...
...
Next Story

মহাবিশ্ব পরিক্রমা প্রতিযোগিতায় কীভাবে ভাই কার্তিককে হারিয়েছিলেন গণপতি? জানুন তাঁর বুদ্ধির পরিচয়

কী ছিল সেই প্রতিযোগিতা? কেন মহাদেব ও দেবী পার্বতী সন্তানদের মধ্যে এই শর্ত রেখেছিলেন? কীভাবে বিশাল মহাবিশ্ব পরিক্রমা না করেও বিজয়ী হলেন বিঘ্নহর্তা গণেশ?

Published on: Sep 14, 2026, 14:38:50 IST
Advertisement

সনাতন হিন্দু ধর্মে শ্রী গণেশ ও দেব সেনাপতি কার্তিক হলেন মহাদেব শিব এবং দেবী পার্বতীর দুই প্রজ্ঞাবান সন্তান। একদিকে কার্তিক তাঁর সুগঠিত রূপ, দ্রুতগতি ও দেব সেনাপতির পরাক্রমের জন্য পরিচিত; অন্যদিকে সিদ্ধিদাতা গণেশ তাঁর প্রখর মেধা, উপস্থিত বুদ্ধি ও পরম ভক্তির প্রতীক। হিন্দু পুরাণে এই দুই ভাইয়ের মধ্যে ঘটা এক ঐতিহাসিক প্রতিযোগিতার কাহিনী অত্যন্ত জনপ্রিয়, যেখানে শারীরিকভাবে পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও কেবল বুদ্ধিমত্তা ও মাতাপিতৃ ভক্তির জোরে ভাই কার্তিককে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন গণপতি।

মহাবিশ্ব পরিক্রমা প্রতিযোগিতায় কীভাবে ভাই কার্তিককে হারিয়েছিলেন গণপতি
মহাবিশ্ব পরিক্রমা প্রতিযোগিতায় কীভাবে ভাই কার্তিককে হারিয়েছিলেন গণপতি

কী ছিল সেই প্রতিযোগিতা? কেন মহাদেব ও দেবী পার্বতী সন্তানদের মধ্যে এই শর্ত রেখেছিলেন? কীভাবে বিশাল মহাবিশ্ব পরিক্রমা না করেও বিজয়ী হলেন বিঘ্নহর্তা গণেশ?—এই রোমাঞ্চকর ও শিক্ষাগ্রাহ্য পৌরাণিক ঘটনা জেনে নিন।

প্রতিযোগিতার সূত্রপাত: পরম জ্ঞানের আম ফল এবং দেবর্ষিনারদের আগমন

শিব পুরাণ ও স্কন্দ পুরাণে বর্ণিত উপাখ্যান অনুযায়ী, একদিন দেবর্ষি নারদ কৈলাসে মহাদেব শিব ও দেবী পার্বতীর কাছে আগমন করেন।

অলৌকিক ফলের আগমন: দেবর্ষি নারদ মহাদেবকে একটি অলৌকিক ফল (সংস্কৃতিতে যা পরম জ্ঞান ও অমরত্বের প্রতীক হিসেবে বর্ণিত) উপহার দেন। নারদের শর্ত ছিল, এই ফলটি কোনোভাবেই কেটে ভাগ করে খাওয়া যাবে না; এটি কেবল একজনই পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারবেন।

মাতা-পিতার ধর্মসংকট ও প্রতিযোগিতার ঘোষণা: দেবী পার্বতী ও মহাদেব শিব দুই সন্তান গণেশ ও কার্তিক দুজনকেই সমভাবে ভালোবাসতেন। তাই কাকে এই ফল দেওয়া হবে, তা নিয়ে এক ধর্মসংকট তৈরি হয়। এর সমাধানের জন্য শিব-পার্বতী দুই ভাইয়ের সামনে এক প্রতিযোগিতার প্রস্তাব রাখেন— ‘তোমাদের মধ্যে যে সবার আগে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড (পৃথিবী ও সমস্ত লোক) পরিক্রমা করে সবার প্রথমে কৈলাসে ফিরে আসতে পারবে, সেই বিজয়ী হবে এবং এই পরম ফল লাভ করবে।’

গতি বনাম বুদ্ধি: কার্তিক ও গণপতির কৌশল

কার্তিকের মহাকাশ পরিক্রমা: দেব সেনাপতি কার্তিক অত্যন্ত দ্রুতগামী ছিলেন। তাঁর বাহন ছিল ময়ূর। শিব-পার্বতীর নির্দেশ শোনামাত্র কার্তিক কালবিলম্ব না করে ময়ূরে সওয়ার হয়ে সমগ্র মহাবিশ্ব ও পৃথিবী পরিক্রমার উদ্দেশ্যে বাতাসের বেগে ধাবিত হন।

গণপতির চিন্তা ও বুদ্ধিমত্তা: অন্যদিকে গণপতি ছিলেন স্থূলদেহী এবং তাঁর বাহন ছিল একটি ছোট ইঁদুর (মুশিক)। গতি এবং বাহনের বিচারে ময়ূরের সাথে প্রতিযোগিতা করা ইঁদুরের পক্ষে অসম্ভব ছিল। কিন্তু গণপতি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে শান্ত মনে চিন্তা করা শুরু করেন। তিনি অনুধাবন করেন যে এই প্রতিযোগিতায় কেবল শারীরিক গতি নয়, দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞানের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।

গণপতির অলৌকিক বিশ্ব পরিক্রমা ও জয়লাভ

কার্তিক যখন দ্রুত গতিতে মহাবিশ্ব ঘুরে বেড়াচ্ছেন, ঠিক তখন গণপতি তাঁর অলৌকিক সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করেন:

পিতা-মাতাকে প্রদক্ষিণ: গণেশজি পরম শ্রদ্ধায় পিতা মহাদেব এবং মাতা পার্বতীকে একটি রত্নখচিত আসনে বসান। এরপর তিনি ভক্তিসহকারে মাতা-পিতাকে সাতবার প্রদক্ষিণ (পরিক্রমা) করেন এবং তাঁদের চরণে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানান।

শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ও শিব-পার্বতীর পরম সন্তুষ্টি: মহাদেব শিব গণপতিকে প্রদীপ্ত হেসে জিজ্ঞেস করেন, ‘হে পুত্র! তুমি বিশ্ব পরিক্রমা না করে আমাদের কেন পরিক্রমা করলে?’

তখন প্রজ্ঞাবান গণপতি হাত জোর করে অত্যন্ত বিনম্র সুরে উত্তর দেন— ‘সনাতন শাস্ত্র অনুযায়ী, মাতা-পিতা হলেন সমস্ত জগত, পরম ব্রহ্ম এবং সমস্ত তীর্থের সমাহার। সন্তান যদি তাঁর মাতা-পিতাকে ভক্তিভরে পরিক্রমা করে, তবে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড পরিক্রমার পুণ্য অর্জিত হয়ে যায়। আমার কাছে আমার মাতা-পিতাই আমার সমগ্র বিশ্ব।’

বিজয়ী গণপতি: গণপতির এই প্রখর প্রজ্ঞা, নিখুঁত সিদ্ধান্ত এবং অগাধ মাতাপিতৃ ভক্তি দেখে শিব-পার্বতী অত্যন্ত আনন্দিত হন। কার্তিক বিশ্ব পরিক্রমা শেষ করে ক্লান্ত হয়ে কৈলাসে ফিরে আসার আগেই শিব-পার্বতী শ্রী গণেশকে বিজয়ী ঘোষণা করেন এবং সেই অলৌকিক ফল তাঁর হাতে তুলে দেন।

এই পৌরাণিক কাহিনির আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক গুরুত্ব

গণেশ ও কার্তিকের এই প্রতিযোগিতা আমাদের জীবনে এক সুগভীর নৈতিক ও মানসিক শিক্ষা দেয়:

  • কঠিন পরিস্থিতিতে উপস্থিত বুদ্ধি: শারীরিক সামর্থ্য বা বাহ্যিক সম্পদের অভাব থাকলেও কেবল চিন্তাশক্তি ও উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে জীবনের যেকোনো বড় বাধা অতিক্রম করা সম্ভব।
  • মাতা-পিতার স্থান ও শ্রদ্ধা: পিতামাতা কেবল জন্মদাতা নন, সন্তানের জন্য তাঁরাই পরম জগত। পিতামাতাকে সম্মান ও সেবা করা মহাবিশ্বের সমস্ত পুণ্য অর্জনের সমান।
  • ধৈর্য ও মানসিক স্থিরতা: কার্তিকের মতো তাড়াহুড়ো না করে গণপতির মতো শান্ত মাথায় পরিস্থিতির মূল্যায়ন করাই সফলতার মূল চাবিকাঠি।

গণপতির এই পরম বিজয় আমাদের শেখায় যে প্রজ্ঞা ও ভক্তি সবসময় কেবল বাহ্যিক গতি বা শক্তির চেয়ে বহুগুণ শ্রেয়। এই কারণেই দেব সেনাপতি কার্তিকও পরবর্তীতে গণেশের প্রজ্ঞাকে স্বীকার করে নেন এবং গণপতি হয়ে ওঠেন দেবমণ্ডলীর সর্বাগ্রে পূজ্য বিঘ্নহর্তা।

 
ABOUT THE AUTHOR
Suman Roy

সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।

SHARE THIS ARTICLE ON
Notifications

Get breaking alerts directly from the newsroom

Notifications are on!You'll be notified when news breaks