বাঙালির প্রাণের উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবে মৃণ্ময়ী মাটির প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠার পূর্বলগ্নে সবচেয়ে পবিত্র, স্পর্শকাতর ও অলৌকিক মুহূর্ত হলো 'চক্ষুদান' (Chokkhu Daan)। শাস্ত্রীয় ও মৃৎশিল্পীদের ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুযায়ী, প্রতিমা গড়ার কাজ প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার পর সবশেষে দেবীর ত্রিনয়ন বা চোখ আঁকা হয়। মা দুর্গার চোখ আঁকার এই বিশেষ প্রক্রিয়াটি কেবল একটি শৈল্পিক তুলির টান নয়; এটি এক গূঢ় ধর্মীয় আচার, যা মাটির প্রতিমাকে জীবন্ত রূপময়ী ও জ্যোতির্ময়ী আধ্যাত্মিক সত্তায় পরিণত করে।

২০২৬ সালের দুর্গোৎসবে চক্ষুদান পর্বের বিশেষ গুরুত্ব কী, কখন ও কীভাবে পালন করা হয় এই সুপ্রাচীন প্রথা এবং মৃৎশিল্পীদের ঘরে এই মহেন্দ্রক্ষণের পৌরাণিক ও সামাজিক তাৎপর্য কী—জেনে নিন।
১. 'চক্ষুদান' কী এবং কেন এই প্রথা এত মহিমান্বিত?
'চক্ষুদান' শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো দেবীকে নয়ন অর্পণ করা। প্রতিমা গড়ার সময় মৃৎশিল্পীরা কাঠামো তৈরি, মাটি লেপা ও রঙ করার কাজ শেষ করলেও প্রতিমার চক্ষু আঁকা বা উন্মোচন বাকি রাখেন।
- প্রাণপ্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ: বৈদিক মতে, দেবীর চোখ আঁকার মাধ্যমেই প্রতিমায় প্রথম চেতনার সঞ্চার হয়। চোখ না আঁকা পর্যন্ত প্রতিমাকে কেবল মাটির একটি শিল্পকর্ম বলে মান্য করা হয়; চক্ষু আঁকার পর থেকেই তিনি মৃণ্ময়ী থেকে চিন্ময়ী রূপে রূপান্তরিত হন।
- শুভ চেতনা ও অশুভ শক্তির বিনাশ: দেবীর তিন চোখ হলো সূর্য, চন্দ্র ও অগ্নির প্রতীক। দেবীর এই ত্রিনয়ন অসুর শক্তির বিনাশ, ভক্তদের সুরক্ষা এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আলোক সঞ্চারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
২. কখন ও কীভাবে অনুষ্ঠিত হয় চক্ষুদান পর্ব? (Timing & Rituals)
{{/usCountry}}২. কখন ও কীভাবে অনুষ্ঠিত হয় চক্ষুদান পর্ব? (Timing & Rituals)
{{/usCountry}}সনাতন শাস্ত্র ও কুমোরটুলির সুপ্রাচীন প্রথা অনুযায়ী চক্ষুদান পালনের নির্দিষ্ট কিছু নিয়মাবলী অনুসরণ করা হয়:
- মহালয়ার পুণ্যপ্রাতে চক্ষুদান: সাধারণ প্রথা অনুযায়ী, মহালয়ার ভোরে পিতৃপক্ষের সমাপ্তি ও দেবীপক্ষের শুভ সূচনালগ্নে প্রতিমার চক্ষুদান করা হয়। ১০ অক্টোবর ২০২৬ (শনিবার) মহালয়ার পুণ্যতিথিতে কুমোরটুলিসহ রাজ্যের সমস্ত মৃৎশিল্পালয়ে দেবীর চক্ষু আঁকার প্রধান পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
- শিল্পীদের উপবাস ও শুদ্ধাচার: চোখ আঁকার দিন প্রবীণ মৃৎশিল্পীরা সকালে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করেন এবং উপবাস থাকেন। মন একাগ্র করে পরম ভক্তিতে দেবীর ত্রিনয়ন অংকন শুরু করেন।
- বাম চোখ থেকে আঁকার প্রাচীন নিয়ম: শাস্ত্রীয় লোকপ্রথা মতে, প্রথমে দেবীর বাম চোখ (চন্দ্র প্রতীক), তারপর ডান চোখ (সূর্য প্রতীক) এবং সবশেষে কপালে তৃতীয় নয়ন (অগ্নি প্রতীক) আঁকা হয়। শিল্পীরা সূক্ষ্ম তুলিতে কালো কাজল বা রঙ দিয়ে সম্পূর্ণ নীরবতায় এই কাজটি সম্পন্ন করেন।
- মহাসপ্তমীতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও দর্পণ দর্শন: মহালয়ায় চক্ষু আঁকা হলেও মণ্ডপে প্রতিমা মণ্ডপস্থ হওয়ার পর মহাসপ্তমীর দিন (১৮ অক্টোবর ২০২৬) বৈদিক চণ্ডীপাঠ, প্রাণপ্রতিষ্ঠা মন্ত্র এবং প্রদীপের আলোয় দর্পণ (আয়না) দেখিয়ে দেবীর চক্ষ উন্মোচন পুজো সম্পন্ন করা হয়।
৩. মৃৎশিল্পীদের বিশ্বাস ও পৌরাণিক তাৎপর্য
চক্ষুদান কেবল একটি আচার নয়, এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে শিল্পীদের বংশপরম্পরার আবেগ ও সুগভীর বিশ্বাস:
- শিল্পীর আত্মিক রূপান্তর: কুমোরটুলির শিল্পীরা বিশ্বাস করেন যে, চোখ আঁকার মুহূর্তে তাঁদের হাত কেবল নিজের ইচ্ছায় চলে না; স্বয়ং দেবী তাঁদের হাতের মাধ্যমে নিজের রূপ প্রকাশ করেন। তাই এই সময় কারখানাগুলোতে পিনপতন নীরবতা বজায় রাখা হয়।
- ত্রিনয়নের শক্তি দর্শন: দেবী দুর্গার ডান চোখ জ্ঞান ও প্রকাশের প্রতীক, বাম চোখ করুণা ও স্নেহের প্রতীক এবং কপালে অবস্থিত তৃতীয় নয়ন প্রজ্ঞা ও অসুরের কালান্তক সংহারক রূপ নির্দেশ করে।
১০ অক্টোবর ২০২৬-এর মহালয়ায় মৃৎশিল্পীদের সুনিপুণ তুলির টানে ফুটে উঠবে মা দুর্গার সেই করুণাময় অথচ অসুরবিনাশী ত্রিনয়ন। চক্ষুদান প্রথার মাধ্যমে প্রতিমায় ফুটে ওঠা সেই স্বর্গীয় দৃষ্টি কোটি কোটি বাঙালির মনে জাগিয়ে তোলে আনন্দের নতুন আলো এবং মাতৃ আরাধনার চিরন্তন তাগিদ।