আর্থিক সংকটে US? মাথায় ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা, কী বলছেন ট্রাম্প?
US national debt: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণের বোঝা আরও দ্রুতগতিতে বাড়ছে; সুদের হার এবং ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণের ওপর সুদ পরিশোধের পরিমাণও ফুলেফেঁপে উঠেছে; এবং এই সবকিছুই ঘটছে তুলনামূলকভাবে ভালো অর্থনৈতিক সময়ে।
US national debt: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশই এক গভীরতর ঋণের গর্তে পড়ছে। মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ফেডারেল ঋণ রেকর্ড ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি একটি অশুভ মাইলফলক, যা আগামী বহু বছর ধরে মার্কিন নাগরিক, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের ওপর প্রভাব ফেলবে।

যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বিপুল পরিমাণ ঋণ বহন করে আসছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রবণতা বাজেট এবং আর্থিক বাজার বিশেষজ্ঞদের আরও বেশি উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণের বোঝা আরও দ্রুতগতিতে বাড়ছে; সুদের হার এবং ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় ঋণের ওপর সুদ পরিশোধের পরিমাণও ফুলেফেঁপে উঠেছে; এবং এই সবকিছুই ঘটছে তুলনামূলকভাবে ভালো অর্থনৈতিক সময়ে। এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) বুধবারও সুদের হার কমানোর দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাঁর দাবি, সরকারি বন্ডের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'সবচেয়ে কম সুদের হার' প্রদান করা উচিত। ট্রাম্পের কথায়, 'ঋণের সুদ বাবদ খরচ কমলে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হতে পারে।' মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ফেডারেল রিজার্ভকে (Fed) নিশানা করে প্রেসিডেন্ট অভিযোগ করেন, ব্যাঙ্কের নীতি নির্ধারকদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তবে চলতি বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্প নিজেই ফেড চেয়ারম্যান পদে মনোনীত করা কেভিন ওয়ার্শের প্রশংসা করে জানান, তিনি 'চমৎকার কাজ' করছেন।
সুদের বোঝা কমাতে মরিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্প
যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কম সুদে ঋণ নিতে পারে, তবে সরকারের বার্ষিক সুদের বিল উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। এতে অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ সহজ হবে এবং কেন্দ্রীয় বাজেটের ওপর চাপ অনেকটাই কমবে। কিন্তু সমস্যা হলো, মার্কিন সরকার নিজের ইচ্ছেমতো ট্রেজারি বন্ডের আয়ের হার (Yields) নির্ধারণ করতে পারে না—তা নির্ধারণ করেন বিনিয়োগকারীরা। দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন সরকারি বন্ড কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা যখন বেশি রিটার্ন বা সুদ দাবি করেন, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণের ব্যয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেড়ে যায়। আর বিপুল ঋণের পাহাড়ের কারণে সুদের সামান্য বৃদ্ধিও সরকারের পরিশোধের অঙ্কে বিশাল ধাক্কা দেয়। মাত্র কয়েক দিন আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি ইল্ড ৫.২২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০০১ সালের পর সর্বোচ্চ। পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে, মার্কিন সরকার বর্তমানে তাদের গোটা জাতীয় প্রতিরক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি অর্থ ব্যয় করছে কেবল ঋণের সুদ মেটাতে।
সত্যি কী গভীর সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা শুনে আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত উদ্বেগজনক মনে হতে পারে। তবে শুধুমাত্র ঋণের পরিমাণ দেখেই কোনও দেশ চরম সংকটে পড়েছে কিনা, তা নির্ধারণ করা যায় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটি। তার চেয়েও বড় কথা, মার্কিন ডলার এখনও বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ কারেন্সি বা আন্তর্জাতিক লেনদেনের প্রধান মুদ্রা হিসেবে টিকে রয়েছে। এই বিশেষ অবস্থানের কারণেই অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি ঋণ নেওয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ভোগ করে ওয়াশিংটন। লেমন (Lemonn)-এর গবেষণা বিভাগের প্রধান গৌরব গর্গ জানান, ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের এই পরিসংখ্যানকে সার্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, '৪০ ট্রিলিয়ন নিঃসন্দেহে এক বিশাল অঙ্ক, তবে ঋণ থাকাই সবসময় মূল সমস্যা নয়।'
তাঁর মতে, মার্কিন অর্থনীতির আকার প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ডলারের রিজার্ভ কারেন্সির মর্যাদা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বেশি ঋণ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়। গৌরব গর্গ আরও বলেন, 'ঋণ উৎপাদনশীল হতে পারে যখন তা পরিকাঠামো, প্রযুক্তি এবং এমন কোনও ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হয় যা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তৈরি করে।' তবে তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সেই ঋণের বোঝা বহন করার খরচ। গর্গ উল্লেখ করেন, ঋণের সুদ মেটাতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বছরে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। তিনি বলেন, 'বাজার বিপুল ঋণের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে; তবে আসল ঝুঁকি তখনই শুরু হয়, যখন ঋণ নেওয়া অর্থ ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধির কাজে না লেগে পেছনের বকেয়া বিল মেটাতে ব্যয় হতে থাকে।'
একই ধরনের মত প্রকাশ করে গ্রান্ট থর্নটন ভারত (Grant Thornton Bharat)-এর পার্টনার তথা ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস রিস্ক অ্যাডভাইজরি লিডার বিবেক আইয়ার বলেন, 'ঋণের মোট বা চরম অঙ্ক কখনই মূল্যায়নের সঠিক মাপকাঠি নয়, বরং ঋণ বৃদ্ধির গতিপথ বা ট্র্যাজেক্টরি লক্ষ্য করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।' তিনি আরও বলেন, 'গত এক দশকে মার্কিন ঋণ প্রায় ১৯ ট্রিলিয়ন থেকে দ্বিগুণ হয়ে ৪০ ট্রিলিয়নে পৌঁছেছে। এটি স্পষ্টতই সুদের ক্রমবর্ধমান বোঝাকে প্রতিফলিত করে, যা সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সুযোগ কমিয়ে দেয়। এমনকী সুদের এই ব্যয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যয়ের চেয়েও বেশি বলেই আমাদের অনুমান। তবে ডলার বৈশ্বিক রিজার্ভ কারেন্সি হওয়ায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব মুদ্রাতেই ঋণ নেওয়ার সুবিধা পাওয়ায়, ঋণের এই মাত্রা তাৎক্ষণিক কোনও আসন্ন সংকটের চেয়ে বরং কাঠামোগত দুর্বলতারই বড় সংকেত।'
E-Paper

