বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে সবচেয়ে আবেগঘন ও মহিমান্বিত পর্ব হলো শারদীয় দুর্গোৎসব। আর এই উৎসবের বার্তা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয় 'মহালয়া' (Mahalaya)। মহালয়ার ভোরে রেডিওর স্পিকারে বীরেন ভদ্রের (বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র) বজ্রগম্ভীর ও ভক্তিময় কণ্ঠে—"আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জরী..." শোনার মাধ্যমে শুরু হয় দেবীপক্ষের শুভ আরাধনা।

১৯৩১ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে (আকাশবাণী) প্রথম সম্প্রচারিত হওয়ার পর থেকে গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে মহালয়ার ভোরে 'মহিষাসুরমর্দিনী' (Mahishasura Mardini) আলেখ্য শোনা বাঙালির জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কেন দুর্গাপুজোর সূচনাতেই এই বিশেষ আলেখ্য শোনা হয়? শ্রীশ্রী চণ্ডী এবং দেবীর আবাহনের সাথে এর শাস্ত্রীয় ও আত্মিক সম্পর্ক কী? জেনে নিন।
১. 'মহিষাসুরমর্দিনী' কী এবং কীভাবে জন্ম হলো এই চিরন্তন সৃষ্টির?
'মহিষাসুরমর্দিনী' হলো দেবী দুর্গার দ্বারা অসুররাজ মহিষাসুর বধের পৌরাণিক কাহিনী নির্ভর এক অলৌকিক গীতিনাট্য বা গীতি-আলেখ্য।
- রচয়িতা ও সুরকার: দেবী মহাত্ম্যম্ বা 'শ্রীশ্রী চণ্ডী'র উপাখ্যান অবলম্বন করে এই অবিস্মরণীয় অনুষ্ঠানটি রচনা করেছিলেন বাণীকুমার (প্রবর্তক)। এতে সুর সংযোজন ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন সুরসাধক পঙ্কজ কুমার মল্লিক এবং পাঠ ও শ্লোক আবৃত্তি করেছিলেন মহাজাগতিক কণ্ঠের অধিকারী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।
- ভোরের প্রথম আলো ও ভক্তির আবহ: আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর মহালয়ার ভোর ৪টেয় এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উচ্চারিত সংস্কৃত শ্লোক এবং পঙ্কজ মল্লিকের সুরে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান বাঙালির হৃদয়ে গভীর ভক্তিভাব জাগিয়ে তোলে।
২. দুর্গাপুজোর আগে মহিষাসুরমর্দিনী শোনার শাস্ত্রীয় ও সাংস্কৃতিক কারণ
মহালয়ার প্রাক্কালে মহিষাসুরমর্দিনী পাঠ ও গান শোনার পেছনে সুগভীর শাস্ত্রীয় ও সামাজিক কারণ বিদ্যমান:
- দেবীপক্ষের আগমন ও দেবীর আবাহন: মহালয়ার সাথে সাথে শেষ হয় অন্ধকারময় পিতৃপক্ষ এবং সূচিত হয় আলোকময় 'দেবীপক্ষ'। দেবীকে ধরণীতে আগমন জানানোর জন্য এবং চণ্ডীপাঠে দেবীর জ্যোতির্ময় রূপকে জাগ্রত করার সংকেত হিসেবে এই আলেখ্য শোনা হয়।
- অসুর বধ ও শুভ শক্তির জয়ের স্মৃতি: মহিষাসুরের অত্যাচারে যখন দেবতারা স্বর্গচ্যুত হয়েছিলেন, তখন ত্রিদেব (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর) এবং অন্যান্য দেবতাদের তেজোরাশি থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন দশভুজা মা দুর্গা। দেবী দুর্গা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মহিষাসুরকে বধ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। মহিষাসুরমর্দিনী মূলত এই সত্যেরই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পরম অসত্য ও অন্যায়ের বিনাশ অনিবার্য।
- স্মৃতি, আবেগ ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা: রেডিওর যুগে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য আজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা স্মার্টফোনে শুনলেও এর আবেগ একই রয়ে গেছে। পরিবারের প্রবীণ থেকে নবীন—সবাই ভোরে ঘুম থেকে উঠে মহিষাসুরমর্দিনী শুনে পুজোর নতুন পোশাক পরা এবং মণ্ডপে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি শুরু করেন।
৩. মহালয়া ২০২৬: মহিষাসুরমর্দিনী ও পিতৃ তর্পণের বিশেষ সূচি
{{/usCountry}}মহালয়ার প্রাক্কালে মহিষাসুরমর্দিনী পাঠ ও গান শোনার পেছনে সুগভীর শাস্ত্রীয় ও সামাজিক কারণ বিদ্যমান:
- দেবীপক্ষের আগমন ও দেবীর আবাহন: মহালয়ার সাথে সাথে শেষ হয় অন্ধকারময় পিতৃপক্ষ এবং সূচিত হয় আলোকময় 'দেবীপক্ষ'। দেবীকে ধরণীতে আগমন জানানোর জন্য এবং চণ্ডীপাঠে দেবীর জ্যোতির্ময় রূপকে জাগ্রত করার সংকেত হিসেবে এই আলেখ্য শোনা হয়।
- অসুর বধ ও শুভ শক্তির জয়ের স্মৃতি: মহিষাসুরের অত্যাচারে যখন দেবতারা স্বর্গচ্যুত হয়েছিলেন, তখন ত্রিদেব (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর) এবং অন্যান্য দেবতাদের তেজোরাশি থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন দশভুজা মা দুর্গা। দেবী দুর্গা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মহিষাসুরকে বধ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে শান্তি ফিরিয়ে আনেন। মহিষাসুরমর্দিনী মূলত এই সত্যেরই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পরম অসত্য ও অন্যায়ের বিনাশ অনিবার্য।
- স্মৃতি, আবেগ ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা: রেডিওর যুগে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য আজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা স্মার্টফোনে শুনলেও এর আবেগ একই রয়ে গেছে। পরিবারের প্রবীণ থেকে নবীন—সবাই ভোরে ঘুম থেকে উঠে মহিষাসুরমর্দিনী শুনে পুজোর নতুন পোশাক পরা এবং মণ্ডপে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি শুরু করেন।
৩. মহালয়া ২০২৬: মহিষাসুরমর্দিনী ও পিতৃ তর্পণের বিশেষ সূচি
{{/usCountry}}পঞ্জিকা ও জ্যোতিষ শাস্ত্রীয় গণনা অনুযায়ী ২০২৬ সালের মহালয়ার সুনির্দিষ্ট তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
- মহালয়ার শুভ তারিখ: ১০ অক্টোবর, ২০২৬ (শনিবার)।
- আকাশবাণীতে মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচারের সময়: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ভোর ০৪:০০ টা।
- গঙ্গায় পিতৃ তর্পণের শুভ মুহূর্ত: ১০ অক্টোবর ভোরে মহালয়া অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশ্যে গঙ্গার ঘাটে ঘাটে অঞ্জলি ও তর্পণ করার শুভ সময় ভোর ০৫:৪৫ মিনিট থেকে সকাল ১০:৩০ মিনিট পর্যন্ত।
মহালয়ার ভোরের ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ কেবল একটি রেডিও অনুষ্ঠান নয়, এটি প্রতিটি বাঙালির আত্মার স্পন্দন। মহালয়ার প্রাতে দেবী দুর্গার আবাহন ধ্বনি আমাদের ভেতরের সমস্ত অহংকার ও আসুরিক চিন্তা দূর করে সত্য, শান্তি ও ভালোবাসার আলোয় ভরিয়ে দিক।