Telangana CM Revanth Reddy: ‘হাইড্রা’র অনুপ্রেরণা হিটলার নাকি মার্ভেল! বিতর্কিত মন্তব্যে বিপাকে তেলাঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী
Telangana CM Revanth Reddy: হায়দরাবাদ ডিজাস্টার রেসপন্স অ্যান্ড অ্যাসেট প্রোটেকশন এজেন্সি। সংক্ষেপে জেক বলা হয় 'হাইড্রা।' ২০২৪ সালে হায়দরাবাদের এনফোর্সমেন্ট ভিজিল্যান্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টকে পুনর্গঠন করে এই নাম দিয়েছিল তেলাঙ্গানার কংগ্রেস সরকার।
Telangana CM Revanth Reddy: যে হিটলারের কার্যপদ্ধতির সঙ্গে তুলনা টেনে শাসক দল বিজেপিকে নিয়মিত আক্রমণ করেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, তেলাঙ্গানায় সেই তাঁর দলেরই মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি হায়দরাবাদের বিশেষ টাস্ক ফোর্স ‘হাইড্রা’-র নামকরণ নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কে জড়ালেন। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের বেআইনি দখলদারি বিরোধী টাস্ক ফোর্স ‘হাইড্রা’-র নামকরণের ক্ষেত্রে তিনি হিটলারের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। তাঁর এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই তীব্র সমালোচনায় সরব হয়েছে বিজেপি। তাদের বক্তব্য, রেবন্তের মন্তব্য কংগ্রেসের ‘হিটলারি মানসিকতা’রই প্রতিফলন।

হায়দরাবাদ ডিজাস্টার রেসপন্স অ্যান্ড অ্যাসেট প্রোটেকশন এজেন্সি। সংক্ষেপে জেক বলা হয় 'হাইড্রা।' ২০২৪ সালে হায়দরাবাদের এনফোর্সমেন্ট ভিজিল্যান্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টকে পুনর্গঠন করে এই নাম দিয়েছিল তেলাঙ্গানার কংগ্রেস সরকার। এই সংস্থার কাজ দুর্যোগ পরিস্থিতির মোকাবিলা এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা। সম্প্রতি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি এই সংস্থার নামকরণ এবং কর্মসূচি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানিয়েছেন, এই সংস্থার নাম হাইড্রা রাখার নেপথ্যে রয়েছেন জার্মান একনায়ক অ্যাডলফ হিটলার। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘হাইড্রা ছিল হিটলারের প্রিয় শব্দ। তাঁর কোর টিমের নামও ছিল হাইড্রা।’ তিনি বলেন, জবরদখল কড়া হাতে মোকাবিলার জন্যই এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
এক অনুষ্ঠানে রেবন্ত রেড্ডি বলেন, হাইড্রা'র প্রধান একজন সিনিয়র আইপিএস অফিসার। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন প্রায় ৩,০০০ অবসরপ্রাপ্ত সেনা আধিকারিক। এই সংস্থাটির উচ্ছেদ অভিযানের ব্যাপকতাকে ইরান-ইজরায়েলের যুদ্ধে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গেও তুলনা করেন তেলাঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী। আর এ ধরনের মন্তব্যের জেরে বিতর্কে জড়িয়েছেন রেবন্ত রেড্ডি। বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েছেন তিনি। কড়া সমালোচনায় সরব বিজেপি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিষান রেড্ডি বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে হিটলারেরকে অনুপ্রেরণা হিসাবে তুলে ধরেছেন। হায়দরাবাদের উচ্ছেদ অভিযানের তুলনা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলির পরিস্থিতির সঙ্গে করছেন। তাঁর অভিযোগ, এই ধরনের মন্তব্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রেবন্ত রেড্ডির নিঃশর্ত ক্ষমা দাবি করেছেন তিনি।
কী এই 'হাইড্রা'?
কমিক বুক, রাজনৈতিক বক্তৃতা কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার মিম-এ জায়গা করে নেওয়ার বহু আগে থেকেই 'হাইড্রা' ছিল এক ভয়ঙ্কর দানব। গ্রিক পুরাণে বর্ণিত ‘লার্নিয়ান হাইড্রা’ ছিল লার্না হ্রদের কাছে বসবাসকারী বহু মাথাওয়ালা এক বিশাল জলসর্প। দানবটি এতটাই ভয়ানক ছিল যে, বীর হেরাক্লিস (যিনি বিশ্বজুড়ে ‘হারকিউলিস’ নামে বেশি পরিচিত) তাঁকে যে ১২টি দুঃসাধ্য বীরত্বপূর্ণ কাজ বা ‘টেলভ লেবার্স’ দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে একটি ছিল এই হাইড্রা বধ। তবে হাইড্রার সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় কেবল তার মাথার সংখ্যা ছিল না, বরং ছিল সেই মাথাগুলোর পুনরুৎপাদনের এক অদ্ভুত ক্ষমতা-একটা মাথা কেটে ফেললে, সেই জায়গায় অলৌকিকভাবে আরও দুটি মাথা গজিয়ে উঠত! পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, হেরাক্লিস শেষ পর্যন্ত দানবটির একটি করে মাথা কাটার সঙ্গে সঙ্গেই সেই ক্ষতস্থানে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতেন; যাতে সেখানে নতুন কোনও মাথা গজানোর সুযোগ না পায়। এভাবেই তিনি দানবটিকে পরাস্ত করেছিলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাইড্রা পৌরাণিক গণ্ডি পেরিয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে অভিধানে। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী, হাইড্রা'র সংজ্ঞা হলো: 'এমন একটি বিষয় বা সমস্যা যার মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন, কারণ এটি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে অথবা এর বহুবিধ জটিল দিক রয়েছে।' এটি এমন একটি রূপক বা মেটাফর, যা বিগত বহু বছর ধরে বিভিন্ন দেশের সরকার, কর্পোরেট সংস্থা, সামরিক বাহিনী এবং কল্পবিজ্ঞান বা ফিকশন ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো নিজেদের প্রয়োজনে বারবার ধার করেছে।
হিটলারের কী ‘হাইড্রা’ নামে কোনও বাহিনী ছিল?
না, একেবারেই ছিল না। আর এখানেই লুকিয়ে রয়েছে বর্তমান বিতর্কের মূল ঐতিহাসিক বিভ্রান্তিটি। অ্যাডলফ হিটলারের কোনও ঘাতক দল, গোপন পুলিশ বাহিনী কিংবা এলিট সামরিক ইউনিটের নাম ‘হাইড্রা’ ছিল বলে ইতিহাসে কোনও প্রমাণ নেই। নাৎসি জমানার কুখ্যাত দমনপীড়ন ও ত্রাসের রাজত্ব মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল: প্রথমত, এসএস, যা ছিল হিটলারের নিজস্ব এলিট আধাসামরিক বাহিনী; দ্বিতীয়ত, গেস্টাপো, নাৎসি জার্মানির কুখ্যাত গোপন রাষ্ট্রীয় পুলিশ; এবং তৃতীয়ত, আইনসাৎজগ্রুপেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গণহারে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য গঠিত বিশেষ ঘাতক দল। নাৎসি রাষ্ট্রের হয়ে সমস্ত ধরনের নজরদারি, দমনপীড়ন, গ্রেফতার এবং গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড এই বাহিনীগুলোই পরিচালনা করত। তবে এদের কোনওটির নামই ‘হাইড্রা’ ছিল না।
তাহলে এই নামটি এত পরিচিত কেন?
কারণ, কোটি কোটি মানুষের কাছে ‘হাইড্রা’ নামটি কোনও ইতিহাসের বইয়ের পাতা থেকে নয়, বরং মার্ভেল-এর দুনিয়া থেকে পরিচিত। মার্ভেল কমিকস এবং ‘মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্স’-এ হাইড্রা হলো একটি কাল্পনিক একনায়কতান্ত্রিক সন্ত্রাসী সংগঠন, যার উৎস হিসেবে নাৎসি জার্মানিকে দেখানো হয়েছে। ‘রেড স্কাল’-এর মতো কুখ্যাত ভিলেনদের দ্বারা পরিচালিত এই সংগঠনটিকে পুরো ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’ ফ্র্যাঞ্চাইজি জুড়ে দেখা গেছে। এই কাল্পনিক সংগঠনটির মূল মন্ত্র বা ‘মোটো’ সরাসরি গ্রিক পুরাণ থেকেই নেওয়া হয়েছে: 'একটি মাথা কেটে ফেললে, সেই জায়গায় আরও দুটি মাথা গজিয়ে উঠবে।' মার্ভেলের এই ‘হাইড্রা’-কে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক, রহস্যময় এবং যাকে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব-ঠিক সেই পৌরাণিক দানবটির মতোই। বিগত কয়েক দশক ধরে মুক্তি পাওয়া একাধিক সিনেমা, টেলিভিশন শো এবং কমিক বুক এই নামটিকে পপ-কালচারের অন্যতম পরিচিত একটি কাল্পনিক সংগঠনে পরিণত করেছে। ফলে, এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে তেলাঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী হয়তো অজান্তেই নাৎসি ইতিহাসের সঙ্গে মার্ভেলের এই কাল্পনিক কাহিনিকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন।
কিন্তু কেন এই রাজনৈতিক বির্তক?
এই বিতর্কটি কেবল একটি ঐতিহাসিক তথ্য গুলিয়ে ফেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কারণ। মূলত হায়দরাবাদে ‘হাইড্রা-র জবরদখল বিরোধী অভিযানের প্রেক্ষাপটেই এই নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছে, যা একদিকে যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, অন্যদিকে তেমনই তীব্র সমালোচনারও মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এই এজেন্সিটি গঠনের পর থেকে হ্রদ, জলাশয়, সরকারি জমি এবং জনসাধারণের সম্পত্তি সংলগ্ন বেআইনি জবরদখল উচ্ছেদে একাধিক বড়সড় অভিযান চালিয়েছে তারা। এর মাধ্যমে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১.১০ লক্ষ কোটি টাকার জমি উদ্ধার বা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
E-Paper

