Tipra Motha Supremo: ত্রিপুরা রাজনীতিতে ছন্দপতন! সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর ঘোষণা রাজা প্রদ্যোৎ মাণিক্যর
Tipra Motha Supremo: প্রদ্যোৎ দেববর্মা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে জনজাতিদের বিভিন্ন দাবির জন্য তিনি রাজনৈতিক ভাবে লড়াই করেছেন। কিন্তু শারীরিক ও মানসিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
Tipra Motha Supremo: ত্রিপুরার রাজনীতিতে আচমকা ছন্দপতন! আগামী মাস থেকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করলেন ত্রিপুরার রাজপরিবারের সদস্য তথা ‘তিপ্রা মথা’র প্রধান প্রদ্যোৎ কিশোর মাণিক্য দেববর্মা। সদ্য সমাপ্ত গ্রাম কমিটি নির্বাচনে দলের সাফল্যের পর বুধবার সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ চিঠিতে রাজনীতি ছাড়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি।

প্রদ্যোৎ দেববর্মা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে জনজাতিদের বিভিন্ন দাবির জন্য তিনি রাজনৈতিক ভাবে লড়াই করেছেন। কিন্তু শারীরিক ও মানসিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাই আর কোনও সক্রিয় রাজনৈতিক পদে থাকবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নিজের সিদ্ধান্তকে আবেগের বশে নেওয়া বলে মানতে নারাজ প্রদ্যোৎ। তাঁর দাবি, বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় যাঁরা তাঁর পাশে ছিলেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। তিনি জনগণের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার পরিস্থিতিতে সরব হওয়া অব্যাহত রাখবেন, তবে নির্বাচনী রাজনীতিতে আর থাকবেন না। তাঁর কথায়, 'শারীরিক সমস্যার কারণে আগামী মাসের পর আমার রাজনৈতিক যাত্রা আর অব্যাহত থাকবে না।'
লাগাতার সফর, রাজনৈতিক আলোচনা, জনদায়িত্ব এবং নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন তাঁর স্বাস্থ্য ও পারিবারিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে বলে প্রদ্যোৎ উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিপ্রাসা (Tiprasa) জনগোষ্ঠীর অধিকার খর্ব হলে বা তাদের দাবি উপেক্ষিত হলে তিনি বরাবরের মতোই সাধারণ মানুষের হয়ে সোচ্চার থাকবেন। ত্রিপুরার ভূমিপুত্র ও জনজাতি সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক সুরক্ষা ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই আবর্তিত হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন। সমমনোভাবাপন্ন দল ও সংগঠনগুলিকে একত্রিত করার লক্ষ্যে 'এক মঞ্চ, এক সুর, এক থানসা (ঐক্য)'—এই আহ্বানে তিনি তিপ্রা মথা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০২৪ সালে কেন্দ্র, ত্রিপুরা সরকার এবং তিপ্রা মথার মধ্যে স্বাক্ষরিত 'তিপ্রাসা চুক্তি' (Tiprasa Accord) ছিল তাঁর দীর্ঘ লড়াইয়ের অন্যতম মাইলফলক। চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই এর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং রাজ্যের জনজাতিদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য লাগাতার সওয়াল করে এসেছেন তিনি।
দলের বিস্তৃতির কথা তুলে ধরে দেববর্মা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই আন্দোলন গোটা ত্রিপুরায় অভাবনীয় শক্তি অর্জন করেছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন যে বর্তমানে তিপ্রা মথার ৩,৪২৮ জন নির্বাচিত গ্রাম পরিষদ নেতা, ২৪ জন এডিসি সদস্য (MDC) এবং ১৩ জন বিধায়ক (MLA) রয়েছেন। তবে তিপ্রাসা চুক্তি নিয়ে আলোচনার জটিল পর্ব তাঁর মানসিক ও শারীরিক শক্তির ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি করেছে বলে তিনি স্বীকার করেন। মতানৈক্য, হতাশা এবং বিভিন্ন স্বার্থের সংঘাত অনেক সময় আন্দোলনকে দুর্বল করেছে বলেও তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। সেই প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বৃহত্তর লক্ষ্যের দিকে নজর রাখার বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, 'তিপ্রাসা চুক্তি কোনও একক ব্যক্তি, দল বা রাজনৈতিক পদের ঊর্ধ্বে। এটি আমাদের জনগণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের স্মারক।'
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এই চুক্তির যাবতীয় শর্ত কার্যকর করার জন্য সমস্ত পক্ষের প্রতি ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি। নিজের ক্ষমতার মোহহীনতার কথা পুনর্ব্যক্ত করে দেববর্মা বলেন, 'আমি কখনও ক্ষমতা বা পদের জন্য রাজনৈতিক পদ চাইনি।' তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল ত্রিপুরার মানুষের ন্যায়বিচার, মর্যাদা এবং একটি সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। সক্রিয় রাজনীতি ছাড়লেও রাজ্যবাসীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে অটুট থাকবে, তা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, 'আমি আর রাজনৈতিক পদে থাকব না, কিন্তু আমি সর্বদা আমাদের জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত থাকব এবং তাদের মর্যাদা, অধিকার ও ভবিষ্যতের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকব।'
ত্রিপুরার মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন ভুলভ্রান্তি ও হতাশাকে বিনম্রভাবে স্বীকার করে তিনি জানান, 'কোনও ক্ষোভ নিয়ে নয়, একরাশ কৃতজ্ঞতা নিয়ে আমি সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিদায় নিচ্ছি।' নিজের বার্তার সমাপ্তি টেনে তিনি বলেন, 'জীবন আমাকে যেখানেই নিয়ে যাক না কেন, ত্রিপুরা সর্বদা আমার হৃদয়ে থাকবে।' সব মিলিয়ে, প্রদ্যোৎ মাণিক্যের জনপ্রিয়তা ও সংগঠনের উপর তাঁর প্রভাবের কারণে তাঁর সিদ্ধান্তের পর তিপ্রা মথার ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তবে দল ও ত্রিপুরার রাজনীতিতে তাঁর পরবর্তী ভূমিকা কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
E-Paper

