'পাকিস্তানই প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে!' কানাডিয়ান বিশেষজ্ঞের চাঞ্চল্যকর দাবি
Nuclear weapons: ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের মতো ভূ-রাজনৈতিক পূর্বাভাসের জন্য খ্যাতি অর্জনকারী অধ্যাপক জিয়াং কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে পরমাণু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বাভাস দেননি। বরং তিনি এর ঠিক বিপরীত কথাই বলেছেন।
Nuclear weapons: পরমাণু যুগে সবচেয়ে ভীতিকর প্রশ্নটি এটি নয় যে কার কাছে সবচেয়ে বেশি পরমাণু অস্ত্র (Nuclear weapons) আছে। বরং বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সংকট দেখা দিলে প্রথম কে এই অস্ত্রের ট্রিগারে চাপ দেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একমাত্র একবারই পরমাণু বোমা ব্যবহৃত হয়েছিল। এরপর থেকে অনেক দেশই পরমাণু অস্ত্র প্রযুক্তির অধিকারী হয়েছে এবং এই অস্ত্রগুলো আরও বেশি বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে। তত্ত্ব-ভিত্তিক পূর্বাভাসের জন্য পরিচিত চিন-বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান শিক্ষাবিদ ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক জিয়াং শুয়েকিন (Jiang Xueqin)-সেই প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছেন। কারা পরবর্তী সময়ে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে?

সম্প্রতি অধ্যাপক জিয়াং ইউটিউবার রাজ শামানির (Raj Shamani) পডকাস্টে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। সেই আলোচনার ভিডিও ১১ আগস্ট আপলোড করা হয়। ভবিষ্যতের কোনও সংঘাতে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জিয়াং এমন এক পূর্বাভাসের কথা বলেন, যেখানে ভারতের পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশটিকে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। অধ্যাপক জিয়াং বলেন, সবার আগে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধের মতো ভূ-রাজনৈতিক পূর্বাভাসের জন্য খ্যাতি অর্জনকারী অধ্যাপক জিয়াং কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে পরমাণু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বাভাস দেননি। বরং তিনি এর ঠিক বিপরীত কথাই বলেছেন। তাঁর কথায়, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি না যে, আমাদের জীবদ্দশায় কখনও পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা হবে। কারণ এই অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞার মানসিকতা রয়েছে।’ তবে এরপরই ৫০ বছর বয়সি এই শিক্ষাবিদ একটি বিশেষ শর্ত বা সতর্কবার্তা যোগ করেন। তিনি বলেন, ‘যদি আমাকে অনুমান করতে বলা হয় যে, কোন দেশ প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, তাহলে আমি বলব ভারত অথবা পাকিস্তান। সম্ভবত পাকিস্তান।’
অধ্যাপক জিয়াংয়ের মতে, পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা দেশটির যুদ্ধ করার ইচ্ছার চেয়ে তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। দুই ঘন্টা দীর্ঘ পডকাস্টে তিনি বলেন, 'পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্রধারী একটি অত্যন্ত দুর্বল, বিশৃঙ্খল ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র। জরুরি পরিস্থিতিতে নিজেদের সংযত রাখার মতো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হয়তো তাদের নেই।' গত মার্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সাংবাদিক মেহেদি হাসানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জিয়াং স্বীকার করেছিলেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে কোনও অধ্যাপক নন। মানুষ তাঁকে অধ্যাপক বলে ডাকতে শুরু করেছে।
ভারত কেন পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করবে না?
জিয়াং পাকিস্তানকে 'দুর্বল, দরিদ্র, দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিভক্ত' হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, যদি কখনও পরমাণু অস্ত্র ব্যবহৃত হয়, তবে সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ। এই পূর্বাভাসটি একটি উদ্বেগজনক মূল্যায়ন হলেও, এটি এমন এক কৌশলগত বাস্তবতার উপর আলোকপাত করে যা কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করে আসছে। ভারত ও পাকিস্তানের পরমাণু নীতি বা মতবাদ (nuclear doctrines) এক নয়। ভারত দীর্ঘদিন ধরে ‘প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার’ (No First Use) নীতি ঘোষণা করে আসছে। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নীতি নিয়ে বিতর্ক হয়েছে এবং এতে কিছু শর্ত বা ব্যাখ্যা যুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান ইচ্ছাকৃতভাবেই কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রেখেছে এবং ‘প্রথমে ব্যবহার না করার’ নীতি গ্রহণ করেনি। পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার মূলত ভারতের বিশাল প্রথাগত সামরিক সক্ষমতাকে প্রতিহত বা নিবৃত্ত (deter) করার লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত।
অধ্যাপক জিয়াং-এর যুক্তিটি মূলত সেই অসামঞ্জস্য বা পার্থক্যের উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে ভারতের পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পাকিস্তানের তা ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে।' ২০০০-এর দশকের শুরু থেকেই পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক বক্তব্যে এই হিসাব-নিকাশ বা যুক্তি বারবার উঠে এসেছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (SIPRI) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কাছে ১৯০টি পরমাণু ওয়ারহেড রয়েছে, যার মধ্যে ১২টি ওয়ারহেড ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো মোতায়েন করা হয়েছে। পাকিস্তানের কাছে প্রায় ১৭০টি পরমাণু ওয়ারহেড থাকলেও তারা কোনও ওয়ারহেড মোতায়েন করেনি।
পাকিস্তানি নেতৃত্বের বারবার হুমকি
২০০২ সালে কার্গিল যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছিল। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ সতর্ক করেছিলেন যে, দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে পাকিস্তান পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। ২০১৯ সালে পুলওয়ামা সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং ভারতের বালাকোট বিমান হামলার পর, তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সতর্ক করেছিলেন যে পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তা পরমাণু যুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে। এই বার্তাটি মূলত উত্তেজনা বৃদ্ধির পরিণতির বিষয়ে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেওয়া হলেও এর মাধ্যমে পাকিস্তানের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পরিকল্পনায় পরমাণু অস্ত্রের ভূমিকাটিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
পহেলগাঁওয়ে ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ‘অপারেশন সিঁদুর’ (Operation Sindoor)-এর পরেও ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পরমাণু অস্ত্রের প্রসঙ্গ ওঠে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ বলেছিলেন, 'আমাদের অস্তিত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি দেখা দিলে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে। যদিও পরবর্তীতে তিনি পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টিকে খুবই সুদূরপরাহত সম্ভাবনা হিসেবে অভিহিত করেন এবং জানান যে সেই মুহূর্তে এমন কোনও পদক্ষেপের পরিকল্পনা নেই।' পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী ইসহাক দারও বলেছেন যে পরমাণু ওয়ারহেড মোতায়েনের কোনও ইচ্ছা ইসলামাবাদের নেই এবং তাদের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতাই এর জন্য যথেষ্ট। পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জোর দিয়ে বলেন যে তাদের পরমাণু কর্মসূচির লক্ষ্য হল শান্তিপূর্ণ ব্যবহার ও জাতীয় প্রতিরক্ষা-আগ্রাসন চালানো নয়। এদিকে, প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি পাকিস্তানের পরমাণু সক্ষমতাকে ‘বিশ্বাসযোগ্য ন্যূনতম প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ (credible minimum deterrent) হিসেবে অভিহিত করেছেন, যার উদ্দেশ্য হল কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বহিরাগত আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করা। তবে সাম্প্রতিক সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বক্তব্য এসেছে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের কাছ থেকে।
আসিম মুনিরের বক্তব্যও আলোচনায়
পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যও জিয়াংয়ের বিশ্লেষণকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এক নৈশভোজে বলেছিলেন, ‘আমরা একটি পরমাণু শক্তিধর দেশ। আমরা যদি মনে করি যে, আমরা ধ্বংসের দিকে যাচ্ছি, তাহলে বিশ্বের অর্ধেককে সঙ্গে নিয়ে যাব।’ পাকিস্তানের জল সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে-এমন কোনও ভারতীয় বাঁধ ধ্বংসের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের হুমকিও দিয়েছিলেন আসিম মুনির। ভারত পরবর্তীতে তাঁর মন্তব্যকে 'পারমাণবিক শক্তির আস্ফালন' বলে আখ্যা দেয়। পাকিস্তান এই মন্তব্যের সবচেয়ে উদ্বেগজনক সংস্করণটি অস্বীকার করে এবং দাবি করে যে, তারা একটি দায়িত্বশীল পারমাণবিক রাষ্ট্র।
এই পরিস্থিতিটিই অধ্যাপক জিয়াং-এর পূর্বাভাসের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। পাকিস্তানের পরমাণু নীতি দীর্ঘকাল ধরে একটি বিপজ্জনক ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। তা হল প্রচলিত সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা বা দুর্বলতা পুষিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে পরমাণু অস্ত্র কাজ করে। ভারতের প্রচলিত সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি যদি বেশিও হয়, তবুও পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডার এমন এক হাতিয়ার, যা ভারতকে সেই শ্রেষ্ঠত্বের সুযোগ নেওয়া থেকে বিরত রাখবে বলে মনে করা হয়। তবে জিয়াং বলেননি যে, পাকিস্তান পরমাণু হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর উদ্বেগ মূলত এমন একটি পরিস্থিতি নিয়ে, যেখানে প্রচলিত যুদ্ধ এতটাই তীব্র হয়ে উঠল যে পাকিস্তানের নেতৃত্ব মনে করল-দেশের অস্তিত্বই বিপন্ন। তখন পরমাণু অস্ত্র কেবল একটি প্রতিরোধক বা 'ডিটারেন্ট' হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা হয়ে ওঠবে সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ। জিয়াং বলেন, 'তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আমাদের জীবদ্দশায় এই অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা শূন্য শতাংশ।' কিন্তু সেই অতি-নগণ্য সম্ভাবনা যদি কখনও বাস্তবে রূপ নেয়, তবে প্রথম পরমাণু হামলার ঘটনাটি ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত থেকেই শুরু হতে পারে।
E-Paper

