পাজামার দড়ি খোলা ধর্ষণেই চেষ্টা! এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় খারিজ সুপ্রিম কোর্টের
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, যৌন অপরাধ মামলায় বিচারব্যবস্থাকে আরও সংবেদনশীল করতে সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য নির্দেশিকা প্রয়োজন। এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমিকে।
নিবালিকা নির্যাতনের একটি মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিতর্কিত পর্যবেক্ষণকে বাতিল করল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, 'ফৌজদারি আইনশাস্ত্রের প্রতিষ্ঠিত নীতির স্পষ্ট অপব্যবহারের জন্য আপত্তিকর রায় বাতিল করা হয়েছে।' একই সঙ্গে আদালত বলেছে, কোন মহিলার বুকে হাত দেওয়া কিংবা জোরপূর্বক পাজামার দড়ি খোলার চেষ্টা করা অবশ্যই ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ হিসেবে গণ্য হবে।

২০২৫ সালের মার্চ মাসে এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি রামমনোহর নারায়ণ মিশ্রের বেঞ্চ একটি মামলার শুনানিতে জানিয়েছিল, ১১ বছরের এক কিশোরীর বুকে হাত দেওয়া বা পাজামার দড়ি খোলার চেষ্টা করা যৌন হেনস্থা হলেও তা ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ নয়। উচ্চ আদালতের যুক্তি ছিল, অপরাধের প্রস্তুতি এবং প্রকৃত প্রচেষ্টার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নিম্ন আদালত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পকসো আইনের কঠোর ধারায় মামলা করলেও, হাই কোর্ট তা কমিয়ে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৫৪-বি ধারায় বিচার করার নির্দেশ দেয়। এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই রায়ের পর দেশজুড়ে বিতর্কের ঝড় ওঠে। ‘উই দ্য উইমেন অফ ইন্ডিয়া’ নামক একটি সংগঠন এবং নির্যাতিতার মা এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানান। শীর্ষ আদালত বিষয়টি স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে গ্রহণ করে।
এই মামলায় মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি এনভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই রায়কে ‘সংবেদনশীলতার অভাব’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে যে এই অভিযোগগুলি কেবল পর্যালোচনা করলেই কোনও সামান্য সন্দেহ থাকে না যে অভিযুক্ত ভারতীয় দণ্ডবিধির (আইপিসি) ৩৭৬ ধারা (ধর্ষণ) এর অধীনে অপরাধ করার জন্য পূর্বপরিকল্পিত উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করেছিলেন। আদালত বলেছে, '২০২৫ সালের ১৭ মার্চ তারিখের বিতর্কিত রায় বাতিল করা হল এবং ২০২৩ সালের ২৩ জুনের মূল সমন আদেশ, যা কাসগঞ্জের বিশেষ বিচারক, পকসো দ্বারা প্রদত্ত হয়েছিল, পুনর্বহাল করা হল। এই রায়ে এই আদালতের পর্যবেক্ষণগুলি কেবল অভিযোগকারীর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ এবং অভিযুক্তের অপরাধের উপর মতামত হিসাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।' শীর্ষ আদালত আরও জানায়, যৌন অপরাধ সংক্রান্ত মামলার বিচার করতে গেলে শুধু আইনের যুক্তি নয়, মানবিক সংবেদনশীলতাও সমান জরুরি। হাইকোর্ট যে ঘটনাকে ‘শুধু প্রস্তুতি’ বলে উল্লেখ করেছিল, তাকে ধর্ষণের চেষ্টা নয় বলে মানা যায় না।
ওই রায়ের বিষয়ে আদালত আরও সতর্ক করে বলে, বিচারব্যবস্থা যদি মামলাকারীদের বিশেষ দুর্বলতা বা পরিস্থিতি বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে 'পূর্ণ ন্যায়বিচার' সম্ভব নয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করেছে, যৌন অপরাধ মামলায় বিচারব্যবস্থাকে আরও সংবেদনশীল করতে সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য নির্দেশিকা প্রয়োজন। এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমিকে। একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে বিচারকদের মধ্যে সহানুভূতি ও সংবেদনশীলতা বাড়ানোর জন্য সুপারিশ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে যৌন অপরাধ ও অন্যান্য দুর্বল ভুক্তভোগীদের মামলায় বিচারব্যবস্থার করণীয় নিয়ে বিস্তারিত নির্দেশিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে জমা দিতে হবে এই রিপোর্ট। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, নির্দেশিকা এমন ভাষায় তৈরি করতে হবে যা সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারেন। দেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাছাড়া আদালতের পর্যবেক্ষণ, আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে অর্থাৎ পদ্ধতি নির্ধারণ থেকে চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত - সহমর্মিতা, মানবিকতা এবং বোঝাপড়ার প্রতিফলন থাকা জরুরি। তবেই ন্যায়বিচার সত্যিকারের কার্যকর হবে।
E-Paper

