শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভ বিজয়া দশমী মানেই চোখ ভরা জল আর বিষাদের করুণ সুর। ঢাকের কাঠিতে 'ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ, ঠাকুর যাবে বিসর্জন' সুর বাজার সাথে সাথেই বাঙালি হৃদয়ে নেমে আসে এক শূন্যতার অনুভূতি। বৈদিক শাস্ত্র ও পঞ্জিকা মতে, চার দিন ধরে মর্ত্যে অবস্থান করার পর দশমীর দিনে উমা রূপী মা দুর্গা মর্ত্যধাম ছেড়ে শ্রী কৈলাসে মহাদেবের সমীপে প্রত্যাবর্তন করেন। তবে দেবী বিসর্জন কেবল এক বিচ্ছেদের পর্ব নয়; এটি দেবী দুর্গার সূক্ষ্ম রূপের মহিমাকে হৃদয়ে ধারণ করা এবং আগামী বছরের জন্য পুনরাগমন প্রার্থনার পরম মুহূর্ত।

দুর্গোৎসব ২০২৬-এর প্রতিমা নিরঞ্জনের সুনির্দিষ্ট তারিখ কখন, ঘট নাড়ানো ও দর্পণ বিসর্জনের শুভ মহেন্দ্রক্ষণ কোনটি, গঙ্গায় বা জলাশয়ে বিসর্জনের নিয়মকানুন কী এবং শাস্ত্রীয় প্রথাগুলি কীভাবে পালিত হয়—জেনে নিন।
১. দুর্গোৎসব ২০২৬: দেবী বিসর্জনের তারিখ ও শুভ মুহূর্ত (Date & Auspicious Timing)
বৈদিক পঞ্জিকা ও জ্যোতিষ শাস্ত্রীয় পঞ্চাঙ্গ অনুযায়ী ২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গোৎসবে মা দুর্গার প্রতিমা বিসর্জনের নির্ধারিত তারিখ ও সময়সীমা নিচে তুলে ধরা হলো:
- বিসর্জনের শুভ তারিখ: ২১ অক্টোবর, ২০২৬ (বুধবার)।
- দশমী বিহিত পুজো ও ঘট চালনা: ২১ অক্টোবর সকালে সূর্যোদয়ের পর সকাল ০৬:২৫ মিনিট থেকে সকাল ০৮:৪০ মিনিটের মধ্যে শ্রীশ্রী দুর্গার দশমী বিহিত পুজো এবং পুজোর সমাপ্তি ঘট চালনা সম্পাদন করা শাস্ত্রীয়।
- দর্পণ বিসর্জনের শুভ সময়: সকাল ০৮:৪৫ মিনিট থেকে সকাল ১০:১৫ মিনিটের মধ্যে প্রতিমার সামনে জলপাত্রে দেবীর ছায়া দেখে প্রতীকী 'দর্পণ বিসর্জন' সম্পন্ন করতে হয়।
- প্রতিমা নিরঞ্জন ও শোভাযাত্রার শুভ মহেন্দ্রক্ষণ: ২১ অক্টোবর অপরাহ্ন কাল অর্থাৎ দুপুর ০১:১৫ মিনিট থেকে বিকাল ০৪:৪৫ মিনিটের মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া সবচেয়ে প্রশস্ত ও পরম ফলদায়ক।
২. দেবী বিসর্জনের বৈদিক পুজো বিধি ও প্রথা (Rituals & Traditions)
{{/usCountry}}২. দেবী বিসর্জনের বৈদিক পুজো বিধি ও প্রথা (Rituals & Traditions)
{{/usCountry}}শাস্ত্রীয় মতে দুর্গা প্রতিমা জলাশয়ে নিরঞ্জনের পূর্বে মণ্ডপে ও ঘাটে একাধিক ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আচার নিষ্ঠার সাথে পালন করা হয়:
- ১. ঘট চালনা ও দর্পণ বিসর্জন: দশমী পুজোর শেষে পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পুজোর ঘট সামান্য নাড়িয়ে দেন, যার অর্থ দেবীর মর্ত্য লীলা সাঙ্গ হলো। এরপর কাঁসার থালায় পরিষ্কার জল ঢেলে তাতে দেবীর প্রতিবিম্ব দর্শনের মাধ্যমে 'দর্পণ বিসর্জন' করা হয়।
- ২. দেবীর বরন ও মিষ্টি মুখ: মণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিরঞ্জনের উদ্দেশ্যে বের করার আগে সধবা নারীরা বরন ডালায় পান, সুপুরি, সিঁদুর, ধান-দূর্বা ও মিষ্টি নিয়ে মা দুর্গার বরন করেন। পানের পাতা দিয়ে দেবীর গাল স্পর্শ করিয়ে মিষ্টি মুখ করানো হয়।
- ৩. সিঁদুর খেলা ও শুভ বিজয়া: বরনের পর দেবীর চরণে ও সিঁথিতে সিঁদুর অর্পণ করা হয়। এরপর নারীরা পরস্পরের গালে ও সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দীর্ঘ সৌভাগ্য কামনা করেন।
- ৪. নিরঞ্জন ও প্রদক্ষিণ প্রথা: গঙ্গার ঘাট বা কোনো পবিত্র জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে প্রতিমা নিরঞ্জনের পূর্বে ৩ বার বা ৭ বার প্রতিমা ঘুরিয়ে দেবীর চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়। এরপর জয়ধ্বনি ও ঢাকের শব্দের মাঝে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়।
- ৫. শান্তির জল ও অপরাজিতা ধারণ: বিসর্জনের পর ঘাট থেকে ঘটে করে সংগৃহীত প্রফুল্ল 'শান্তিজল' ভক্তদের মাথায় ছিটানো হয় এবং হাতে অপরাজিতা লতা ধারণ করা হয়, যা সমস্ত বিঘ্ন দূর করে শুভ শক্তি প্রদান করে।
৩. দেবী দুর্গার বিসর্জনের গভীর আত্মিক তাৎপর্য (Significance)
প্রতিমা নিরঞ্জন কেবল মাটির প্রতিমা জলে বিসর্জন দেওয়া নয়, এটি সনাতন দর্শনের গভীর সত্য নির্দেশ করে:
- রূপ থেকে অরূপে প্রস্থান: মাটির তৈরি মৃণ্ময়ী প্রতিমায় চার দিন ধরে যে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে পুজো করা হয়েছিল, বিসর্জনের মাধ্যমে দেবী সেই মাটির রূপ ত্যাগ করে সর্বব্যাপী চিন্ময়ী রূপে পরিণত হন।
- পুনরাগমনের আশায় বিদায়: 'আসছে বছর আবার হবে' ধ্বনির মধ্য দিয়ে বাঙালি কেবল বিচ্ছেদ প্রকাশ করে না, বরং নতুন আশা ও আনন্দের সাথে মায়ের আগামী বছরের অপেক্ষায় দিন গোনা শুরু করে।
২১ অক্টোবর ২০২৬-এর বিজয়া দশমীতে অশ্রুসজল চোখে মা দুর্গার বিসর্জন বাঙালির অন্তরে ভক্তি ও শ্রদ্ধার দীপ্তি জ্বালিয়ে রাখে। দেবী দুর্গার আশীর্বাদে সবার জীবন থেকে হিংসা, বিভেদ ও অশুভ শক্তি বিনাশ হোক এবং সমগ্র পৃথিবীতে নেমে আসুক সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।