'রাজা চাই না!' যুদ্ধের মাঝে ট্রাম্প-বিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল US-ইউরোপ
ওয়াশিংটনে শত শত মানুষ লিংকন মেমোরিয়াল থেকে ন্যাশনাল মলে মিছিল করে ‘পুট ডাউন দ্য ক্রাউন’ এবং ‘রেজিম চেঞ্জ বিগিনস এট হোম’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে।
ইরানে যুদ্ধ ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শনিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ জুড়ে ‘নো কিংস’ মিছিলে লক্ষাধিক মানুষ বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মিনেসোটা। আয়োজকেরা আশা করেছিলেন যে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই গণবিক্ষোভে অংশ নেবে। বাস্তবে হয়েছিল তা-ই।

সেন্ট পল শহরের মিনেসোটা ক্যাপিটল লন এবং আশপাশের রাস্তাগুলোতে হাজার হাজার মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল। কেউ কেউ উল্টো করা মার্কিন পতাকা ধরে রেখেছিলেন। সাধারণত ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন পতাকা উল্টো করে ধরাকে বিপদের সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিলেন ব্রুস স্প্রিংস্টিন, যিনি ‘স্ট্রিটস অব মিনিয়াপলিস’ গানটি পরিবেশন করেন। ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে রেনি গুড এবং অ্যালেক্স প্রেটির মর্মান্তিক মৃত্যু এবং ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে শীতকালে রাস্তায় নামা হাজার হাজার মিনেসোটাবাসীর সম্মানে তিনি এই গানটি লিখেছিলেন।গানটি শুরুর আগে স্প্রিংস্টিন গুড এবং প্রেটির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) বিরুদ্ধে জনগণের এই নিরন্তর প্রতিবাদ সারা দেশের মানুষকে আশার আলো দেখিয়েছে।
তাঁর কথায়, ‘আপনাদের শক্তি এবং দৃঢ়সংকল্প আমাদের বলছে যে এটি এখনও সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই আছে। এই প্রতিক্রিয়াশীল দুঃস্বপ্ন এবং আমেরিকান শহরগুলোতে এই আগ্রাসন বরদাস্ত করা হবে না।’ নিউইয়র্ক সিটির মতো বড় শহর (যেখানে প্রায় ৮৫ লক্ষ মানুষের বসবাস এবং ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী ঘাঁটি) থেকে শুরু করে পূর্ব আইডাহোর ছোট শহর ড্রিস (যেখানে জনসংখ্যা ২ হাজারের কম এবং ২০২৪ সালে ট্রাম্প ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন)-সব জায়গাতেই মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। মার্কিন আয়োজকদের হিসাবে, গত জুন এবং অক্টোবরে ‘নো কিংস’ র্যালির প্রথম দুই পর্বে যথাক্রমে ৫০ লক্ষ এবং ৭০ লক্ষ মানুষ অংশ নিয়েছিল। এই সপ্তাহে তাঁরা সাংবাদিকদের জানান, শনিবার তারা ৯০ লক্ষ অংশগ্রহণকারীর আশা করছেন, যদিও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়েছে কিনা তা এখনই বলা যাচ্ছে না। আয়োজকরা জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যে ৩ হাজার ১০০টির বেশি ইভেন্ট নিবন্ধিত হয়েছে, যা অক্টোবর মাসের তুলনায় ৫০০টি বেশি।
ক্যানসাসের টোপেকায় স্টেটহাউসের সামনে একটি র্যালিতে মানুষকে ‘ব্যাঙ রাজা’ এবং ট্রাম্পকে ‘শিশু’ হিসেবে সাজতে দেখা যায়। ওয়েন্ডি ওয়াট নামের এক মহিলা ’ক্যাটস অ্যাগেইনস্ট ট্রাম্প’ সাইন নিয়ে ২০ মাইল (৩২ কিলোমিটার) দূর থেকে গাড়ি চালিয়ে এসেছিলেন এবং পরে নিজের শহরে আরেকটি র্যালিতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ওয়াট বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক কিছু তাঁকে হতাশ করে, কিন্তু এই বিক্ষোভ তাঁকে ‘খুবই আশাবাদী’ করে তুলেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেল জ্যাকসন এই বিক্ষোভকে ‘বামপন্থী অর্থায়ন নেটওয়ার্কের’ ফসল হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং দাবি করেছেন যে এতে সাধারণ জনগণের কোনও সমর্থন নেই। জ্যাকসন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই 'ট্রাম্প ডিরেঞ্জমেন্ট থেরাপি সেশন' নিয়ে কেবল তারাই মাথা ঘামায় যেসব সাংবাদিককে এটি কভার করার জন্য টাকা দেওয়া হয়।’ ন্যাশনাল রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল কমিটিও (এনআরসিসি) এর তীব্র সমালোচনা করেছে। কমিটির মুখপাত্র মরিন ও’টুল বলেন, ‘এই আমেরিকা বিদ্বেষী র্যালিগুলো হল সেই জায়গা যেখানে কট্টর বামপন্থীদের সবচাইতে হিংস্র এবং বিকৃত কল্পনাগুলো মাইক্রোফোন পায়।’
ওয়াশিংটনে শত শত মানুষ লিংকন মেমোরিয়াল থেকে ন্যাশনাল মলে মিছিল করে ‘পুট ডাউন দ্য ক্রাউন’ এবং ‘রেজিম চেঞ্জ বিগিনস এট হোম’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে। সিয়াটল থেকে যোগ দেওয়া বিল জারচো বলেন, 'আমরা রাজাকে উপহাস করি- এটাই আমাদের প্রতিবাদ। কর্তৃত্ববাদকে হাস্যকর করে তোলা তাদের সবচেয়ে অপছন্দ।' সান ডিয়েগোতে প্রায় ৪০,০০০ মানুষ মিছিল করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিউ ইয়র্কে নিউ ইয়র্ক সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের নির্বাহী পরিচালক ডোনা লিবারম্যান বলেন, ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা চায় মানুষ যেন ভয় পায়। কিন্তু তারা ভুল- একেবারেই ভুল ভাবছে। আয়োজকদের মতে, অংশগ্রহণকারীদের দুই-তৃতীয়াংশই বড় শহরের বাইরে থেকে যোগ দিয়েছেন। এরমধ্যে আছে ইডাহো, ওয়েইমিং, মন্টানা, ইউটা, সাউথ ডাকোটা এবং লুইজিয়ানার মতো রাজ্য। মিনেসোটাকে জাতীয় প্রধান বিক্ষোভস্থল ঘোষণা করা হয়। কারণ, সেখানে অভিবাসন অভিযান চলাকালীন দু’জন নিহত হন। স্প্রিংস্টিনের ‘ল্যান্ড অব হোপ অ্যান্ড ড্রিমস’ আমেরিকান ট্যুরও ‘নো কিংস’ থিমে শুরু হচ্ছে মিনিয়াপোলিসে। মঞ্চে ওঠার আগে অভিনেতা রবার্ট ডি নিরোর একটি ভিডিও দেখানো হয়। তিনি বলেন, ট্রাম্পের কারণে প্রতিদিন তিনি হতাশ হয়ে ঘুম থেকে জাগেন। কিন্তু এদিনের বিক্ষোভ তাকে আনন্দিত করেছে। এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন জোয়ান বায়েজ, জেন ফন্ডা, সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স-সহ বহু নেতা ও কর্মী। প্রতিবাদীদের একটি বড় ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমাদের ছিল বাঁশি, তাদের ছিল বন্দুক। বিপ্লব শুরু মিনিয়াপোলিসে।’
ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া-সহ আরও অনেক দেশে একই ধরনের বিক্ষোভ হয়। রোমে হাজারো মানুষ ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে। তারা ইজরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানায়। লন্ডনে বিক্ষোভকারীরা ‘স্টপ দ্য ফার রাইট’ ও ‘আই স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজম’ লেখা ব্যানার বহন করে। প্যারিসে শনিবার সকালে ফ্রান্সে বসবাসরত আমেরিকানদের পাশাপাশি ফরাসি শ্রমিক সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীরা বাস্তিল এলাকায় জমায়েত হন। প্যারিসের আয়োজক অ্যাডা শেন বলেন, 'আমি ট্রাম্পের সব অবৈধ, অনৈতিক, বেপরোয়া ও অন্তহীন যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছি।'
E-Paper

