বলরামের পাশে স্ত্রী রেবতী ছিলেন পর্বতের মতো উঁচু! মহাভারতের এই বিখ্যাত নারীর গল্পে আছে ‘টাইম ট্রাভেল’-এর কথা
রেবতী ছিলেন কুশস্থলীর রাজা রৈবতের কন্যা। রৈবত ছিলেন সত্যযুগের একজন অত্যন্ত ধার্মিক ও শক্তিশালী রাজা। সমস্যা দেখা দিয়েছিল রেবতীর বিবাহ নিয়ে। রাজা রৈবত সারা পৃথিবীতে ঘুরেও কন্যার জন্য কোনো যোগ্য পাত্র খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তার পরে কী হল?
মহাভারতের বিশাল ক্যানভাসে আমরা কৃষ্ণ, অর্জুন কিংবা দ্রৌপদীর কথা বারবার পড়ি, কিন্তু এমন কিছু চরিত্র আছে যাদের জীবনকাহিনী অত্যন্ত অদ্ভুত এবং রোমাঞ্চকর। শ্রীকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ভগবান বলরামের পত্নী রেবতী তেমনই এক বিস্ময়কর চরিত্র। পুরাণে বর্ণিত তাঁর কাহিনীটি কেবল প্রেম বা বিবাহের গল্প নয়, বরং এটি প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রের 'সময় ভ্রমণ' (Time Travel) বা আপেক্ষিকতার এক অনন্য উদাহরণ।

পুরাণ ও মহাভারত অনুসারে, রেবতী ছিলেন কুশস্থলীর (যা পরবর্তীতে দ্বারকা হয়) রাজা রৈবতের কন্যা। রৈবত ছিলেন সত্যযুগের একজন অত্যন্ত ধার্মিক ও শক্তিশালী রাজা। তাঁর কন্যা রেবতী ছিলেন অসামান্য রূপবতী এবং গুণবতী। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছিল রেবতীর বিবাহ নিয়ে। রাজা রৈবত সারা পৃথিবীতে ঘুরেও কন্যার জন্য কোনো যোগ্য পাত্র খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
ব্রহ্মলোকে যাত্রা এবং সময়ের কারসাজি
কন্যার যোগ্য পাত্রের সন্ধানে রাজা রৈবত রেবতীকে সঙ্গে নিয়ে সরাসরি ব্রহ্মলোকে পৌঁছান সৃষ্টি কর্তা ব্রহ্মার পরামর্শ নিতে। যখন তাঁরা ব্রহ্মলোকে পৌঁছান, তখন সেখানে গন্ধর্বরা সঙ্গীত পরিবেশন করছিলেন। রাজা রৈবত সেই সঙ্গীত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করেন। সঙ্গীত শেষ হলে তিনি ব্রহ্মার কাছে তাঁর কন্যার জন্য পৃথিবীতে থাকা বিভিন্ন রাজপুত্রের নাম প্রস্তাব করেন।
ব্রহ্মা মৃদু হেসে বলেন যে, পৃথিবীতে সময়ের গতি এবং ব্রহ্মলোকের সময়ের গতি এক নয়। ব্রহ্মা তাঁকে জানান যে, রৈবত যে সময়টুকু এখানে অতিবাহিত করেছেন, সেই সামান্য সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে কয়েক হাজার বছর পেরিয়ে গেছে এবং সত্যযুগ শেষ হয়ে দ্বাপর যুগ শুরু হয়েছে। রৈবতের প্রস্তাবিত সেই রাজপুত্ররা, তাঁদের বংশধর এবং এমনকি তাঁদের স্মৃতিও পৃথিবী থেকে মুছে গেছে।
বলরামের সাথে সাক্ষাৎ ও উচ্চতার সমস্যা
ব্রহ্মা রাজাকে পরামর্শ দেন যে, বর্তমানে পৃথিবীতে ভগবান বিষ্ণুর অংশ হিসেবে বলরাম ও কৃষ্ণ অবতীর্ণ হয়েছেন। বলরামই হবেন রেবতীর জন্য উপযুক্ত বর। ব্রহ্মা যখন এই কথা বলছেন, তখন পৃথিবীতে দ্বাপর যুগের শেষ পর্যায়। রাজা রৈবত পৃথিবীতে ফিরে এসে দেখেন সবকিছু বদলে গেছে। মানুষ ছোট হয়ে গেছে এবং তাদের আয়ুও কমে গেছে।
সবথেকে বড় সমস্যা ছিল উচ্চতা নিয়ে। যেহেতু রেবতী সত্যযুগের মানুষ ছিলেন, তাই তাঁর উচ্চতা ছিল দ্বাপর যুগের মানুষের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। বলরামের সামনে যখন রেবতীকে আনা হলো, তখন রাজকন্যাকে বলরামের তুলনায় পর্বতের মতো বিশাল দেখাচ্ছিল।
বলরামের অলৌকিক স্পর্শ
এই অদ্ভুত সমস্যার সমাধানে বলরাম তাঁর বিশেষ অস্ত্র 'হল' (লাঙল) হাতে নিলেন। তিনি লাঙল দিয়ে রেবতীর কাঁধে আলতো করে চাপ দিলেন। বলরামের দিব্য শক্তিতে মুহূর্তের মধ্যে রেবতীর উচ্চতা কমে দ্বাপর যুগের মানুষের সমান হয়ে গেল। রেবতীর রূপ ও গুণে মুগ্ধ হয়ে বলরাম তাঁকে বিবাহ করেন। এই মিলনের মাধ্যমেই সত্যযুগের এক রাজকন্যার সাথে দ্বাপর যুগের এক মহাপুরুষের মিলন সম্পন্ন হয়।
রেবতীর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য
রেবতী ছিলেন বলরামের প্রতি অত্যন্ত অনুগত এবং ধৈর্যশীল। বলরামের ক্রোধ সম্পর্কে আমরা সবাই জানি, কিন্তু রেবতী তাঁর শান্ত স্বভাব দিয়ে বলরামের গৃহকে শান্ত রাখতেন। তাঁদের দুই পুত্র ছিল— নিশাঠ এবং উল্মুক। মহাভারতের মৌষল পর্বে যখন যদুবংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং বলরাম যোগবলে দেহত্যাগ করেন, তখন রেবতী সতীদাহ প্রথা মেনে স্বামীর চিতার আগুনে নিজেকে আহুতি দেন।
রেবতীর কাহিনী আমাদের শেখায় যে সময় ও নিয়তি কারোর জন্য অপেক্ষা করে না। মহাভারতের এই স্বল্পালোচিত নারী চরিত্রটি প্রাচীন বিজ্ঞানের সেই তত্ত্বকে তুলে ধরে যেখানে বলা হয়েছে যে মহাবিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সময়ের গতি ভিন্ন হতে পারে। রেবতী ও বলরামের বিবাহ কেবল একটি পৌরাণিক ঘটনা নয়, এটি দুই যুগের সেতুবন্ধন।
ABOUT THE AUTHORSuman Royসুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More
E-Paper


