কেনিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির আইকন এই ভারতীয় বিপ্লবী! কীভাবে আফ্রিকায় পৌঁছোল এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম
Communist Party of Kenya CPK icon: ভারতের একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী কীভাবে সুদূর আফ্রিকায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের মস্ত বড় প্রতীক হয়ে উঠলেন, তার পিছনে লুকিয়ে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
Indian revolutionaries in Africa history: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক কিংবদন্তি। মাত্র ২৩ বছর বয়সে দেশের জন্য ফাঁসির দড়ি গলায় পরে যিনি কোটি কোটি ভারতীয়ের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। কিন্তু শুনলে অবাক হবেন, ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে হাজার হাজার মাইল দূরে পূর্ব আফ্রিকার দেশ কেনিয়াতেও (Kenya) সমানভাবে জনপ্রিয় তিনি। এমনকি ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ কেনিয়া’ (Communist Party of Kenya - CPK)-র অন্যতম প্রধান আইকন বা আদর্শ হলেন ভারতের এই বিপ্লবী। কেনিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলনের পার্টি অফিসে কার্ল মার্ক্স, ভ্লাদিমির লেনিন বা ফিদেল কাস্ত্রোর পাশাপাশি সগর্বে শোভা পায় তাঁর ছবি।

ভারতের একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী কীভাবে সুদূর আফ্রিকায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াইয়ের মস্ত বড় প্রতীক হয়ে উঠলেন, তার পিছনে লুকিয়ে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস।
ভারতের মতো কেনিয়াও দীর্ঘ সময় ধরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের (British Colonial Rule) অধীনে শোষিত ও নির্যাতিত ছিল। ১৯ শতকের শেষের দিকে এবং ২০ শতকের শুরুতে রেললাইন তৈরির কাজে হাজার হাজার ভারতীয় শ্রমিককে কেনিয়ায় নিয়ে যায় ব্রিটিশরা। এর ফলে কেনিয়াতে একটি বড় ভারতীয় বসতি গড়ে ওঠে, যাদের ‘কেনিয়ান-এশিয়ান’ বলা হত। এই ভারতীয় অভিবাসীদের হাত ধরেই ভারতীয় বিপ্লবীর বৈপ্লবিক আদর্শ আফ্রিকার মাটিতে প্রবেশ করে।
১. মাকহান সিং: সংযোগকারী সেতু
এই বিপ্লবী কে? তিনি হলেন ভগৎ সিং। কেনিয়ায় ভগৎ সিংয়ের আদর্শ জনপ্রিয় করার পিছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন কমরেড মাকহান সিং (Makhan Singh)। মাকহান সিং ছিলেন একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত কেনিয়ান বামপন্থী নেতা এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের জনক। ১৯২৭ সালে তিনি যখন পাঞ্জাব থেকে কেনিয়ায় যান, তখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং ভগৎ সিংয়ের ‘নওজোয়ান ভারত সভা’ ও হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HSRA)-এর সমাজতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন।
মাকহান সিং কেনিয়ার আফ্রিকান শ্রমিকদের সংগঠিত করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালী শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি কেনিয়ার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের বোঝান যে, তাঁদের শত্রু শ্বেতাঙ্গরা নয়, বরং শ্বেতাঙ্গদের তৈরি ‘সাম্রাজ্যবাদ’। এই লড়াইয়ে তিনি ভগৎ সিংয়ের ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান এবং তাঁর সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে কেনিয়ার মানুষের প্রতিবাদের ভাষায় পরিণত করেন।
২. ‘মাউ মাউ’ বিদ্রোহ এবং ভগৎ সিং সংযোগ
১৯৫০-এর দশকে কেনিয়ায় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রাম, যা ‘মাউ মাউ বিদ্রোহ’ (Mau Mau Rebellion) নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহের মূল চালিকাশক্তি ছিল কেনিয়ার ভূমি ও স্বাধীনতা যোদ্ধা (KLFA)। ব্রিটিশদের অত্যাচার যখন চরমে পৌঁছায়, তখন কেনিয়ার বিপ্লবীরা ভারতের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা খোঁজেন।
ভগৎ সিং যেভাবে ঔপনিবেশিক শক্তির চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছিলেন এবং জেলখানায় ঐতিহাসিক অনশন করেছিলেন, তা কেনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁরা ভগৎ সিংকে কেবল ভারতের নেতা হিসেবে দেখেননি, বরং বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষের মুক্তির এক আন্তর্জাতিক প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
৩. কেনিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির আইকন হওয়ার কারণ
কমিউনিস্ট পার্টি অফ কেনিয়া (CPK)-র মতে, ভগৎ সিং কেবল একজন বন্দুকধারী জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রখর তাত্ত্বিক মার্ক্সবাদী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে ভগৎ সিং যে সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদের অবসান এবং সর্বহারা শ্রেণীর একনায়কত্ব নিয়ে লিখে গিয়েছেন, তা কেনিয়ার বর্তমান বামপন্থী ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
কেনিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি বিশ্বাস করে যে, আফ্রিকার বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও নব্য-সাম্রাজ্যবাদের (Neo-colonialism) বিরুদ্ধে লড়াই করতে ভগৎ সিংয়ের লিখিত দর্শন অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার। এই কারণেই তাঁরা তাঁদের দলীয় পোস্টার, সেমিনার এবং লিফলেটে ভগৎ সিংয়ের ছবি ও উদ্ধৃতি ব্যবহার করে তরুণ প্রজন্মকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ডাক দেন।
ভগৎ সিং বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিকে হত্যা করা সহজ, কিন্তু আদর্শকে হত্যা করা যায় না।’ তাঁর সেই বাণীর সত্যতা আজ প্রমাণিত কেনিয়ার মাটিতে। ভারতের মাটির বিপ্লবী আজ পূর্ব আফ্রিকার মেহনতি মানুষের প্রতিবাদের ভাষা, শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক আন্তর্জাতিক বাতিঘর।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


