সনাতন হিন্দু ধর্মে দেবী দুর্গাকে পরমাশক্তি ও বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জননী হিসেবে মান্য করা হয়। সপ্তাহে প্রতিদিন দেবী দুর্গার পুজো ও আরতির গুরুত্ব থাকলেও শুক্রবারের দিনটি মা দুর্গা ও দেবী লক্ষ্মীর বিশেষ কৃপা লাভের জন্য অত্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। শুক্রবারে ভক্তিকুল নিষ্ঠা ও ভক্তিভরে মা দুর্গার আরতি নিবেদন করলে গৃহের সমস্ত অশুভ শক্তি দূর হয়, পারিবারিক সুখ-শান্তি বৃদ্ধি পায় এবং জীবনে ধন-ধান্যের অভাব চিরতরে মিটে যায়।

তবে দেবীর কৃপা পেতে শুক্রবারে আরতি করার কিছু নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় নিয়ম ও বিধান মেনে চলা জরুরি। শুক্রবারে মা দুর্গার আরতি কীভাবে করা উচিত, আরতির সময় কী কী উপাচার প্রয়োজন, সঠিক সময় ও শক্তিশালী মন্ত্রগুলি কী কী—তা নিয়ে একটি সম্পূর্ণ নির্দেশিকা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
১. আরতির প্রয়োজনীয় উপাচার ও প্রস্তুতি
মা দুর্গার আরতি শুরু করার আগে পুজোর স্থান পবিত্র করা এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী গুছিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
- প্রদীপ ও পঞ্চপ্রদীপ: তামার বা কাঁসার পঞ্চপ্রদীপে ঘি বা তিল তেল দিয়ে ৫টি সলতে জ্বালানো উত্তম।
- ধূপ ও ধুনো: ধূপকাঠি এবং গুগল-ধুনোর সুগন্ধি ধোঁয়া পরিবেশকে ইতিবাচক শক্তিতে পূর্ণ করে তোলে।
- শঙ্খ ও ঘণ্টার ধ্বনি: আরতির সময়ে শঙ্খধ্বনি এবং ঘণ্টা বাজানো অত্যন্ত শুভ।
- আরতি নিবেদনের শুভ বস্তু: পুষ্প বা লাল ফুল (জবা ফুল দেবী দুর্গার পরম প্রিয়), কর্পূর, চামর এবং পরিচ্ছন্ন সাদা বা লাল সুতি কাপড়।
২. শুক্রবারে মা দুর্গার আরতি করার সঠিক নিয়মকানুন
শাস্ত্র মতে দেবী দুর্গার আরতি করার সময় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও ক্রম বজায় রাখা আবশ্যক:
{{/usCountry}}শাস্ত্র মতে দেবী দুর্গার আরতি করার সময় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও ক্রম বজায় রাখা আবশ্যক:
{{/usCountry}}আচমন ও সংকল্প: আরতি শুরুর আগে হাত-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার লাল বা হলুদ রঙের পোশাক পরিধান করুন। এরপর আচমন করে মা দুর্গার ধ্যান করুন।
আরতির সঠিক ঘূর্ণন নিয়ম:
- দেবীর চরণ কমলে ৪ বার প্রদীপ ঘোরাতে হয়।
- দেবীর নাভি দেশে ২ বার প্রদীপ ঘোরাতে হয়।
- দেবীর শ্রীমুখে ১ বার প্রদীপ ঘোরাতে হয়।
- সবশেষে দেবীর সর্বাঙ্গে অর্থাৎ পুরো প্রতিমা বা ছবির সামনে ৭ বার প্রদীপ ঘোরাতে হয়। (মোট ১৪ বার ঘোরানোর প্রথা রয়েছে)।
শঙ্খধ্বনি ও কর্পূর আরতি: পঞ্চপ্রদীপের আরতি শেষে লাল ফুল অর্পণ করে কর্পূর আরতি নিবেদন করতে হয়। আরতির সময়ে ধুনো দেওয়া ও শঙ্খধ্বনি করা পরম কল্যাণকর।
ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা: আরতি সমাপ্ত হওয়ার পর হাত জোর করে মা দুর্গার চরণে আরতির আলো গ্রহণ করুন এবং পুজোয় কোনো ত্রুটি থাকলে দেবীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
৩. দেবী দুর্গার আরতির মূল মন্ত্র ও জপ মন্ত্র
আরতির সময় ও আরতির শেষে দেবী দুর্গার এই পরম শক্তিশালী মন্ত্রগুলি পাঠ করলে দেবীর বিশেষ কৃপা লাভ হয়:
- দেবী দুর্গার আরতি মন্ত্র (জয় অম্বে গৌরী):
"জয় অম্বে গৌরী, মৈয়া জয় শ্যামা গৌরী।
তুমকো নিশদিন ধ্যাবত, হরি ব্রহ্মা শিবরী॥"
- দেবী দুর্গার মহাসিদ্ধ মন্ত্র:
"সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে।
শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোঽস্তু তে॥"
- দেবী দুর্গার বীজ মন্ত্র (আরতির পর ১০৮ বার জপ করা শুভ):
"ওঁ ঐঁ হ্রীঁ ক্লীঁ চামুণ্ডায়ৈ বিচ্চে॥"
৪. শুক্রবারে দেবী দুর্গার আরতি করার বিশেষ অলৌকিক ফল
- আর্থিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি: শুক্রবারে দেবী দুর্গা ও মা লক্ষ্মীর আরাধনা একযোগে সম্পন্ন হওয়ায় অর্থকষ্ট ও ঋণগ্রস্ততা থেকে মুক্তি মেলে।
- পারিবারিক সুখ ও শান্তি: দেবী দুর্গার কৃপায় গৃহের বাস্তুদোষ ও নেতিবাচক শক্তি দূর হয় এবং পারিবারিক সম্পর্কে প্রীতি ও বন্ধন দৃঢ় হয়।
- ভয় ও শত্রু নাশ: দেবীর আরতির আলো ও ধুনোর গন্ধে গ্রহদোষ ও মানসিক দুশ্চিন্তা কেটে যায়।
শুক্রবারে নিষ্ঠা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং শুদ্ধ মনে মা দুর্গার আরতি করলে দেবী প্রসন্ন হন এবং ভক্তের সমস্ত মাক্সিক ইচ্ছা পূরণ করেন। সঠিক নিয়ম ও মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে আরতি নিবেদন করে দেবীর অশেষ আশীর্বাদ লাভ করুন।