মার্কিন অস্ত্র ভাণ্ডারে টান! ইরান যুদ্ধ আরও ১০ দিন চললে সঙ্কটে পড়বেন ট্রাম্প? সতর্কবার্তা পেন্টাগনের
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারসেপ্টর মিসাইল- যা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে ব্যবহৃত হয়, সেগুলির দ্রুত ঘাটতি দেখা যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র–ইজরায়েল ও ইরান সংঘাত ক্রমশ এক ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। এই সংঘাতে কৌশলের পাশাপাশি বড় বিষয় হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। বিশেষ করে অস্ত্রের খরচ অর্থনীতিকে ভয়াবহ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। অস্ত্র মজুত করতে গিয়ে সেই অঙ্ক আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত যদি আরও ১০ দিন স্থায়ী হয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বিপজ্জনক স্তরে নেমে আসতে পারে বলে পেন্টাগন থেকে সতর্ক করা হয়েছে।
দীর্ঘ সংঘাতের ফলে কেবল অস্ত্রের সংকটই তৈরি হবে না, বরং ফুরিয়ে যাওয়া গোলাবারুদ পুনরায় সংগ্রহ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল অঙ্কের ব্যয়ভার বহন করতে হবে। শুক্রবার বিকেলেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনায় তিনি সন্তুষ্ট নন। তিন ঘণ্টা পরই তিনি হামলার নির্দেশ দেন, যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-সহ দেশের বহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এরপরেই প্রতিশোধে ইরান বাহরিন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও ইরাকের মার্কিন দূতাবাস ও সেনাঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, পেন্টাগন ট্রাম্পকে সতর্ক করেছে যে যুদ্ধ দীর্ঘ সময়ে টানলে মার্কিন মিসাইল ও যুদ্ধাস্ত্রের মজুত পুনরায় ভরাট করতে বিপুল খরচ হতে পারে।
যদিও মঙ্গলবার ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে পরিমাণ অস্ত্র মজুত আছে, তা দিয়ে চিরকাল যুদ্ধ চালানো সম্ভব। তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের কাছে অস্ত্রের প্রায় অসীম মজুত আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রে সমৃদ্ধ এবং বড় বিজয় নিশ্চিত করতে প্রস্তুত আছে।' একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর পূর্বসূরী জো বাইডেন ইউক্রেনকে অনেক বেশি পরিমাণে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ করে ফেলেছেন। তবে সোমবার ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে এক বিবৃতিতে বলেন, 'শুরু থেকেই আমরা চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের পূর্বাভাস দিয়েছিলাম, তবে আমাদের এর চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে যাওয়ার ক্ষমতা আছে।'
অস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টারসেপ্টর মিসাইল- যা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র আটকাতে ব্যবহৃত হয়, সেগুলির দ্রুত ঘাটতি দেখা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই মার্কিন অস্ত্রভান্ডারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিছুটা ফুরিয়ে এসেছে, বিশেষত ইজরায়েল ও ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সহায়তা দেওয়ার পর। এমনকী জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সতর্ক করেছেন যে, ইজরায়েল ও ইউক্রেনকে বিপুল সামরিক সহায়তা দেওয়ার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মজুত ইতিমধ্যে বেশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। গত বছরের ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের থাড ইন্টারসেপ্টরের প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যবহার করে ফেলেছিল। বর্তমান সংঘাতে ইরান যেভাবে ড্রোনের ব্যবহার করছে, তা মোকাবিলা করার জন্য যে পরিমাণ ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর প্রয়োজন, তার উৎপাদন হার অত্যন্ত ধীর। মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরান মাসে প্রায় ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাসে মাত্র ৬ থেকে ৭টি ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে সক্ষম।
যুদ্ধের আর্থিক বোঝা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে। গত শনিবার ইজরায়েল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। সূত্রের খবর, মার্কিন বাহিনীর হামলার প্রথম ২৪ ঘণ্টায় খরচ হয়েছে ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার যা ভারতীয় টাকায় প্রায় ৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।
ইরান যুদ্ধের খরচ
সেন্টার ফর নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির তথ্য বলছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় এয়ারক্র্যাফ্ট ক্যারিয়ার ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড-সহ একটি ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’ পরিচালনায় দৈনিক খরচ প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন ডলার। বিমান মোতায়েন, যুদ্ধজাহাজ পাঠানো, আঞ্চলিক ঘাঁটি সক্রিয় করা- ইরান অভিযানের আগে মার্কিন সেনা যে বিশাল সামরিক প্রস্তুতি নেয় তার জন্য খরচ প্রায় ৬৩০ মিলিয়ন ডলার। পেন হোয়ার্টন বাজেট মডেলের ডিরেক্টর কেন্ট স্মেটার্স পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, ট্রাম্পের ইঙ্গিত অনুযায়ী যদি এই যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হয়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট ব্যয়ের পরিমাণ ২১০ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। গত এক বছরে কেবল ইজরায়েলকে সামরিক সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অভিযানে ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করে ফেলেছে।
E-Paper











