দীর্ঘ ১৩ বছরের লড়াইয়ের সমাপ্তি! দেশে প্রথমবার স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি, ঐতিহাসিক 'সুপ্রিম' রায়

হরিশ রানা বর্তমানে ৩১ বছর বয়সি। ২০১৩ সালে তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন এবং একটি পেয়িং গেস্ট আবাসনে থাকতেন।

Published on: Mar 11, 2026 6:51 PM IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

দেশের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে নজিরবিহীন রায় সুপ্রিম কোর্টের। বুধবার সুপ্রিম কোর্ট গাজিয়াবাদের যুবক হরিশ রানাকে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া বা ‘মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যু’র অনুমতি দিল। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় ১৩ বছর ধরে শয্যাশায়ী এই যুবকের জীবনের যন্ত্রণা আর চিকিৎসকদের পরিস্থিতি বিবেচনা করেই আদালত এই বড়সড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর শীর্ষ আদালতের এই রায়কে দেশে প্যাসিভ ইউথেনেশিয়া সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে নজরবিহীন রায় হিসেবেই মনে করা হচ্ছে। ২০১৮ এবং ২০২৩ সালের ঐতিহাসিক রায়ের পর এই প্রথম কোনও নির্দিষ্ট মামলায় স্বেচ্ছা মৃত্যুর নির্দেশ দিল আদালত।

দেশে প্রথমবার স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি SC-র (সৌজন্যে টুইটার)
দেশে প্রথমবার স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি SC-র (সৌজন্যে টুইটার)

হরিশ রানা বর্তমানে ৩১ বছর বয়সি। ২০১৩ সালে তিনি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে গিয়েছিলেন এবং একটি পেয়িং গেস্ট আবাসনে থাকতেন। সেই আবাসনের চতুর্থ তলা থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। দুর্ঘটনার পর থেকেই তাঁকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। চিকিৎসা চললেও হরিশ আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেননি। তিনি কোয়াড্রিপ্লেজিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভেজিটেটিভ স্টেটেই থেকে যান। শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য তাঁর শরীরে ট্র্যাকিওস্টোমি টিউব বসানো ছিল এবং খাওয়ানোর জন্য গ্যাস্ট্রোজেজুনোস্টোমি টিউব ব্যবহার করা হত। এই অবস্থাতেই বিছানায় শুয়ে গত ১৩ বছর ধরে বেঁচে আছেন তিনি। বাবা-মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের উদ্বেগও বাড়তে থাকে। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ভবিষ্যতে যদি তাঁরা না থাকেন, তবে ছেলের দেখভাল কে করবে। সেই কারণেই সন্তানের জন্য প্যাসিভ ইউথেনেশিয়ার অনুমতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের বোর্ডের মতামত বিবেচনা করেই আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছয়।

এদিন রায় ঘোষণা করতে গিয়ে বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের বেঞ্চ মার্কিন মন্ত্রী হেনরির কথা উদ্ধৃত করে বলেন, ‘ঈশ্বর কোনও মানুষকে জীবন দেওয়ার সময়ে জিজ্ঞাসা করেন না, তিনি এই জীবনকে গ্রহণ করবেন কিনা! অবশ্যই তা গ্রহণ করতে হয়। এই কথাগুলির তাৎপর্য আরও বেড়ে যায় যখন আদালতকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, কোনও ব্যক্তি নিজের মৃত্যুকে বেছে নিতে পারেন কিনা।’ পাশাপাশি, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-এর প্রসিদ্ধ লাইন ‘টু বি অর নট টু বি’-ও উল্লেখ করেন বিচারপতি পারদিওয়ালা। আদালত জানিয়েছে, লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের দুইটি কারণ থাকতে হবে। এক, রোগীর জন্য চিকিৎসা হিসেবে এটাই যোগ্য হতে হবে এবং এটি রোগীর জন্য সর্বোত্তম হতে হবে। শীর্ষ আদালত আরও জানিয়েছে, ১৩ বছর আগে চার তলার ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মারাত্মক চোট পেয়েছিলেন হরিশ রানা। সেই থেকে তিনি ‘পারসিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’ বা পুরোপুরি অচেতন অবস্থায় রয়েছেন। কৃত্রিমভাবে নলের মাধ্যমে খাবার দিয়ে তাঁর শরীরকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর সেরে ওঠার কোনও আশা নেই। বিচারপতিরা স্পষ্ট বলেন, একজন ডাক্তারের দায়িত্ব রোগীর চিকিৎসা করা। ‘যখন রোগীর আরোগ্য লাভের কোন আশা থাকে না তখন সেই দায়িত্বের আর কোনও অর্থ থাকে না।'

আদালত নির্দেশ দিয়েছে, দিল্লির ‘এইমস’-এ হরিশকে ভর্তি করতে হবে। সেখানে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে এবং একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে তাঁর শরীর থেকে যাবতীয় সমস্ত নল ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হবে। বিচারপতিরা হরিশের বাবা-মায়ের দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রশংসা করেছেন। তাঁরা বলেন, 'তাঁর পরিবার এক মুহূর্তের জন্যও তাঁর পাশ থেকে সরেনি...কাউকে ভালোবাসা মানে অন্ধকারের দিনেও তাঁর পাশে থাকা।' প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি- দুই মেডিক্যাল বোর্ডই জানিয়েছে যে, এহেন কৃত্রিম খাবার ও সকল চিকিৎসা ব্যবস্থা বন্ধ করাই এখন হরিশের জন্য মঙ্গলের। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ‘কমন কজ’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেই রায়ের ভিত্তিতেই এই প্রথম কোনও বিচারবিভাগীয় নির্দেশে কার্যকর হতে চলেছে স্বেচ্ছা মৃত্যু। দীর্ঘ ক্লান্তিকর এক যাত্রার শেষে এবার শান্তির ঘুমের দেশে পাড়ি দেবেন ১৩ বছরের হরিশ রানা।