সনাতন ধর্মের দীর্ঘ ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে ‘দেবশয়নী একাদশী’ (Devshayani Ekadashi) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র এক তিথি হিসেবে গণ্য হয়। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের এই বিশেষ একাদশী তিথি থেকেই শুরু হয় দেবশয়নী ব্রত এবং সূচনা ঘটে চার মাসব্যাপী অত্যন্ত পবিত্র ‘চাতুর্মাস’ (Chaturmas) পর্বের। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিন থেকেই জগতের পালনকর্তা ভগবান শ্রী হরি বিষ্ণু ক্ষীরসাগরে চার মাসের জন্য যোগনিদ্রায় মগ্ন হন।

পরবর্তী চার মাস, অর্থাৎ কার্তিক মাসের দেবউত্থান একাদশী পর্যন্ত ভগবান বিষ্ণু নিদ্রিত থাকেন বলে এই সময়টিতে যেকোনো ধরণের মাঙ্গলিক কাজ যেমন—বিবাহ, গৃহপ্রবেশ, অন্নপ্রাশন ও উপনয়ন ইত্যাদি বন্ধ রাখা হয়। দেবশয়নী ব্রতের মূল কথা বা গল্পকথা (Vrat Katha) কী, এর ধর্মীয় মাহাত্ম্য ও চাতুর্মাসের গুরুত্ব কতটা—তা জেনে নিন।
ধর্মীয় পঞ্জিকা ও শাস্ত্র মতে, দেবশয়নী একাদশী মানবজীবনে আধ্যাত্মিক শুদ্ধি এবং মন সংযোগের এক মহা সুযোগ এনে দেয়। এই দিনে ব্রত পালন করলে ও ব্রতকথা শ্রবণ করলে মানুষের জীবনের সমস্ত জ্ঞাত-অজ্ঞাত পাপ ধুয়ে মুছে যায় এবং অক্ষয় পুণ্য লাভ হয়।
দেবশয়নী একাদশীর বিখ্যাত ব্রতকথা
পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, সত্যযুগে ‘মানধাতা’ নামে এক অত্যন্ত ধার্মিক ও প্রজাপালক রাজা ছিলেন। তাঁর রাজ্যে প্রজা সাধারণ অত্যন্ত সুখে-শান্তিতে দিনযাপন করছিল। কিন্তু একবার এক মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় সেই রাজ্য। টানা তিন বছর সেখানে এক ফোটা বৃষ্টিপাত হয়নি, যার ফলে তীব্র খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। অন্ন ও জলের অভাবে প্রজা সাধারণ ত্রাহি ত্রাহি রব তোলে এবং রাজপ্রাসাদে গিয়ে রাজার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে।
রাজা মানধাতা প্রজা দুঃখ দূর করতে ও খরার সমাধান খুঁজতে বনে বনে ঘুরে অঙ্গিরা ঋষির আশ্রমে পৌঁছান। ঋষি অঙ্গিরা রাজাকে বলেন যে, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের ‘দেবশয়নী একাদশী’ তিথিতে সম্পূর্ণ নিয়ম নিষ্ঠা মেনে পরম পুরুষ ভগবান বিষ্ণুর পূজা ও ব্রত পালন করতে।
{{/usCountry}}রাজা মানধাতা প্রজা দুঃখ দূর করতে ও খরার সমাধান খুঁজতে বনে বনে ঘুরে অঙ্গিরা ঋষির আশ্রমে পৌঁছান। ঋষি অঙ্গিরা রাজাকে বলেন যে, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের ‘দেবশয়নী একাদশী’ তিথিতে সম্পূর্ণ নিয়ম নিষ্ঠা মেনে পরম পুরুষ ভগবান বিষ্ণুর পূজা ও ব্রত পালন করতে।
{{/usCountry}}ঋষির পরামর্শ মতো রাজা মানধাতা তাঁর সমগ্র প্রজাবর্গকে সাথে নিয়ে অত্যন্ত ভক্তিভরে দেবশয়নী একাদশীর উপবাস ও পূজার্চনা করেন। ব্রতের প্রভাবে দেবগুরু ও শ্রী হরি অত্যন্ত প্রসন্ন হন এবং অলৌকিক আশীর্বাদস্বরূপ রাজ্যে মূষলধারে বৃষ্টিপাত শুরু হয়। খরা দূর হয়ে রাজ্য পুনরায় শস্য-শ্যামলা হয়ে ওঠে এবং প্রজা সাধারণ তাঁদের কষ্ট থেকে মুক্তি পান। সেই থেকে সনাতন ধর্মে এই ব্রত পালনের প্রথা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
কেন যোগনিদ্রায় যান ভগবান বিষ্ণু?
অন্য এক পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, দৈত্যরাজ বলি যখন তাঁর পরাক্রম দিয়ে ত্রিভুবন জয় করে নিয়েছিলেন, তখন ভগবান বিষ্ণু বামন অবতার রূপ ধারণ করে বলির কাছে তিন পদ ভূমি দান চান। দুই পদে সমগ্র স্বর্গ ও মর্ত্য মেপে নেওয়ার পর তৃতীয় পদের জন্য রাজা বলি নিজের মস্তক এগিয়ে দেন। বলির এই পরম ভক্তি ও দানে সন্তুষ্ট হয়ে ভগবান শ্রী হরি তাঁকে পাতাল পুরীর রাজা করেন এবং বলির অনুরোধে তিনি নিজে পাহারাদার হিসেবে পাতাল পুরীতে অবস্থান করার প্রতিশ্রুতি দেন।
পরবর্তীতে মাতা লক্ষ্মী এক বিশেষ কৌশলে রাজা বলির কাছ থেকে শ্রী হরিকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। তবে ভক্ত বলির মন রাখতে ভগবান বিষ্ণু প্রতিশ্রুতি দেন যে, প্রতি বছর আষাঢ় মাসের দেবশয়নী একাদশী থেকে কার্তিক মাসের দেবউত্থান একাদশী পর্যন্ত চার মাস তিনি পাতাল পুরীতে যোগনিদ্রায় অবস্থান করবেন।
দেবশয়নী ব্রত ও চাতুর্মাসের গুরুত্ব
- আধ্যাত্মিক সাধনা ও সংযম: চাতুর্মাসের এই চার মাস হলো মূলত আত্মশুদ্ধি, জপ-তপ ও সাধনার সময়। এই সময় খাদ্যাভ্যাসে সংযম পালন করা হয় এবং দিনে একবেলা সাত্বিক আহার গ্রহণ করা অত্যন্ত শুভ মনে করা হয়।
- মানসিক শান্তি ও পুণ্য লাভ: চাতুর্মাসে ভগবান বিষ্ণুর মঙ্গলারতি, বিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ এবং তুলসী পূজা করলে গৃহে সুখ-শান্তি বজায় থাকে এবং মানসিক বিষাদ ও চাপ দূর হয়।
- পাপ থেকে মুক্তি: বৈদিক জ্যোতিষ ও পুরাণ মতে, এই ব্রত পালন করলে বংশানুক্রমিক পাপ ও গ্রহ দোষ দূর হয়ে জীবনে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও মনের কামনা পূরণ হয়।
দেবশয়নী ব্রত আমাদের কেবল ধর্মীয় আচার শেখায় না, এটি প্রকৃতি, ঈশ্বর এবং নিজের মনকে অনুশাসনের মধ্যে আনার এক দারুণ শিক্ষা দেয়। ভক্তিভরে এই ব্রতের কথা শ্রবণ ও বিষ্ণু নাম জপ করলে জীবনের সব সংকট দূর হয়ে পরম শান্তি লাভ হয়।