মাথায় হাত বিনিয়োগকারীদের! এক ঘন্টায় উধাও প্রায় ৮ লক্ষ কোটি, কেন রক্তক্ষরণ শেয়ার বাজারে?

শেয়ার বাজারের এই বড় পতনের নেপথ্যে একক কোনও কারণ নয়; বরং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা চাপ একসঙ্গে কাজ করেছে।

Published on: Mar 19, 2026, 14:39:14 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার ধাক্কা এবার সরাসরি পড়ল দালাল স্ট্রিটে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় দেশে গ্যাসের জোগানে টান পড়ছে। এর মধ্যেই বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেল ব্যারেল পিছু ১১০ ডলার ছাপিয়ে গিয়েছে। এর জেরে রক্তাক্ত হল ভারতের শেয়ার বাজার। টানা তিন দিনের ঊর্ধ্বগতির পর বৃহস্পতিবার ধাক্কা খেল ভারতীয় বেঞ্চমার্ক সূচক সেনসেক্স ও নিফটি। যার জেরে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই বিনিয়োগকারীদের প্রায় ৭.৬ লক্ষ কোটির সম্পদ উধাও হয়ে গেছে।

মাথায় হাত বিনিয়োকারীদের!
মাথায় হাত বিনিয়োকারীদের!

এদিন বাজার খোলার পরই বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মোট বাজারমূল্য কমে ৪৩০.৯৯ ট্রিলিয়ন টাকায় নেমে আসে। যা বুধবার ছিল ৪৩৮.৬৩ ট্রিলিয়ন টাকা। দুই প্রধান সূচকই লেনদেনের শুরুতেই ২ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। বিএসই সেনসেক্সের সূচক ১,৫৪৮.৮৫ পয়েন্ট কমে দাঁড়ায় ৭৫,১৫৫.২৮-তে। অন্যদিকে, ৪৫৮.৩৫ পয়েন্ট কমে এনএসই নিফটি ৫০-এর সূচক দাঁড়ায় ২৩,৩১৯.৪৫ পয়েন্টে। বাজারের এই বড় পতনের নেপথ্যে একক কোনও কারণ নয়; বরং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা চাপ একসঙ্গে কাজ করেছে। বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের টাকা তুলে নেওয়া এবং দুর্বল বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি।

শেয়ার বাজারে ধসের কারণ কী?

অপরিশোধিত তেলের বাজারে ধাক্কা: সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক ধাক্কা এসেছে অপরিশোধিত তেলের বাজার থেকে। ইতিমধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। এর পেছনে রয়েছে ইরান ও কাতারের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিকাঠামোর ওপর সাম্প্রতিক হামলা। ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য তেলের দাম বেড়ে গেলে দ্রুত মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধি পায় এবং করপোরেট কোম্পানিগুলোর মুনাফায় চাপ পড়ে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১১০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে ২০২৭ অর্থবর্ষে আয়ের পূর্বাভাসও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে: ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। ইরানের সাউথ পার্স গ্যাস ফিল্ডে হামলা এবং কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে ক্ষতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। ফলে জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। উত্তেজনা বাড়লে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

ব্যাঙ্কিং শেয়ারে বড় পতন: বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে বড় আর্থিক খাতের শেয়ার। এইচডিএফসি ব্যাঙ্কের শেয়ার একাই সেনসেক্সকে ৩৭৩ পয়েন্ট নিচে নামিয়েছে। তাদের শেয়ার ৩.৬৫ শতাংশ কমে ৮১২.৫০ টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক, অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক মিলে সূচক থেকে আরও ২২০ পয়েন্ট কমিয়ে দিয়েছে। অন্যান্য বড় পতন হওয়া কোম্পানির মধ্যে রয়েছে লারসেন অ্যান্ড টুব্রো, বাজাজ ফাইন্যান্স, ইটার্নাল লিমিটেড। এই পতন কোনও একক খাতের নয়, বরং পুরো বাজারজুড়ে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।

বিদেশি বিনিয়োগকারী: এই পরিস্থিতিতে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (এএফপিআই) ধারাবাহিকভাবে ভারতীয় বাজার থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। এ মাসে মাত্র ১২টি ট্রেডিং সেশনে তাঁরা ৭৭,২১৪ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬,৪০০ কোটি টাকা। এই ধারাবাহিক অর্থপ্রবাহ শেয়ার বাজারের পাশাপাশি টাকার ওপরও চাপ তৈরি করছে এবং বাজারে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।

বাজারে নেতিবাচক প্রবণতা: এশিয়ার অন্যান্য বাজারেও একই ধরনের নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২ শতাংশের বেশি কমেছে জাপানের নিক্কেই ২২৫। অন্যদিকে, হ্যাং সেং, কসপি এগুলিও নিম্নমুখী ছিল। এর আগে ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং নাসডাক কম্পোজিট-ও পতনের মধ্যেই লেনদেন শেষ হয়েছে।

সুদের হার কমায়নি ফেড: মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ৩.৫-৩.৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। ফেডের বার্তা স্পষ্ট : শীঘ্রই সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা নেই। এতে বৈশ্বিক বাজারে তারল্য কমে যায় এবং ভারত-সহ উদীয়মান বাজারগুলো কিছুটা কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

বর্তমান বাজার সংশোধন মূলত বৈশ্বিক ধাক্কার কারণে হয়েছে, দেশের মৌলিক অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে নয়। তবে এই তীব্র পতন দেখাচ্ছে যে বিশ্বব্যাপী ঝুঁকির প্রতি বাজার কতটা সংবেদনশীল। যদি তেলের দাম স্থিতিশীল হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমে, তাহলে বাজার আবার সমর্থন পেতে পারে। কিন্তু এসব চাপ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বাজারে অস্থিরতা উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। এই প্রসঙ্গে ইনভেস্টরএআই-এর সিইও ব্রুস কিথ বলেন, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও তেলের দাম বাড়ার কারণে ঝুঁকির মাত্রা দ্রুত বেড়েছে এবং এর প্রভাব ভারতীয় বাজারেও পড়ছে।