India with Nepal and Myanmar: মায়ানমার-নেপালের রাষ্ট্রনেতাদের সফর, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কে বাড়তি জোর ভারতের
India: ২০১৪ সালে ভারতের শাসনভার গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের সঙ্গে আরও নিবিড় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পক্ষে সওয়াল করে আসছেন। নেপাল যাতে অর্থনৈতিক সংহতির মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে মোদী সরকার প্রয়োজনে '১০০ মাইল' এগিয়ে যেতেও প্রস্তুত।
India: ভারত ও নেপালের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক অত্যন্ত ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক তুলে ধরে 'হিন্দুস্তান টাইমস’-এ এক বিশেষ নিবন্ধ লিখেছেন নেপালের শাসকদল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)-র সভাপতি রবি লমিছানে। তিনি দুই দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিমান যোগাযোগ এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। সীমান্ত বিরোধকে নতুন করে প্রশ্রয় না দিয়ে, তিনি ভারত ও নেপালের মধ্যে ইতিবাচক ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক দিকগুলো তুলে ধরেছেন। নেপালের চীনপন্থী কমিউনিস্ট নেতা কেপি শর্মা ওলি এবং প্রচণ্ড (পুষ্প কমল দাহাল)-যাঁরা নিজেদের দেশের উগ্র জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বিতর্ককে জটিল করে তুলেছিলেন, রবি লমিছানের এই অবস্থান তাঁদের সেই রাজনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত-বিরোধী উস্কানি বা নেতিবাচক প্রভাব ছড়ানোর নীতি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন, ব্রিটেন-সহ ইউরোপের দেশগুলো যে সহজে সরে আসবে না-তা কার্যত স্পষ্ট। এই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই, পশ্চিমা বিশ্বের ‘প্রিয় পাত্র’ পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাকি প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। মায়ানমারের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপন এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের জন্য রাজকীয় অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করে দিল্লি ইতিমধ্যেই পশ্চিমা বিশ্বকে এক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। এই কূটনৈতিক পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হলো- মণিপুর, নাগাল্যান্ড এবং অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত পেরিয়ে সক্রিয় থাকা ভারত-বিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্রপন্থীদের হাত থেকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করা।
২০১৪ সালে ভারতের শাসনভার গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের সঙ্গে আরও নিবিড় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পক্ষে সওয়াল করে আসছেন। নেপাল যাতে অর্থনৈতিক সংহতির মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যেতে পারে, তা নিশ্চিত করতে মোদী সরকার প্রয়োজনে '১০০ মাইল' এগিয়ে যেতেও প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রী মোদী চান যে বিদেশ মন্ত্রক যেন প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দেয়। কারণ, তাঁর স্পষ্ট দূরদৃষ্টি-যতক্ষণ না উপমহাদেশীয় দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের চমৎকার ও বিশ্বস্ত সম্পর্ক গড়ে উঠছে, ততক্ষণ ভারতকে প্রকৃত অর্থে ‘বিশ্বশক্তি’ হিসেবে গণ্য করা সম্ভব নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত তথাকথিত ‘ট্র্যাক-টু’ সংলাপের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার জন্য দিল্লির ওপর যতই চাপ থাকুক না কেন, মোদী সরকার নিজের অবস্থানে অনড়। রাওয়ালপিন্ডি (পাক সেনা সদর) যতদিন না ভারতের বিরুদ্ধে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ পুরোপুরি বন্ধ করছে, ততদিন পাকিস্তানের সঙ্গে কোনও ধরনের আলোচনা বা কূটনৈতিক সম্পর্কে জড়ানো হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে মোদী সরকার।
চিনের ক্ষেত্রেও ভারত সমানভাবে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। নয়াদিল্লি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, বেজিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের যে কোনও অগ্রগতি সরাসরি ৩৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখার শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভর করবে। চলতি মাসেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বেজিং সফরের সময় চিন যেভাবে যৌথ বিবৃতিতে জম্মু ও কাশ্মীর প্রসঙ্গটি অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি দিয়েছে, তা থেকে স্পষ্ট যে ভারতকে একযোগে দুই ফ্রন্টে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। যেখানে কমিউনিস্ট চিন পাকিস্তানকে অন্তত মাঝারি-শক্তির ক্যাটাগরিতে উন্নীত করতে পিছন থেকে অনবরত মদত জুগিয়ে যাচ্ছে। এই ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য অত্যন্ত জরুরি হলো ভুটান এবং শ্রীলঙ্কাকে নিজের অত্যন্ত কাছাকাছি রাখা। পাশাপাশি, মলদ্বীপের রাষ্ট্রপ্রধান মহম্মদ মুইজ্জু ‘ভারত-বিরোধী’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এলেও, দেশটি যাতে দিল্লির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তা পায় তা নিশ্চিত করা। ভারত খুব ভালো করেই বোঝে যে বাংলাদেশ ও নেপালের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে এই দুই এশীয় শক্তির (ভারত ও চিন) সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হয়। তবে এই উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের মতো ভারত কিন্তু বড় বড় পরিকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনও ‘কুইড প্রো কো’ বা চড়া সুদের ফাঁদ তৈরি করে না।
তবে এই উপমহাদেশে ভারতের প্রভাব বলয়ের মধ্যে চিনকে অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দেওয়ার পরিবর্তে, নয়াদিল্লির উচিত হবে একতরফাভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর-বিশেষ করে নেপাল, ভুটান এবং মায়ানমারের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। আর এই লক্ষ্যে এমন সব কূটনীতিক বা রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা প্রয়োজন, যাঁরা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হবেন না। বাংলাদেশ থেকে শেখ হাসিনা সরকারের আকস্মিক পতন ভারতকে একটি বড় শিক্ষা দিয়ে গেছে। এটি দেখিয়েছে যে, কীভাবে পশ্চিমা বিশ্ব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন ইন্ধনে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে যেতে পারে, যেখানে ওয়াশিংটন ভারতকে একটি আঞ্চলিক শক্তির গণ্ডিতেই আটকে রাখতে চায়। ভারতের এই উত্থানকে প্রতিহত করার মানসিকতা শুধু প্রতিবেশীদেরই নয়, বরং বিশ্বের বড় শক্তিগুলোরও স্বার্থের অনুকূলে যায়।
বাস্তবতা হলো, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বরাবরই ভারতীয় উপমহাদেশে এক ধরণের অনানুষ্ঠানিক বা ‘চা’ কূটনীতির পক্ষে সওয়াল করে এসেছেন। তাঁর লক্ষ্য এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বড় কোনও কূটনৈতিক প্রটোকলের জটিলতা ছাড়াই প্রতিবেশী দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা যখন খুশি ভারতে চলে আসতে পারেন। সম্প্রতি নেপালের রবি লমিছানে এবং মায়ানমারের সিনিয়র জেনারেল হ্লাইং-এর ভারত সফর প্রমাণ করে যে, দিল্লি এখন সম্পূর্ণ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রস্তুত। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হলেও, সেখানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে সংখ্যালঘুদের ওপর যে মৌলবাদী হামলা হয়েছে, তার জন্য ইসলামপন্থী কট্টরপন্থীদের এখনও পর্যন্ত কোনও শাস্তি দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, ভুটানের যেমন উচিত নিজেদের ভূখণ্ডে চিনের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো, তেমনই বেজিংও এই হিমালয়-বেষ্টিত দেশটির সঙ্গে সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য সবরকম চেষ্টা চালাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক মানচিত্রে শ্রীলঙ্কার ঘুরে দাঁড়ানো একমাত্র ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার মাধ্যমেই সম্ভব। একইভাবে মলদ্বীপও এখন হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে যে, তাদের অর্থনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা কতটা জরুরি। কারণ ভারতই একমাত্র দেশ, যা কোনও গোপন শর্ত বা ঋণের ফাঁদ ছাড়াই প্রতিবেশীদের আর্থিক অনুদান ও ঋণ দিয়ে থাকে।
সার্বিকভাবে, মোদী সরকার এখন স্পষ্টভাবেই প্রতিবেশীদের ওপর নিজেদের সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। যারা কেবল ভারতীয় উপমহাদেশে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য বা নিজেদের প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে অনবরত পাকিস্তানকে মদত দিয়ে যায়, সেই সব দূরবর্তী দেশগুলোর পেছনে অযথা সময় নষ্ট করতে একেবারেই নারাজ নয়াদিল্লি।
E-Paper

