাহিদার তালিকা এখন আরও দীর্ঘ হয়েছে। রচডেলের দুই সাজাপ্রাপ্ত গ্রুমার হামিদ শাফি এবং মহম্মদ সাজিদকে ইতিমধ্যে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়েছে।পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, 'আপনারা এখন এক ভিন্ন পাকিস্তানের মুখোমুখি। এই অহংকার আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা জোর খাটানোয় বিশ্বাস করি না, আর এই জোর খাটানোর নীতি কোনও ফলাফল বয়ে আনবে না। আপনারা এখন যে পাকিস্তানের সঙ্গে ডিল করছেন তা কয়েক বছর আগের পাকিস্তান নয়। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের একটি সরকার, যাকে ব্ল্যাকমেইল করা যাবে না।'
আইন সংশোধনের কথা ভাবছে ব্রিটেন
এদিকে, আহমেদের মতো ব্যক্তিদের পাকিস্তানে ফেরত পাঠাতে বাধা সৃষ্টিকারী 'ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট ১৯৭১'-এর ধারাগুলো বাতিলের কথা বিবেচনা করছে ব্রিটেন সরকার। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ জানিয়েছেন যে, জরুরি আইন প্রণয়ন-সহ সমস্ত পথই এখন খোলা রাখা হয়েছে। শাবানা মাহমুদ ভিসা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টিও বিবেচনা করছেন, তবে এটিকে 'চরম পদক্ষেপ' হিসেবে দেখা হচ্ছে যা কেবল অন্য সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেই প্রয়োগ করা হবে।
E-Paper

