US-Iran peace deal: কেন মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
US-Iran peace deal: এশিয়ায় সংঘাত থামাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনাকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেন, ওই অঞ্চলে দ্রুত শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরা দরকার। একই সঙ্গে সমুদ্রপথে অবাধ যাতায়াতের বিষয়টিও নিশ্চিত করার কথা বলেছেন তিনি।
US-Iran peace deal: প্রায় ১০৭ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের পর এই শান্তি চুক্তি কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর ফলে গত সাড়ে তিন মাস ধরে বন্ধ থাকার পর অবশেষে খুলতে চলেছে বিশ্বের তৈল ধমনী হরমুজ প্রণালী। তাই এই চুক্তি সমগ্র বিশ্বের পাশাপাশি ভারতের জন্যেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে, অবশেষে রবিবার একটি সমঝোতা স্মারক বা ‘মউ’-এ সম্মত হয়েছে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান এবং কাতারের মধ্যস্থতায় চলা আলোচনার পর এই সমঝোতা সম্ভব হয়। আগামী শুক্রবার সুজারল্যান্ডের জেনেভায় এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর ফলে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধের অবসান ঘটবে এবং পুনরায় খুলে দেওয়া হবে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’। উল্লেখ্য, ভারত তার চাহিদার ৮৫ শতাংশ তেল আমদানি করে থাকে। আর তা করে থাকে এই হরমুজ প্রণালী মারফতই। এদিকে, পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত থামাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনাকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সোমবার তিনি এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে বলেন, ওই অঞ্চলে দ্রুত শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরা দরকার। একই সঙ্গে সমুদ্রপথে অবাধ যাতায়াতের বিষয়টিও নিশ্চিত করার কথা বলেছেন তিনি।
অন্যদিকে, দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, শিপিং কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া-র নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম দ্বারা পরিচালিত ‘দিশা’ নামের একটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে। কাতার থেকে আনা ৬২,৩৭০ মেট্রিক টন এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের কার্গো নিয়ে ট্যাংকারটি গুজরাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। এই বড় সাফল্যের পরেও, শিপিং সংস্থাগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে স্বাভাবিক যান চলাচল পুনরুদ্ধার হতে আরও কয়েক সপ্তাহ, এমনকী কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে; কারণ ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্যের কারণে এই শান্তি চুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা টিকবে, তা নিয়ে এখনও গভীর সংশয় রয়েছে। অর্থনৈতিক থিংক ট্যাংক ‘গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব জানান, নিজের জ্বালানি চাহিদার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ভারতের কাছে এই চুক্তি বড় স্বস্তি নিয়ে আসছে। সংঘাত চলাকালীন অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের আকাশছোঁয়া দাম, টাকার মূল্যের ওপর প্রচণ্ড চাপ এবং মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতির যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, এই চুক্তির ফলে তা থেকে মুক্তি মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই সংঘাত মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ভারতের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার ছবিকে সামনে এনেছে। উল্লেখ্য, ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৫০ শতাংশ, এলপিজি সরবরাহের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং এলএনজি আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই অঞ্চল থেকে উৎস করে থাকে। আর এই অতি-নির্ভরশীলতার কারণেই সংঘাতের দিনগুলোতে ভারতীয় তেল শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলো ভেনেজুয়েলার মতো দূরবর্তী বাজার থেকে বিকল্প জ্বালানি খুঁজতে বাধ্য হয়েছিল।
অ্যাসোচ্যাম-এর সভাপতি নির্মল কে মিন্ডা ইরান-মার্কিন এই সমঝোতাকে সমগ্র বিশ্বের কল্যাণের জন্য একটি 'বড় সাফল্য' হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়াল এই চুক্তি নিয়ে তৈরি হওয়া অন্তর্নিহিত সংশয়টিকেই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, 'এই শান্তি চুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে এবং স্থায়ী রূপ পায়, তবে বাণিজ্য-সংক্রান্ত বহু চ্যালেঞ্জ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে।' গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ভারতকে এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়েছে। কারণ একদিকে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে-উল্লেখ্য, সংঘাত শুরু হওয়ার ঠিক কয়েক দিন আগেই প্রধানমন্ত্রী মোদী ইজরায়েল সফর করেছিলেন, তেমনই অন্যদিকে ইরান ও আরব দেশগুলির সঙ্গেও ভারতের রয়েছে ঐতিহাসিক ও দীর্ঘকালীন সুসম্পর্ক। ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর ভারত ইরানের কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার আগে পর্যন্ত, দেশের শীর্ষ তিনটি জ্বালানি সরবরাহকারীর অন্যতম ছিল ইরান। সংঘাতের অবসান ঘটাতে ভারত সবসময়ই আলোচনা ও কূটনীতির পথে ফেরার ওপর জোর দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলোর ওপর ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্র নিন্দাও জানিয়েছে নয়াদিল্লি; কারণ এই দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিক বসবাস করেন। এর মাঝেই জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে জোরদার যোগাযোগ ও দৌত্য চালানো হয়-যার অংশ হিসেবে গত মাসেই প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজে সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সফর করেন। যদিও ওই অঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে যে, ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিছু জ্বালানি পরিকাঠামো বা তেল শোধনাগার সম্পূর্ণ সচল হতে এখনও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হওয়া-যার মধ্যে ইরানের তেল বিক্রির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার অন্তর্ভুক্ত, নয়াদিল্লির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি সম্ভব হলে ভারত যেমন তেহরানের কাছ থেকে পুনরায় জ্বালানি কেনা শুরু করতে পারবে, তেমনই ইরানের চাবাহার বন্দরের উন্নয়ন কাজও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। উল্লেখ্য, ভারতের ‘ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোর’ পরিকল্পনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে এই চাবাহার বন্দর।
E-Paper

