Supreme Court on AI: 'অদৃশ্য, কুটিল!' বিচারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে চরম সতর্কবার্তা সুপ্রিম কোর্টের
Supreme Court on AI: আইনি প্রক্রিয়ায় সততা বজায় রাখাই বিচারব্যবস্থার পবিত্রতা রক্ষার প্রধান শর্ত। বিচারপতিদের স্পষ্ট বক্তব্য, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়াকে যদি ভুল পথে চালিত করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা সমগ্র বিচারব্যবস্থাকেই প্রহসনে পরিণত করবে।
Supreme Court on AI: বিচারব্যবস্থার অন্দরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবার এক বড় বিতর্কের জন্ম দিল। বৃহস্পতিবার এআই-এর মাধ্যমে তৈরি কাল্পনিক ও ভুয়ো নজির ব্যবহার করে আইনি শুনানি এবং রায় প্রদানের ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। দেশের শীর্ষ আদালতের সাফ বার্তা, বিচার প্রক্রিয়ায় এআই-এর অপব্যবহার কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। এক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করা হবে।

সম্প্রতি ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইবুনাল (এনসিএলটি)-এর একটি রায়ের সূত্র ধরে এই প্রসঙ্গটি সামনে আসে। ‘এসেল ইনফ্রাপ্রজেক্টস’-এর দেউলিয়া সংক্রান্ত একটি মামলায় দেখা যায়, এআই-এর সহায়তায় তৈরি কিছু অস্তিত্বহীন এবং কাল্পনিক আইনি নজিরের ওপর ভিত্তি করে রায় দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নজরে আসতেই বিচারপতি পিএস নরসিংহ এবং বিচারপতি অলোক আরাঢের বেঞ্চ এনসিএলটি-র ওই রায়টি বাতিল করে দিয়েছে। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, যে সব তথ্যসূত্রের ওপর ভিত্তি করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা কোনওভাবেই ‘আইনের চোখে স্বীকৃত’ নয়। আদালতের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এমন ভুয়ো তথ্য ব্যবহার হলে নিরপরাধ ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এবং বিচারব্যবস্থার উপরে মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে বলে মত বিচারপতিদের।
সুপ্রিম কোর্টের কথায়, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আসলে নকল, অস্তিত্বহীন এবং অলীক উপাদান সৃষ্টি করে এবং তা আইনে নজির হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। বিষয়টি আইন ও বিচারের পরিধিতে মিথাইল আইসোসায়ানাইড (ভোপাল গ্যাস বিপর্যয়ে যে গ্যাস ছড়িয়েছিল) ছড়িয়ে দেওয়ার মতোই। অদৃশ্য, কুটিল এবং বিপর্যয় ডেকে আনার মতো বিষয়। কেউ খেয়াল করার আগেই দূষিত হয়ে যাবে সব কিছু।’ সুপ্রিম কোর্টের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে আইনজীবীদের অসদাচরণই মূল কারণ। কারণ, আদালতে এআই দ্বারা তৈরি এই বিভ্রান্তিকর তথ্যসূত্র উপস্থাপন করেছেন আইনজীবীরাই। বিচারপতিরা কঠোরভাবে জানিয়েছেন, কোনও আইনজীবী যদি যথাযথ যাচাই না করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা সৃষ্ট কোনও নজির আদালতে ব্যবহার করেন, তবে তা পেশাগত অসদাচরণ বলে গণ্য হবে। একই সঙ্গে বিচারকদের প্রতিও শীর্ষ আদালতের বার্তা, রায়দানের সময় কোনও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ওপর নির্ভর করলে তা বিচারপতির ‘গুরুতর বিচ্যুতি’ হিসেবে ধরা হবে এবং সেই রায় বাতিলযোগ্য হবে।
আইনি প্রক্রিয়ায় সততা বজায় রাখাই বিচারব্যবস্থার পবিত্রতা রক্ষার প্রধান শর্ত। বিচারপতিদের স্পষ্ট বক্তব্য, এআই ব্যবহারের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়াকে যদি ভুল পথে চালিত করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা সমগ্র বিচারব্যবস্থাকেই প্রহসনে পরিণত করবে। আইনজীবী এবং বিচারক, উভয়কেই এই নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়ার কথা জানিয়েছে শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট এ-ও স্পষ্ট করেছে যে এই রায় এআই প্রযুক্তির বৈধ বা দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিরুদ্ধে নয়। গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ বা অন্যান্য কাজে এআই ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে এআই যদি ভুয়ো বা অস্তিত্বহীন তথ্য তৈরি করে, তা যাচাই না করে আদালতে ব্যবহার করা যাবে না। বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি অলোক আরাঢের ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে বলেছে, ‘আদালতের কাজে প্রযুক্তির ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে না। বরং মামলার নথি বিশ্লেষণ, গবেষণা, অনুবাদ বা প্রশাসনিক কাজে এআই সহায়ক হতে পারে। কিন্তু কোনও এআই টুল যে তথ্য বা উদাহরণ ব্যবহার করছে, তা বিচারক বা আইনজীবী যাচাই না করে আদালতের নথিতে ব্যবহার করলে গুরুতর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা তৈরি হতে পারে। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব সবসময় মানুষেরই থাকবে, কোনও সফটওয়্যার বা অ্যালগরিদমের নয়।’
ন্যাশনাল কোম্পানি ল অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল (এনসিএলটি)-এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের প্রশ্ন, ভুয়ো ও অস্তিত্বহীন রায়-গুলি কীভাবে আপিলের সময়ও ধরা পড়ল না? একই সঙ্গে বার কাউন্সিলকে এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছে শীর্ষ আদালত। জম্মু ও কাশ্মীর ব্যাঙ্ক এসেল ইনফ্রাপ্রজেক্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে দেউলিয়া আইন-এর ৭ নম্বর ধারায় আবেদন করেছিল। অভিযোগ ছিল, সংস্থাটি প্যান ইন্ডিয়া ইউটিলিটিস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে-এর ঋণের জন্য কর্পোরেট গ্যারান্টি দিয়েছিল। ২০২৪ সালের ২৮ অগস্ট এনসিএলটি মুম্বই মামলাটি গ্রহণ করে। পরে সংস্থার সাসপেন্ডেড ডিরেক্টর পূজা রমেশ সিংয়ের পক্ষে উপস্থিত সিনিয়র অ্যাডভোকেট মাধবী দিবান দাবি করেন, ট্রাইব্যুনাল যে ছয়টি রায়ের উপর নির্ভর করেছে, তার কয়েকটির কোনও অস্তিত্বই নেই এবং কয়েকটি আবার মামলার সঙ্গে কোনওভাবেই প্রাসঙ্গিক নয়। এরপরই বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের নজরে আসে এবং এআই দিয়ে তৈরি ভুয়ো তথ্যের ব্যবহার নিয়ে কড়া অবস্থান নেয় শীর্ষ আদালত।
E-Paper

