নজরে ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম! ইরানে 'গ্রাউন্ড অপারেশনে'র ভাবনা ট্রাম্পের, কীভাবে এড়াবেন ঝুঁকি?
গত বছরের জুন মাসে মার্কিন ও ইজরায়েলি বিমান হামলার আগে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ উচ্চমাত্রার প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম এবং প্রায় ২০০ কেজি ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ বিভাজ্য পদার্থ ছিল।
পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা যখন কমানোর লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, সেই সময়েই ইরানে স্থল অভিযান চালিয়ে প্রায় ৯৭০ পাউন্ড (প্রায় ৪০০ কেজি) উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম দখলের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই ইউরেনিয়াম তেহরান সম্ভাব্যভাবে পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করতে পারে।

মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প তাঁর পরামর্শদাতাদের তেহরানকে চাপ দিতে বলেছেন, যেন যুদ্ধ বন্ধের শর্ত হিসেবে তারা এই পারমাণবিক উপাদান হস্তান্তরে রাজি হয়। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরান এই উপাদান রাখতে পারবে না; আলোচনার টেবিলে ইরান রাজি না হলে প্রয়োজনে ‘বলপ্রয়োগে দখল’ করার কথাও তিনি আলোচনা করেছেন। তবে কঠোর অবস্থানের মধ্যেও ট্রাম্প জানান, পাকিস্তানের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অগ্রগতি করছে। তাঁর ভাষায়, ‘খুব দ্রুত একটি সমঝোতা হতে পারে।’ এই আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান, মিশর এবং তুরস্ক। তবে এখনও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি কোনও আলোচনা শুরু হয়নি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার পেছনে ট্রাম্প বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করলেও একটি বিষয়ে তিনি বরাবরই দৃঢ়-ইরানকে কখনওই পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে তিনি কতদূর যেতে প্রস্তুত, বিশেষ করে ইরানের কাছে থাকা প্রায় অস্ত্রমানের পারমাণবিক উপাদান ধ্বংস বা দখল করার ক্ষেত্রে, সে বিষয়ে তিনি এখনও কিছুটা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি
এদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন উপসাগরীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার স্থল সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে বলে জানা গেছে। গত সপ্তাহে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, ৩,৫০০-এর বেশি সেনা, যার মধ্যে ২,৫০০ মেরিন সদস্য রয়েছে, ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছে গিয়েছে। রবিবার রাতে ট্রাম্প আরও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে চলতে হবে, না হলে ‘তাদের আর দেশই থাকবে না।’ ইরানের ইউরেনিয়াম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের কাছে সেই পারমাণবিক ধূলিকণাই হস্তান্তর করবে।’
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি
গত বছরের জুন মাসে মার্কিন ও ইজরায়েলি বিমান হামলার আগে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ উচ্চমাত্রার প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম এবং প্রায় ২০০ কেজি ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ বিভাজ্য পদার্থ ছিল। যা সহজেই ৯০ শতাংশ অস্ত্রের মানের ইউরেনিয়ামে রূপান্তর করা সম্ভব। হামলার পর দাবি করা হয়েছিল, ইরানের পরমাণু প্রকল্প সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, এই উপাদানের বড় অংশ এখনও ইসফাহান ও নাতাঞ্জের ভূগর্ভস্থ কেন্দ্রে সুরক্ষিত রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ইউরেনিয়াম দখলের অভিযান অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনা ইরানে প্রবেশ করতে হতে পারে, যা বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ডেকে আনতে পারে। প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ ইরানের পাল্টা হামলা উসকে দিতে পারে এবং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। অভিযানে অংশ নেওয়া সেনাদের প্রথমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মাইন ও ফাঁদ নিষ্ক্রিয় করতে হবে, এরপর বিশেষ দলের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সংগ্রহ ও নিরাপদে সরিয়ে নিতে হবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ৪০ থেকে ৫০টি বিশেষ সিলিন্ডারে সংরক্ষিত থাকতে পারে। এগুলো নিরাপদে পরিবহনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে এবং পুরো অভিযান সম্পন্ন করতে কয়েকদিন থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
প্রশাসনের ভেতরে মতপার্থক্য
ইরান নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও মতপার্থক্য রয়েছে। জাতীয় গোয়েন্দা প্রধান তুলসি গ্যাবার্ড তুলনামূলক নরম অবস্থানে আছেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে তিনি বলেছেন, মতপার্থক্য থাকলেও গ্যাবার্ড দায়িত্ব পালনে উপযুক্ত। অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স-সহ কিছু শীর্ষ রিপাবলিকান এই সংঘাতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সব মিলিয়ে, ইরানের ইউরেনিয়াম দখলে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতকে আরও জটিল ও বিস্তৃত করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
E-Paper

