৪৭-এর দেশভাগ থেকে আজকের মেগাসিটি! ১৯৪৭ সালের পর কীভাবে বদলে গেল ভারতের শহরগুলো

তবে গত আট দশকে এক অবিশ্বাস্য রূপান্তরের সাক্ষী থেকেছে স্বাধীন ভারত। দেশভাগ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং একবিংশ শতাব্দীর 'স্মার্ট সিটি' ও ডিজিটাল বিপ্লব—ভারতের শহরগুলো কেবল আয়তনে বাড়েনি, বরং বদলে গেছে তাদের চেহারা, কাজের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধরণ।

Published on: Aug 15, 2026, 06:19:04 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে যখন ভারত স্বাধীনতা লাভ করে, তখন দেশের নগর অবকাঠামোর চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে সময়ে ভারতের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বাস করতেন এবং গুটিকয়েক বড় শহর (যেমন—বম্বে, ক্যালকাটা, মাদ্রাজ ও দিল্লি) মূলত ব্রিটিশদের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থে গড়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালে মাত্র ১৭ শতাংশ ভারতীয় শহরে বাস করতেন।

৪৭-এর দেশভাগ থেকে আজকের মেগাসিটি! ১৯৪৭ সালের পর কীভাবে বদলে গেল ভারতের শহরগুলো
৪৭-এর দেশভাগ থেকে আজকের মেগাসিটি! ১৯৪৭ সালের পর কীভাবে বদলে গেল ভারতের শহরগুলো

তবে গত আট দশকে এক অবিশ্বাস্য রূপান্তরের সাক্ষী থেকেছে স্বাধীন ভারত। দেশভাগ ও বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং একবিংশ শতাব্দীর 'স্মার্ট সিটি' ও ডিজিটাল বিপ্লব—ভারতের শহরগুলো কেবল আয়তনে বাড়েনি, বরং বদলে গেছে তাদের চেহারা, কাজের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধরণ। ১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে ভারতীয় শহরগুলোর এই ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব পরিবর্তনের রূপরেখা জেনে নিন।

১. স্বাধীনতাত্তোর সংকট ও নতুন পরিকল্পিত শহরের জন্ম

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর লক্ষ লক্ষ বাস্তুচ্যুত মানুষ ভারতজুড়ে বিভিন্ন শহরে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। এর ফলে দিল্লি, কলকাতা ও পাঞ্জাবের শহরগুলোতে তীব্র আবাসন সংকট তৈরি হয়। এই সংকট মোকাবিলায় এবং নতুন স্বাধীন ভারতের আধুনিক প্রতীক হিসেবে পরিকল্পিত শহর বা 'প্ল্যানড সিটি' গড়ার পরিকল্পনা শুরু হয়।

  • চণ্ডীগড় ও ভুবনেশ্বর: প্রখ্যাত ফরাসি স্থপতি ল করবুসিয়ারের নকশায় গড়ে ওঠে ভারতের প্রথম পরিকল্পিত শহর চণ্ডীগড়। একইভাবে ওড়িশার নতুন রাজধানী হিসেবে আধুনিক ভুবনেশ্বর শহর পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়।
  • শিল্পনগরীর উত্থান: ভারতের শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করতে জামশেদপুর, ভিলাই, দুর্গাপুর, রৌরকেল্লার মতো নতুন শিল্প শহর গড়ে ওঠে, যা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করে।

২. ১৯৯১-এর অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও আইটি বিপ্লব

১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি উন্মুক্ত হওয়ার পর ভারতীয় শহরগুলোর রূপান্তরে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করে তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি (IT) খাত।

  • বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদের উত্থান: সত্তরের দশকেও শান্ত ও উদ্যানের শহর হিসেবে পরিচিত বেঙ্গালুরু আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকে ভারতের 'সিলিকন ভ্যালি' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। বিশ্বমানের প্রযুক্তি সংস্থাগুলো বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদে ঘাঁটি গাড়ায় এই শহরগুলো আন্তর্জাতিক টেক-হাব হয়ে ওঠে।
  • আইটি পার্ক ও কর্পোরেট সংস্কৃতি: পুণে, চেন্নাই এবং কলকাতার 'সল্টলেক সেক্টর ফাইভ' ও 'নিউ টাউন'-এর মতো এলাকায় বিশাল বিশাল আইটি পার্ক ও গ্লাস-ফাসাদের বহুতল ভবন গড়ে ওঠে, যা নগর অর্থনীতিতে নতুন গতি আনে।

৩. মেগাসিটির প্রসার ও 'স্যাটেলাইট টাউন'-এর আত্মপ্রকাশ

গ্রাম থেকে কোটি কোটি মানুষের শহরে কাজের খোঁজে আসার ফলে পুরনো মেট্রো শহরগুলোর ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়। ফলস্বরূপ, মূল শহরের সীমানা ছাড়িয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো নিয়ে গড়ে ওঠে বিশাল বিশাল 'স্যাটেলাইট সিটি' বা উপগ্রহ শহর।

  • জাতীয় রাজধানী অঞ্চল (NCR): দিল্লির ওপর চাপ কমাতে নয়ডা, গুরগাঁও (গুরুগ্রাম), ফরিদাবাদ ও গাজিয়াবাদ নিয়ে এক বিশাল নগরপুঞ্জ বা এনসিআর (NCR) গড়ে ওঠে। একসময়ের কৃষিজমি গুরগাঁও আজ বহুজাতিক কোম্পানির চকচকে প্রধান কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে।
  • নভি মুম্বাই ও রাজারহাট-নিউ টাউন: বোম্বাইয়ের (মুম্বাই) চাপ কমাতে সমুদ্রের ওপারে নভি মুম্বাই এবং কলকাতার পূর্ব প্রান্তে রাজারহাট-নিউ টাউনের মতো আধুনিক নগর তৈরি হয়।

৪. যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ ও স্মার্ট সিটি মিশন

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে ভারতীয় শহরগুলোর পরিবহণ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় বিপ্লব ঘটিয়েছে মেট্রো রেল এবং হাই-স্পিড এক্সপ্রেসওয়ে।

  • মেট্রো বিপ্লব: ১৯৭৮ সালে কলকাতায় প্রথম মেট্রো চালু হলেও ২০০২ সালে দিল্লি মেট্রোর সাফল্য পুরো দেশের নগর পরিবহণ চিত্র বদলে দেয়। আজ বেঙ্গালুরু, জয়পুর, কোচি, লখনউ, আহমেদাবাদ, মুম্বাইসহ দেশের ৩০টিরও বেশি শহরে মেট্রো পরিষেবা নাগরিকদের যাতায়াত সহজ করেছে।
  • স্মার্ট সিটি ও ফ্লাইওভার গলি: ভারত সরকারের 'স্মার্ট সিটি মিশন'-এর অধীনে শতধিক শহরে সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যাল, সোলার এনার্জি এবং ইন্টিগ্রেটেড কমান্ড সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে।

৫. পরিবর্তনের সাথে উঠে আসা নতুন চ্যালেঞ্জ

শহরাঞ্চলের এই অভাবনীয় বৃদ্ধির সাথে সাথে কিছু মারাত্মক নাগরিক সংকটও তৈরি হয়েছে:

  • বস্তি ও আবাসন সংকট: ধারাবীর (মুম্বাই) মতো এশিয়ার বৃহত্তম বস্তি এলাকা প্রমাণ করে যে দ্রুত নগরায়নের সাথে তাল মিলিয়ে সবার জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
  • পরিবেশ দূষণ ও জলসংকট: বায়ুদূষণ, ভরাট হওয়া জলাশয় এবং বর্ষায় শহরের জলাবদ্ধতা আধুনিক ভারতীয় শহরগুলোর প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৪৭ সালের ঔপনিবেশিক আমলের ধীরগতির শহর থেকে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেট্রো-সংযুক্ত মেগাসিটিতে রূপান্তর—ভারতের এই নগর যাত্রা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিরই এক উজ্জ্বল দর্পণ। পরিবেশ ও পরিকল্পনার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এগোতে পারলে আগামী দিনগুলোতে ভারতের শহরগুলো বিশ্বের দরবারে আরও বেশি বাসযোগ্য ও আধুনিক হিসেবে পরিগণিত হবে।

  • Suman Roy
    ABOUT THE AUTHOR
    Suman Roy

    সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More