সনাতন হিন্দু ধর্মে সিদ্ধিদাতা শ্রী গণেশ হলেন প্রজ্ঞা, নম্রতা ও বিঘ্নবিনাশের রূপক। অন্যদিকে নবগ্রহের অন্যতম চন্দ্রদেব হলেন রূপ, সৌন্দর্য ও শুভ্রতার প্রতীক। তবে হিন্দু পুরাণ ও শাস্ত্রের পাতায় এই দুই দেবতার মধ্যে এক চরম বিবাদ ও সংঘাতের বিবরণ পাওয়া যায়। এই পৌরাণিক ঘটনার ফলেই আজ পর্যন্ত গণেশ চতুর্থীর রাতে চন্দ্র দর্শন বা চাঁদ দেখা নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হয়।

কেন তৈরি হয়েছিল গণপতি ও চন্দ্রদেবের মধ্যে এই বিবাদ? গণপতির দেওয়া অভিশাপের কারণে কীভাবে নিজের সৌন্দর্য হারিয়েছিলেন চন্দ্রদেব? পরবর্তীতে কীভাবে মিলল সেই অভিশাপ থেকে মুক্তি?—এই সমস্ত পৌরাণিক ও শাস্ত্রীয় কাহিনি জেনে নিন।
বিবাদের সূত্রপাত: গণপতির পেট এবং চন্দ্রদেবের পরিহাস
গণপতি ও চন্দ্রদেবের বিবাদের মূল কাহিনীটি পদ্ম পুরাণ ও গণেশ পুরাণে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত রয়েছে।
কুবেরের ভোজ ও গণপতির আহার: একদা ধনাধ্যক্ষ কুবের এক বিশাল ভোজের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে গণপতি নিমন্ত্রিত হয়ে প্রচুর পরিমাণে মোদক ও মিষ্টি আহার করেন। ভোজন শেষে তাঁর পেট অত্যন্ত ভারী হয়ে যায়। গণপতি তাঁর বাহন ইঁদুরের ওপর চেপে কৈলাসের উদ্দেশে রওনা হন।
ইঁদুরের চমকে ওঠা ও গণপতির পতন: পথিমধ্যে একটি সাপ হঠাৎ ইঁদুরের সামনে চলে এলে ইঁদুরটি ভয় পেয়ে লাফিয়ে ওঠে। এর ফলে গণপতি ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যান এবং তাঁর উদর ফেটে মোদকগুলো বাইরে বেরিয়ে আসে। গণপতি শান্ত মাথায় সমস্ত মোদক কুড়িয়ে পেটে পুরে একটি সাপকে কোমরবন্ধ (বেল্ট) হিসেবে পেটে বেঁধে নেন।
চন্দ্রদেবের অহংকার ও উপহাস: মহাকাশে উদিত চন্দ্রদেব গণপতির এই রূপ এবং পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে নিজের হাসি ধরে রাখতে পারেননি। রূপ ও সৌন্দর্যের অহংকারে মত্ত চন্দ্রদেব উচ্চস্বরে সিদ্ধিদাতা গণপতিকে উপহাস করা শুরু করেন।
গণেশের ক্ষোভ, ভয়ঙ্কর অভিশাপ ও অভিশাপের প্রভাব
{{/usCountry}}চন্দ্রদেবের অহংকার ও উপহাস: মহাকাশে উদিত চন্দ্রদেব গণপতির এই রূপ এবং পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে নিজের হাসি ধরে রাখতে পারেননি। রূপ ও সৌন্দর্যের অহংকারে মত্ত চন্দ্রদেব উচ্চস্বরে সিদ্ধিদাতা গণপতিকে উপহাস করা শুরু করেন।
গণেশের ক্ষোভ, ভয়ঙ্কর অভিশাপ ও অভিশাপের প্রভাব
{{/usCountry}}চন্দ্রদেবের এই অসংবেদনশীল আচরণ ও অহংকার দেখে বিঘ্নহর্তা গণপতি চরম ক্রুদ্ধ হন।
চন্দ্রদেবকে দেওয়া অভিশাপ: গণপতি চন্দ্রদেবকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য অভিশাপ দেন— ‘যে রূপ ও আলোর অহংকারে তুমি আজ আমাকে উপহাস করলে, সেই রূপ ও কান্তি তোমার চিরতরে বিলুপ্ত হবে। আজ থেকে তুমি অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাবে এবং যে ব্যক্তি ভাদ্রপদ মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে তোমার দিকে তাকাবে, সে মিথ্যা কলঙ্ক ও অপবাদের শিকার হবে।’
সংসারে চন্দ্রকান্তি বিলোপ ও ত্রাহি ত্রাহি: অভিশাপের পর মুহূর্তে চন্দ্রদেব তাঁর সমস্ত আলো ও সৌন্দর্য হারিয়ে কালচে হয়ে যান। মহাবিশ্বে চন্দ্রের শীতল আলোর অভাব দেখা দেয় এবং গাছপালা ও ঔষধি উদ্ভিদের বৃদ্ধি স্তব্ধ হয়ে যায়। দেবগণ ও স্বয়ং চন্দ্রদেব নিজের ভুল বুঝতে পেরে গণপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন।
ক্ষমা প্রার্থনা, অভিশাপের সংশোধন ও চন্দ্র দর্শনের নিয়ম
চন্দ্রদেব নিজের ভুল বুঝতে পেরে গণপতির কঠোর তপস্যা করা শুরু করেন এবং দেবগণও মহাদেব শিব ও ব্রহ্মা দেবকে সাথে নিয়ে গণপতির কাছে আবেদন জানান।
- অভিশাপ লাঘব ও কৃষ্ণপক্ষ-শুক্লপক্ষ: গণপতি দয়ালু হয়ে চন্দ্রদেবকে পুরোপুরি অভিশাপ মুক্ত না করলেও তা লাঘব করেন। তিনি বিধান দেন যে চন্দ্রের আলো চিরস্থায়ী থাকবে না—তা ১৫ দিন ধরে ক্ষয়প্রাপ্ত হবে (কৃষ্ণপক্ষ) এবং পরবর্তী ১৫ দিন ধরে ধীরে ধীরে পূর্ণতায় পৌঁছাবে (শুক্লপক্ষ)। এর ফলেই সৃষ্টি হয় পূর্ণিমা ও অমাবস্যার চক্র।
- গণেশ চতুর্থীতে চাঁদ দর্শন এড়ানোর বিধান: তবে ভাদ্রপদ শুক্ল চতুর্থীতে শাপের প্রভাব বজায় রাখার কথা বলেন গণেশজি। ফলে আজও শাস্ত্র মতে গণেশ চতুর্থীর দিন ভুলবশত চাঁদ দেখলে মিথ্যা চুরির বা চরিত্রে অপবাদের শিকার হতে হয় (যেমনটা সত্যানুসন্ধানে শ্রীকৃষ্ণের শ্যামন্তক মণি চুরির অপবাদের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল)।
গণপতি ও চন্দ্রদেবের এই বিবাদের পৌরাণিক ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে রূপ, বিদ্যা বা সম্পদের অহংকার মানুষকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। অন্যের শারীরিক গঠন বা বিপদে উপহাস না করে নম্রতা বজায় রাখাই পরম ধর্মীয় ধর্ম।