Origin of Gayatri Mantra: হিন্দু সনাতন ধর্মে দেবী গায়ত্রীকে ‘বেদমাতা’ বা সমস্ত বেদের জননী হিসেবে গণ্য করা হয়। আজ ২০২৬ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে সমগ্র ভারতজুড়ে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠার সাথে উদযাপিত হচ্ছে ‘গায়ত্রী জয়ন্তী ২০২৬’ (Gayatri Jayanti 2026)। পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পুণ্য তিথিতেই আদিশক্তি দেবী গায়ত্রী মর্ত্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

একদিকে মহাশক্তি অন্য দিকে পরম জ্ঞান—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে তৈরি দেবী গায়ত্রীর রূপ এবং তাঁর চব্বিশ অক্ষরের অলৌকিক ‘গায়ত্রী মন্ত্র’ (Gayatri Mantra)-র উৎপত্তির পেছনের ইতিহাস অত্যন্ত মহিমান্বিত। বেদমাতা গায়ত্রী এবং তাঁর এই ঐশ্বরিক মন্ত্রের অজানা কাহিনি জেনে নিন।
সনাতন ধর্মে গায়ত্রী মন্ত্রকে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং মহামন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এই মন্ত্র এবং দেবীর প্রকাশ কীভাবে হয়েছিল, তা জানতে আমাদের ফিরে যেতে হবে সৃষ্টির আদি লগ্নে, ব্রহ্ম পুরাণের এক পৌরাণিক উপাখ্যানে।
সৃষ্টির আদি লগ্ন ও বেদমাতা গায়ত্রীর আবির্ভাব
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, সৃষ্টির শুরুতে পরমপিতা ব্রহ্মা যখন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির পরিকল্পনা করছিলেন, তখন নিখিল ব্রহ্মাণ্ডকে সঠিক রূপ দিতে এবং চতুর্বেদের (ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ) জ্ঞানকে সংজ্ঞায়িত করতে তাঁর এক মহাশক্তির প্রয়োজন হয়। ব্রহ্মা জি তখন আদিশক্তির ধ্যান করেন।
ব্রহ্মার কঠিন তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে মহাশক্তি তাঁর মুখ থেকে দেবীরূপে আবির্ভূত হন। যেহেতু তিনি ব্রহ্মার মুখ থেকে প্রকাশিত বেদের বাণীকে ধারণ করেছিলেন, তাই ব্রহ্মা তাঁকে ‘বেদমাতা’ বা বেদের মাতা হিসেবে ভূষিত করেন। দেবীর কৃপাতেই ব্রহ্মা চতুর্বেদের জ্ঞান লাভ করেন এবং সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হন। দেবী গায়ত্রী মূলত জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক এবং সদাচরণের প্রতীক।
গায়ত্রী মন্ত্রের আদি উৎস ও ঋষি বিশ্বামিত্র
বেদমাতা গায়ত্রীর আরাধনার মূল চাবিকাঠি হলো গায়ত্রী মন্ত্র:
{{/usCountry}}বেদমাতা গায়ত্রীর আরাধনার মূল চাবিকাঠি হলো গায়ত্রী মন্ত্র:
{{/usCountry}}"ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ তৎসবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।"
এই মন্ত্রের প্রধান দেবতা হলেন ‘সবিতা’ বা সূর্যদেব, যিনি আমাদের অন্ধকার দূর করে আলো জোগান। ঋগ্বেদের এই পবিত্র মন্ত্রটির প্রথম দ্রষ্টা বা আবিষ্কারক হলেন মহর্ষি বিশ্বামিত্র।
পৌরাণিক সূত্র অনুযায়ী, ঋষি বিশ্বামিত্র তাঁর কঠোর তপস্যার মাধ্যমে দেবী গায়ত্রীর এই ২৪ অক্ষরের মন্ত্রটি মহাবিশ্বের অলৌকিক কম্পন থেকে লাভ করেছিলেন। তিনি এই মন্ত্রটিকে সর্বসাধারণের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য প্রকাশ করেন। গায়ত্রী মন্ত্রের ২৪টি অক্ষর চব্বিশটি মহাশক্তি ও ঋষির প্রতীক, যা মানুষের শরীরের ২৪টি প্রধান গ্রন্থিকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে। বিজ্ঞানও স্বীকার করেছে যে, এই মন্ত্র জপ করলে মস্তিষ্কে এক অদ্ভুত ইতিবাচক কম্পন বা ভাইব্রেশন তৈরি হয়, যা মানসিক চাপ দূর করে একাগ্রতা বাড়ায়।
গায়ত্রী জয়ন্তীর মাহাত্ম্য ও পুণ্যফল
শাস্ত্র মতে, গায়ত্রী জয়ন্তীর দিন দেবীর আরাধনা করলে এবং গায়ত্রী মন্ত্র জপ করলে সাধকের জীবনের সমস্ত অন্ধকার, অজ্ঞানতা এবং নেতিবাচক শক্তি দূর হয়ে যায়। মনে করা হয়, এই তিথিতে গায়ত্রী মন্ত্র জপ করলে একাধারে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরের আরাধনার পুণ্যফল লাভ করা সম্ভব হয়, কারণ এই মন্ত্রের মধ্যেই ত্রিমূর্তির শক্তি নিহিত রয়েছে।
আজকের এই আধুনিক ও ব্যস্ত জীবনে গায়ত্রী মন্ত্রের প্রাসঙ্গিকতা অপরিসীম। গায়ত্রী জয়ন্তীর এই পবিত্র দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল জাগতিক সুখ নয়, বুদ্ধির শুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশই মানুষের জীবনের আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত। বেদমাতা গায়ত্রীর চরণে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের সকলকে সৎ ও আলোর পথে পরিচালিত করেন।