প্রতি বছর মার্গশীর্ষ (অগ্রহায়ণ) মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিটি মোক্ষদা একাদশী নামে পরিচিত। 'মোক্ষদা' শব্দের অর্থ হলো—যিনি মুক্তি দান করেন। হিন্দুধর্মে এই তিথির গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্বাস করা হয়, এই পবিত্র তিথিতে উপবাস ও ব্রত পালনের মাধ্যমে কেবল বর্তমান জীবনের পাপই নয়, বরং পূর্বপুরুষদের আত্মাও মুক্তি বা মোক্ষ লাভ করে। এই তিথিতেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে কুরুক্ষেত্রের ময়দানে গীতার জ্ঞান দান করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

মোক্ষদা একাদশী পালনের নেপথ্যে যে কিংবদন্তি প্রচলিত আছে, তা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন নিচে দেওয়া হলো:
১. মোক্ষদা একাদশীর ব্রত কথা (Vrat Katha)
এই ব্রত কথার কেন্দ্রে আছেন বৈখানস (Vaikanas) নামক এক ধর্মপ্রাণ রাজা, যিনি চম্পক নগর শাসন করতেন।
ক. রাজার স্বপ্ন ও পিতার কষ্ট
এক রাতে রাজা বৈখানস এক বিভীষিকাময় স্বপ্ন দেখেন। তিনি দেখেন যে তাঁর স্বর্গীয় পিতা নরকে বা অত্যন্ত কষ্টকর পরিস্থিতিতে কষ্ট পাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে রাজা গভীরভাবে বিচলিত হন। ঘুম ভাঙার পর তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের বিদ্বান ব্রাহ্মণ ও পন্ডিতদের ডেকে তাঁর স্বপ্নের কথা জানান এবং পিতার মুক্তির উপায় জানতে চান। কিন্তু কেউ এই সমস্যার সঠিক সমাধান দিতে পারেননি।
খ. পর্বত মুনির উপদেশ
অবশেষে রাজা বৈখানস এক মহান সাধক, পর্বত মুনি (Parvata Muni)-এর আশ্রমে যান। পর্বত মুনি তাঁর যোগশক্তির মাধ্যমে রাজার পিতার অবস্থা জানতে পারেন। মুনি রাজাকে জানান যে, তাঁর পিতা তাঁর পূর্বকৃত একটি গুরুতর পাপের কারণে নরক যন্ত্রণা ভোগ করছেন।
পিতা মুক্ত হতে পারেন এমন উপায় জানতে চাইলে মুনি রাজাকে বলেন, "হে রাজন, আপনি মার্গশীর্ষ মাসের শুক্লপক্ষের মোক্ষদা একাদশী ব্রত পালন করুন। এই ব্রত পালনের ফলে যে পূণ্য বা পুণ্যফল আপনি লাভ করবেন, তা আপনার পিতাকে উৎসর্গ করুন। একমাত্র এই উপায়েই আপনার পিতা নরক থেকে মুক্তি লাভ করে মোক্ষ প্রাপ্ত হতে পারেন।"
{{/usCountry}}পিতা মুক্ত হতে পারেন এমন উপায় জানতে চাইলে মুনি রাজাকে বলেন, "হে রাজন, আপনি মার্গশীর্ষ মাসের শুক্লপক্ষের মোক্ষদা একাদশী ব্রত পালন করুন। এই ব্রত পালনের ফলে যে পূণ্য বা পুণ্যফল আপনি লাভ করবেন, তা আপনার পিতাকে উৎসর্গ করুন। একমাত্র এই উপায়েই আপনার পিতা নরক থেকে মুক্তি লাভ করে মোক্ষ প্রাপ্ত হতে পারেন।"
{{/usCountry}}গ. মুক্তির পথ
পর্বত মুনির কথা শুনে রাজা যথাসময়ে ভক্তি সহকারে সমস্ত নিয়ম মেনে মোক্ষদা একাদশী ব্রত পালন করেন। ব্রত শেষে, রাজা তাঁর সমস্ত পূণ্য তাঁর পিতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেন। এই পূণ্যের প্রভাবে রাজার পিতা সঙ্গে সঙ্গে নরক থেকে মুক্তি পান এবং স্বর্গ বা বৈকুণ্ঠের পথে যাত্রা করেন।
২. মোক্ষদা একাদশীর মাহাত্ম্য
- মোক্ষ লাভ: এই ব্রত পালনের মূল উদ্দেশ্যই হলো মুক্তি। বিশ্বাস করা হয় যে, এই দিনে উপবাস করলে সকল পাপ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়।
- গীতা জয়ন্তী: এই দিনেই কুরুক্ষেত্রের ময়দানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার জ্ঞান দান করেছিলেন। তাই মোক্ষদা একাদশীর দিনে গীতা পাঠ করা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।
- বিষ্ণু পূজা: এই একাদশীতে ভগবান বিষ্ণুর পূজা এবং ধ্যান করা হয়।
৩. পূজা পদ্ধতি (সংক্ষেপে)
মোক্ষদা একাদশীর দিন সকালে স্নান সেরে পরিষ্কার কাপড় পরিধান করতে হয়। এরপর সারা দিন উপবাস থেকে ভগবান বিষ্ণুর পূজা করতে হয়। এই দিন তুলসী পাতা অর্পণ করা এবং বিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ করা শুভ বলে বিবেচিত। এই দিনে অবশ্যই দান-ধ্যান করা উচিত।