Sign in

হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে? বড় দাবি ইরানের, ইঙ্গিতবাহী বার্তা ট্রাম্পের

Strait of Hormuz: ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, 'যদি কোনও পক্ষ এই প্রক্রিয়ায় বাধা না দেয়, তাহলে খুব শিগগিরই যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে।' তাঁর এই মন্তব্যকে অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

Published on: Aug 6, 2026, 22:01:05 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

Strait of Hormuz: হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন পথ নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান। ইরানের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, এ বিষয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

হরমুজ প্রণালী (AP Photo/Amirhosein Khorgooi)
হরমুজ প্রণালী (AP Photo/Amirhosein Khorgooi)

তবে এই সমঝোতা হলেও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি নিরাপদ হবে-এমন নিশ্চয়তা দেয়নি তেহরান। ইরানের দাবি, দেশটির বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকায় এখনও নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বুধবার ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই (Esmail Baghchi) এই তথ্য জানান। তবে তিনি প্রস্তাবিত পথের অবস্থান বা চুক্তির অন্য কোনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি। শুধুমাত্র তিনি বলেন, ওমানের সঙ্গে নতুন নৌপথের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়ে সমঝোতা হয়েছে এবং বিষয়টি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার প্রতিবেদনে বাঘাইয়ের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করা কারণগুলো এখনও বিদ্যমান। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং অন্যান্য চাপমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। তবে ইরানের এই প্রস্তাব নিয়ে এখনও পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ওমানের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই জলপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন চুক্তি কার্যকর হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে চুক্তির পথে এখনও বড় বাধা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের শর্ত অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নিতে হবে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন আগেই জানিয়েছে, এমন কোনও চুক্তি তারা মেনে নেবে না যেখানে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় বা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিয়ম বদলে যায়। ইরানও স্পষ্ট জানিয়েছে, যুদ্ধের আগের মতো হরমুজকে পুরোপুরি উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে ফিরিয়ে দিতে তারা রাজি নয়। দেশটি অন্তত কিছু মাত্রায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, 'যদি কোনও পক্ষ এই প্রক্রিয়ায় বাধা না দেয়, তাহলে খুব শিগগিরই যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে।' তাঁর এই মন্তব্যকে অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

এদিকে, আলোচনার সঙ্গে যুক্ত দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-কে জানিয়েছেন, ইরান ও ওমান ইতিমধ্যেই খসড়া চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। এখন শুধু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ মোজতবা খামেনেই-এর অনুমোদনের অপেক্ষা রয়েছে। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ৫৬ বছর বয়সি এই ধর্মীয় নেতা মোজতবা খামেনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে আর জনসমক্ষে আসেননি। ওই হামলাতেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সূচনা হয়। একই হামলায় নিহত হন তার বাবা ও ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই। এরপরই মোজতবা খামেনেই দেশের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন। সূত্রগুলোর দাবি, সম্ভাব্য এই চুক্তি স্থায়ী সমাধান নয়, বরং একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার পথও খুলে যেতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আলোচনায় এমন একটি প্রস্তাব রয়েছে যেখানে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজ ইরান-নিয়ন্ত্রিত রুট ব্যবহার করবে এবং বের হওয়ার সময় ওমান-নিয়ন্ত্রিত রুট দিয়ে চলবে। নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট পরিষেবা ফিও ধার্য হতে পারে। যদিও এই ধরনের কোনও ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের বিবৃতির কয়েক ঘন্টা আগে মঙ্গলবার লস অ্যাঞ্জেলেসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) বলেন, 'এটি হতে পারে। আগামীকাল বা তার পরের দিনও ঘোষণা আসতে পারে। অনেক অগ্রগতি হয়েছে।' তাঁর এই মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে কিছুটা ওঠানামা দেখা যায়। তবে বুধবার ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮০ ডলারে লেনদেন হয়েছে, যা যুদ্ধের শীর্ষ পর্যায়ের দামের তুলনায় কম।

কেন হরমুজ প্রণালী গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ সাধারণত এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে তেহরান কার্যত এই নৌপথ সীমিত করে রেখেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং তেলের দামেও ব্যাপক ওঠানামা দেখা যায়। মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালী খুলে না দেয়, তাহলে দেশটিকে কঠোর পদক্ষেপের মুখে পড়তে হবে।

এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছিলেন, আলোচনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে আবারও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে। তবে ইরান বারবার জানিয়ে আসছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনও আলোচনা চলছে না এবং এমন কোনো পরিকল্পনাও নেই। ইরানের উপ-বিদেশ মন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি (Kazem Gharibabadi) জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত নতুন পথটি স্থায়ী হবে না। এটি দুই থেকে চার মাস পর্যন্ত চালু থাকতে পারে। তবে তিনি এই পথের অবস্থান বা কীভাবে এটি পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি। বাজার পরিস্থিতিতে এর প্রভাবও দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার এশিয়ার লেনদেনে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ০.৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৯.২৪ ডলারে নেমে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইরান জানিয়েছে, আগাম অনুমতি ছাড়া কোনও জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না। ইরানের এই নির্দেশ অমান্য করা কয়েকটি জাহাজের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অন্যতম বড় বিরোধের বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি নেওয়ার ইরানের পরিকল্পনা। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এক ইরানি কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ইরান জাহাজে বহন করা পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে, ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি নিয়ে আলোচনা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য কোনও ধরনের ফি নেওয়ার বিরোধিতা করছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ করা জাহাজগুলোর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।

এর আগে জুন মাসে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। কূটনৈতিক আলোচনা থেমে যায় এবং উভয়পক্ষ আবার পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীও লোহিত সাগরে সৌদি আরবের কয়েকটি বন্দরের বিরুদ্ধে অবরোধ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, আঞ্চলিক উত্তেজনা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা দাবি করেছে, তারা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের একটি তেলবাহী জাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। যদিও এই দাবির পক্ষে তারা কোনও প্রমাণ দেয়নি এবং সৌদি আরবও তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি। এছাড়া ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইয়েমেন উপকূলের কাছে এডেন উপসাগরে একটি জাহাজের কাছাকাছি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে জাহাজের সব নাবিক নিরাপদ রয়েছেন। একই সময়ে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলেও উত্তেজনা বেড়েছে। ইজরায়েল দক্ষিণ লেবাননের একটি গ্রামের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে পরে সেখানে 'নির্দিষ্ট হামলা' চালানোর কথা জানিয়েছে। এর ফলে ইজরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে চলা নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালী নিয়ে সম্ভাব্য চুক্তির ইঙ্গিত বিশ্ববাজারে কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও, মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত অস্থিরই রয়ে গেছে।