Success Story: মা খেতে কাজ করে মেয়েকে বানালেন সরকারি অফিসার! PSC-তে পঞ্চম স্থান অধিকার নন্দিনীর
Success Story: দ্বাদশ শ্রেণিতে বাবাকে হারান, মায়ের প্রাণপণ লড়াই আর নিজের অদম্য জেদে বাজিমাত করলেন নন্দিনী সাহু। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের ৫ম র্যাঙ্ক অর্জন করে ডেপুটি কালেক্টর নন্দনী সাহু
Success Story: জীবনের প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক না কেন, মনের অদম্য জেদ, কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক লক্ষ্য থাকলে যে কোনও স্বপ্নকেই বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব— এই সত্যকে আরও একবার প্রমাণ করে দেখালেন ছত্তিশগড়ের তরুণী নন্দনী সাহু। ছত্তিশগড় পাবলিক সার্ভিস কমিশন (CGPSC)-র পরীক্ষায় গোটা রাজ্যে পঞ্চম স্থান অর্জন করে তিনি এখন ডেপুটি কালেক্টর। তবে এই সাফল্যের পিছনের পথটি সহজ ছিল না। চরম আর্থিক সংকট, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পিতাকে হারিয়ে দিশেহারা পরিস্থিতি— সব বাধা পেরিয়ে নন্দনীর এই রাজকীয় সাফল্য আজ দেশের লাখ লাখ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার পরীক্ষার্থীদের কাছে এক মহা অনুপ্রেরণা।

বাবার স্বপ্নকেই জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে পথচলা
নন্দনী সাহুর বাড়ি ছত্তিশগড়ের মহাসমুন্দ জেলার বাসনা ব্লকের অন্তর্গত বড়ে সাজাপালি গ্রামে। গ্রামের এক সরকারি স্কুলেই তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার হাতেখড়ি। নন্দনীর বাবা মেঘনাথ সাহু পেশায় ছিলেন একজন শিক্ষক। তাঁর স্বপ্ন ছিল, তাঁর মেয়েদের মধ্যে অন্তত একজন যেন বড় হয়ে জেলা কালেক্টর বা উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার হয়ে সমাজের সেবা করে।
কিন্তু যখন নন্দনী দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়েন, তখনই পরিবারে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। আকস্মিকভাবে মারা যান তাঁর বাবা। উপার্জনক্ষম অভিভাবককে হারিয়ে পরিবারটি গভীর সংকটে পড়ে। তবে শোকাহত নন্দনী ভেঙে পড়েননি; বরং বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নকেই তিনি নিজের জীবনের একমাত্র ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি রায়পুরের ডিগ্রি গার্লস কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে সফলভাবে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
মায়ের সংগ্রাম ও কৃষিকাজের শক্তিতে ঘুরে দাঁড়ানো
নন্দনীর মা রামপ্যাড়ী সাহু প্রথাগত শিক্ষায় মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু দূরদর্শিতা ও সাহসে তিনি কোনো অংশে কম ছিলেন না। স্বামীর প্রয়াণের পর পরিবারের বিশাল দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। একদিকে স্বামীর সামান্য পেনশন, আর অন্যদিকে নিজের হাতে খেত-খামার সামলে তিনি সংসার চালানো ও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন লড়াই শুরু করেন।
পাঁচ বোন ও এক ছোট ভাইয়ের এই বড় পরিবারে অভাব থাকলেও মা কখনও নন্দনীর পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটতে দেননি। এমনকি পরিবার বা সমাজ থেকে বিয়ের কোনো চাপও নন্দনীর ওপর আসতে দেওয়া হয়নি, যাতে সে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারে। ২০১৯ সালে নন্দনীকে নিয়ে তাঁর মা বিলাসপুরে চলে আসেন এবং একটি ভাড়া বাড়িতে থেকে মেয়ের পড়াশোনার জন্য দিনরাত লড়াই করে যান।
ব্যর্থতা পেরিয়ে সাফল্য: ৩ বছর সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরত্ব
নন্দনীর এই পথচলা একবারে মসৃণ হয়নি। সিজিপিএসসি পরীক্ষার শুরুতে কিছুদিন তিনি কোচিং ইনস্টিটিউটে ক্লাস নিয়ে পরীক্ষার সিলেবাস ও ধরন বুঝে নেন। এরপর তিনি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হয়ে সেলফ-স্টাডিতে মন দেন। প্রথম ও দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না এলেও তিনি দমে যাননি। নিজের ভুল ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে নতুন উদ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যান।
মনোযোগ ধরে রাখতে এবং লক্ষ্য থেকে যাতে বিচ্যুতি না ঘটে, তার জন্য নন্দনী টানা তিন বছর সমস্ত ধরনের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন রেখেছিলেন। প্রতিদিন ভোরে উঠে পড়াশোনা শুরু করা এবং দিনের আলোকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহারের কৌশল নিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে সিজিপিএসসি-২০২৩ (CGPSC-2023) পরীক্ষায় তাঁর এই নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের চরম প্রতিফলন ঘটে। নিজের তৃতীয় প্রচেষ্টায় সামগ্রিক তালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করে তিনি ডেপুটি কালেক্টর পদে মনোনীত হন।
তরুণ প্রজন্মের জন্য নন্দনীর বার্তা
নিজের অর্জিত এই অবিস্মরণীয় সাফল্য প্রসঙ্গে নন্দনী সাহু জানান, ‘পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সততা, নিজের ওপর বিশ্বাস এবং ধারাবাহিকতাই শেষ কথা। সাময়িক ব্যর্থতায় হতাশ হওয়া যাবে না। সঠিক সময়ে নিজের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে লড়াই চালিয়ে গেলে সফলতা আসবেই।’
সীমিত সুযোগ-সুবিধা এবং গ্রামের অতি সাধারণ পটভূমি থেকেও যে দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় শীর্ষ স্থান অর্জন করা যায়, তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন নন্দনী ও তাঁর সংগ্রামী মা। তাঁর এই অনন্য পথচলা ছত্তিশগড় তথা সমগ্র দেশের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার্থীদের নতুন আলো দেখাচ্ছে।
E-Paper

