Biju Patnaik: ইন্দোনেশিয়ায় বিজু পট্টনায়েককে ভুসয়ী প্রশংসা প্রধানমন্ত্রী মোদীর, নেপথ্যে দুঃসাহসিক কাহিনী

Biju Patnaik: আজ অনেকেই বিজু পট্টনায়েককে ওড়িশায় তাঁর যুগান্তকারী সংস্কারের জন্য স্মরণ করবেন। কিন্তু তার আগে, তিনি ছিলেন একজন অসমসাহসী পাইলট, যিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

Published on: Jul 7, 2026, 23:38:55 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

Biju Patnaik: বুধবার জাকার্তায় ইন্দোনেশিয়ার সংসদে ভাষণ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়া এক 'স্বর্ণযুগে' প্রবেশ করছে। তবে, ভারত-ইন্দোনেশিয়ার এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মূল কারিগর ছিলেন ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজু পট্টনায়েক, যিনি ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ইন্দোনেশিয়ায় বিজু পট্টনায়েককে ভুসয়ী প্রশংসা প্রধানমন্ত্রীর (PTI)
ইন্দোনেশিয়ায় বিজু পট্টনায়েককে ভুসয়ী প্রশংসা প্রধানমন্ত্রীর (PTI)

ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে বিজু পট্টনায়েক ছিলেন একজন দক্ষ পাইলট। ১৯৪৬ সালে ডাচরা জাভায় আক্রমণ চালালে ইন্দোনেশিয়ার নেতাদের উদ্ধার করার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু তাঁর দক্ষতা ও সাহায্য চেয়েছিলেন। চরম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে পট্টনায়েক এবং তাঁর স্ত্রী যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বিমান নিয়ে উড়ে যান এবং ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সুতান সাজরির ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মহম্মদ হাত্তাকে নিরাপদে উদ্ধার করে ভারতে নিয়ে আসেন। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারত ও ইন্দোনেশিয়াকে 'কাছাকাছি' নিয়ে আসার জন্য পট্টনায়েকের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, 'আমাদের উভয় দেশই প্রায় একই সময়ে স্বাধীনতা লাভ করেছিল: ইন্দোনেশিয়া ১৯৪৫ সালে এবং ভারত ১৯৪৭ সালে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন যখন আসে, তখন রাষ্ট্রসংঘে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থনে ভারত এক জোরালো কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল।' তিনি আরও বলেন, ;সেই সময়ে শ্রদ্ধেয় বিজু পট্টনায়েক যে ভূমিকা পালন করেছিলেন-যেভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রী সুতান সাজরির এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট মহম্মদ হাত্তাকে নিরাপদে ভারতে নিয়ে এসেছিলেন, তা দুই দেশকে আরও কাছাকাছি এনেছে।' মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া এই বিপজ্জনক মিশনের জন্য ১৯৫৫ সালে জাকার্তা সরকার পট্টনায়েককে 'বিনতাং জাসা উতামা' (ফার্স্ট ক্লাস অফ স্টার অফ সার্ভিস) সম্মানে ভূষিত করে। এর ছয় বছর পর, ১৯৬১ সালে তিনি ওড়িশার চতুর্থ মুখ্যমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তিনি আরও এক মেয়াদে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিজু পট্টনায়েক এবং ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম

আজ অনেকেই বিজু পট্টনায়েককে ওড়িশায় তাঁর যুগান্তকারী সংস্কারের জন্য স্মরণ করবেন। কিন্তু তার আগে, তিনি ছিলেন একজন অসমসাহসী পাইলট, যিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন, ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। পট্টনায়েক ১৯৩০ সালে দিল্লি ফ্লাইং ক্লাবে প্রশিক্ষণ শুরু করেন এবং ১৯৩৬ সালে বিমান বাহিনীতে (তখন রয়্যাল ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স নামে পরিচিত ছিল) যোগ দেন। এদিকে, ১৯৪৫ সালের ১৭ আগস্ট ইন্দোনেশিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ডাচরা প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই দ্বীপপুঞ্জ শাসন করেছিল। কিন্তু এর মাত্র এক বছর পর, ডাচরা ঔপনিবেশিক শাসন পুনপ্রতিষ্ঠার জন্য সেখানে পূর্ণ মাত্রায় সামরিক আক্রমণ শুরু করে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সুকর্ণকে গৃহবন্দী করা হয়।

নেহেরু, যিনি ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতাকে সমগ্র এশিয়ার মুক্তি সংগ্রামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতেন, তিনি পট্টনায়েকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাজরির এবং তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্টকে জাভা থেকে উদ্ধার করে ভারতে নিয়ে আসার জন্য তিনি পট্টনায়েকের ওপর এক দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযানের দায়িত্ব সোপর্দ করেন। পট্টনায়েক সানন্দে সেই অনুরোধ গ্রহণ করেন। ডগলাস ডাকোটা নামক দুই-ইঞ্জিন বিশিষ্ট বিমানে চড়ে পট্টনায়েক এবং তাঁর স্ত্রী জ্ঞানদেবী এই মিশনে রওনা হন। আসলে, লাহোরের বাসিন্দা জ্ঞান পট্টনায়েক ছিলেন প্রথম ভারতীয় নারী যিনি বাণিজ্যিক পাইলটের লাইসেন্স পেয়েছিলেন। তাঁদের পুত্রের জন্মের মাত্র ১৪ দিন পর এই দম্পতি এই বিপজ্জনক মিশনে বেরিয়ে পড়েন। ১৯৪৭ সালের ২১ জুলাই পট্টনায়েক ও তাঁর স্ত্রী জাকার্তায় পৌঁছান। এই যাত্রাটি মোটেও ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। সিঙ্গাপুর থেকে জাভা দ্বীপপুঞ্জের দিকে যাওয়ার সময় ডাচরা তাঁদের বিমান লক্ষ্য করে গুলি করে নামানোর হুমকি দিয়েছিল। তবে 'কলিঙ্গ বুল' নামে পরিচিত পট্টনায়েক দমে যাননি। তিনি সাজরির এবং হাত্তাকে নিরাপদে বিমানে করে প্রথমে সিঙ্গাপুরে এবং সেখান থেকে ভারতে নিয়ে এসে মিশনটি সফলভাবে সম্পন্ন করেন। বাকিটা, যেমনটা বলা হয়, ইতিহাস।

ইন্দোনেশিয়ার 'দ্বিতীয়' স্বাধীনতা

১৯৪৭ সালের ২৪ জুলাই সাজরির এবং হাত্তা দিল্লিতে একটি সংবাদিক সম্মেলন করেন এবং বিশ্বের দরবারে ইন্দোনেশিয়ার দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। সেই বছরই ডাচদের এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসংঘে একটি প্রস্তাব আনে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ডাচরা পিছু হটতে শুরু করে। এরপর থেকে ইন্দোনেশিয়া পট্টনায়েকের এই অনবদ্য ভূমিকার কথা কখনোই ভুলতে পারেনি। আজও দিল্লির ইন্দোনেশিয়ান দূতাবাসে বিজু পট্টনায়েকের স্মরণে একটি বিশেষ কক্ষ উৎসর্গ করা রয়েছে। বিজু পট্টনায়েকের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার একটি ব্যক্তিগত পারিবারিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছিল। পট্টনায়েকের এই বীরত্বপূর্ণ কাজের পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ তাঁকে তাঁর সদ্যোজাত কন্যার নাম রাখার অনুরোধ করেছিলেন। পট্টনায়েক দম্পতি তাঁর নাম রেখেছিলেন 'মেঘবতী।' পরবর্তীতে ২০০১ সালে তিনি ইন্দোনেশিয়ার প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯৭ সালে যখন বিজু পট্টনায়েক শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন ইন্দোনেশিয়া সরকার তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে দেশে সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছিল।