Indus Water Treaty: আইনি মারপ্যাঁচে চিৎপটাং পাকিস্তান!সিন্ধুর জল পেতে সালিশি আদালতে দিল্লিরও খরচ জোগাচ্ছে ইসলামাবাদ
Indus Water Treaty: ১৮৯৯ সালে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে প্রতিষ্ঠিত পার্মানেন্ট কোর্ট অফ আরবিট্রেশনে সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। ২০১০ সালে প্রথমবার সেখানে দায়ের হয় মামলা।
Indus Water Treaty: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐতিহাসিক সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিবাদ এবার এক নজিরবিহীন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নেমে একেবারে লেজে গোবরে অবস্থা পাকিস্তানের। আইনি প্যাঁচে পড়ে নয়াদিল্লির ভাগের উকিল-মোক্তারের খরচও জোগাতে বাধ্য হচ্ছে ইসলামাবাদ। আর সেটা মোটেই এক-দু’টাকা নয়। এর জন্য কড়কড়ে ছ’লক্ষ ডলার পকেট থেকে দিতে হয়েছে তাদের। মামলা আরও দীর্ঘ হলে এই অঙ্ক যে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অন্যদিকে, রায় মানার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার।
এই নতুন উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে ২০২৫ সালের এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর। ওই হামলায় পর্যটক-সহ ২৬ জনের মৃত্যু হয়। নয়াদিল্লির স্পষ্ট অভিযোগ ছিল, এই কাপুরুষোচিত হামলার পিছনে রয়েছে পাকিস্তান-ভিত্তিক মদদপুষ্ট জঙ্গিরা। এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হিসেবে নরেন্দ্র মোদী সরকার ১৯৬০ সালের ঐতিহাসিক সিন্ধু জলচুক্তিটি সাময়িকভাবে স্থগিত বা ‘অচল’ রাখার নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের সাফ কথা, এক হাতে সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাস ছড়ানো আর অন্য হাতে বন্ধুত্বের খাতিরে জলচুক্তির সুবিধা নেওয়া- দুই নীতি একসঙ্গে চলতে পারে না। ভারতের এই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মারপ্যাঁচের পর থেকেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ জলসঙ্কট তীব্রতর হতে শুরু করেছে এবং ইসলামাবাদের রক্তচাপও চড়চড় করে বাড়ছে। সংবাদমাধ্যম ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে, তবে নয়াদিল্লির এহেন সিদ্ধান্তের আগেই অবশ্য পার্মানেন্ট কোর্ট অফ আরবিট্রেশনে (পিসিএ) মামলা দায়ের করে ইসলামাবাদ। এবার তাতে অংশ নেয়নি নয়াদিল্লি। এর জেরে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে ভারতের যাবতীয় খরচ-খরচা বহন করতে বাধ্য হচ্ছে পশ্চিমের প্রতিবেশী। অর্থাৎ, জলের জন্য আর্থিক সঙ্কট সত্ত্বেও জলের মতো ব্যয় করছে তারা।
বিবাদের সূত্রপাত
১৮৯৯ সালে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে প্রতিষ্ঠিত পার্মানেন্ট কোর্ট অফ আরবিট্রেশনে সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছে ভারত ও পাকিস্তান। ২০১০ সালে প্রথমবার সেখানে দায়ের হয় মামলা। ওই সময় নির্মীয়মাণ কিষাণগঙ্গা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নকশা নিয়ে আপত্তি তোলে ইসলামাবাদ। পরবর্তী কালে তাদের অভিযোগপত্রে যুক্ত হয় রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নামও। পাকিস্তানের অভিযোগ, কিষাণগঙ্গা এবং রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে সিন্ধু জল চুক্তি লঙ্ঘন করছে ভারত। ২০১৬ এবং ২০২৩ সালে এই ইস্যুতে ফের ওই আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয় ইসলামাবাদ। কিন্তু, পহেলগাঁও জঙ্গি হামলার পর সমঝোতা স্থগিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে বেড়েছে জটিলতা। গোদের উপর বিষফোড়ার মতো, এ ব্যাপারে রায় দেওয়ার এক্তিয়ার পিসিএ-র নেই বলে স্পষ্ট জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
পাকিস্তান কেন ভারতের বিল পরিশোধ করছে?
দ্য হেগের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে মামলা নিষ্পত্তির একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে। সেটা হল, আইনি লড়াই চলাকালীন দু’পক্ষকেই সমান ভাগে বহন করতে হয় তার ব্যয়ভার। তবে, এক পক্ষ তাতে অংশগ্রহণ না করলেও চলতে পারে সওয়াল-জবাব। সেক্ষেত্রে যাবতীয় খরচ-খরচা দিয়ে যাবে অপর পক্ষ। এই নিয়মের জাঁতাকলে পড়ে পাকিস্তানকে মোটা টাকা দিতে হচ্ছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর। বিশেষজ্ঞদের দাবি, আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে গিয়ে নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছে ইসলামাবাদ। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখান থেকে সরে এলে বিশ্বমঞ্চে সিন্ধু জল চুক্তির ব্যাপারে কথা বলার অধিকার হারাবে তারা। আর তাই বিপুল খরচের ধাক্কা সত্ত্বেও একতরফা ভাবে মামলা চালাতে বাধ্য হচ্ছে পাক সরকার, যেটা আর্থিক ভাবে দেউলিয়ার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা পশ্চিমের প্রতিবেশীর জন্য দুঃস্বপ্নের।
ভারতের অবস্থান
অন্যদিকে, এই মামলা থেকে সরে আসার পাশাপাশি সিন্ধুর উপনদীগুলির উপর নির্মীয়মাণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি নিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভারত। নয়াদিল্লি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত বিষয়গুলি কোনও সালিশি আদালত দেখতে পারে না। কোনও নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে এই বিরোধের নিষ্পত্তি সম্ভব। আর তাই ট্রাইবুন্যালকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে তার যাবতীয় রায় ‘বাতিল ও অকার্যকর’ করার ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
আর্থিক সঙ্কটে পাকিস্তান
তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, গত কয়েক বছর ধরেই চরম আর্থিক সঙ্কটে ভুগছে পাকিস্তান। সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের (আইএমএফ) কাছে ৭০০ কোটি ডলারের ঋণ চেয়েছে ইসলামাবাদ। কিন্তু, তার মধ্যেই সিন্ধু জল চুক্তির জন্য আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে কোটি কোটি ডলার দিতে হচ্ছে তাদের। পাশাপাশি, পাক প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ নয়াদিল্লিকে দিয়েছেন যুদ্ধের হুমকিও। সিন্ধু জল চুক্তি স্থগিত হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই ভারতকে পরমাণু হামলার হুমকি দেন পাকিস্তানের সেনা সর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স ফোর্সেস) ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। প্রায় একই কথা বলতে শোনা গিয়েছে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির পুত্র তথা প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী ও পাকিস্তান পিপ্লস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাবল ভুট্টোকে। সিন্ধু নদীতে হয় জল, নয়তো রক্ত বইবে বলে নয়াদিল্লিকে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট তালিকায় নাম আছে পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মাসুদিক মালিকেরও। এ বছরের জুনে একটি সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, ‘যারা আমাদের ভাগের জল দাবি করছে, আমরা তাদের হাত কেটে নেব।’ তাঁর ওই হুমকির পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল। তাঁর কথায়, ‘এই চুক্তির ব্যাপারে আমাদের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকছে। ইসলামাবাদকে সীমান্ত পার সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে।’ পাকিস্তানের এই ধারাবাহিক হুমকির মুখেও নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও নড়েনি ভারত।
E-Paper

