মহাভারতের রাজা মুচুকুন্দর দৃষ্টিতেই ভস্ম হয়েছিল কালযবন! কেন চিরনিদ্রায় থাকতেন সূর্যবংশের সেই অপরাজেয় যোদ্ধা

রাজা মুচুকুন্দের ত্যাগ, তাঁর গভীর নিদ্রার অভিশাপ (যা আসলে ছিল বর) এবং তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরণের কথা অনেকেই জানেন না। সূর্যবংশের সেই অপরাজেয় যোদ্ধা, যাঁর এক দৃষ্টিতে ভস্ম হয়েছিল কালযবন, তাঁর কথা আজ জেনে নিন।

Published on: Feb 21, 2026, 15:37:01 IST
Share
Share via
  • facebook
  • twitter
  • linkedin
  • whatsapp
Copy link
  • copy link

মহাভারতের বিশাল ক্যানভাসে আমরা অর্জুন, ভীম বা কর্ণের বীরত্বের কথা বারবার পড়ি। কিন্তু এই মহাকাব্যের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে আছে এমন কিছু চরিত্র, যাঁদের তেজ দেবরাজ ইন্দ্রকেও চমকে দিয়েছিল। সূর্যবংশের মহান রাজা মুচুকুন্দ তেমনই একজন বিস্মৃতপ্রায় যোদ্ধা। শ্রীকৃষ্ণের হাতে 'কালযবন' বধের নেপথ্যে এই রাজার এক অদ্ভুত ভূমিকা ছিল।

রাজা মুচুকুন্দর দৃষ্টিতেই ভস্ম হয়েছিল কালযবন! কেন চিরনিদ্রায় থাকতেন তিনি
রাজা মুচুকুন্দর দৃষ্টিতেই ভস্ম হয়েছিল কালযবন! কেন চিরনিদ্রায় থাকতেন তিনি

রাজা মুচুকুন্দের ত্যাগ, তাঁর গভীর নিদ্রার অভিশাপ (যা আসলে ছিল বর) এবং তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরণের কথা অনেকেই জানেন না। সূর্যবংশের সেই অপরাজেয় যোদ্ধা, যাঁর এক দৃষ্টিতে ভস্ম হয়েছিল কালযবন, তাঁর কথা আজ জেনে নিন।

পুরাণ ও মহাভারত অনুযায়ী, রাজা মুচুকুন্দ ছিলেন ইক্ষ্বাকু বংশের অর্থাৎ সূর্যবংশের রাজা মান্ধাতার পুত্র। তিনি কেবল একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না, ছিলেন এক অপরাজেয় যোদ্ধা। তাঁর বীরত্বের কাহিনি মর্ত্য ছাড়িয়ে পৌঁছে গিয়েছিল স্বর্গলোকেও।

দেব-অসুর যুদ্ধে মুচুকুন্দের ভূমিকা

একসময় তারকাসুরের অত্যাচারে দেবতারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। কার্তিক বা স্কন্দ তখনও দেবসেনাপতি হিসেবে জন্ম নেননি। সেই চরম বিপদে দেবরাজ ইন্দ্র রাজা মুচুকুন্দের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন। মুচুকুন্দ দীর্ঘকাল ধরে দেবতাদের পক্ষে অসুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তাঁর ত্যাজ ও রণকৌশলে দেবতারা সুরক্ষিত থাকেন। দীর্ঘ কয়েক যুগ মর্ত্য থেকে দূরে থেকে তিনি স্বর্গকে রক্ষা করেছিলেন।

বর না অভিশাপ? মুচুকুন্দের চিরনিদ্রা

অবশেষে যখন কার্তিক দেবসেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত হলেন, তখন ইন্দ্র মুচুকুন্দকে বিশ্রাম নেওয়ার অনুরোধ জানান। ইন্দ্র তাঁকে বর দিতে চাইলে মুচুকুন্দ কেবল গভীর নিদ্রা প্রার্থনা করেন। কারণ দীর্ঘ যুগের যুদ্ধে তিনি ক্লান্ত ছিলেন। ইন্দ্র তাঁকে বর দিলেন যে, মুচুকুন্দ একটি পর্বতগুহায় গভীর ঘুমে মগ্ন থাকবেন এবং যদি কেউ তাঁর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় বা তাঁকে অকালে জাগিয়ে দেয়, তবে মুচুকুন্দের প্রথম দৃষ্টিপাত মাত্রই সেই ব্যক্তি ভস্মীভূত হয়ে যাবে। এটি মুচুকুন্দের বিশ্রামের জন্য একটি কবচ ছিল।

শ্রীকৃষ্ণ ও কালযবন বধের নেপথ্যে মুচুকুন্দ

মুচুকুন্দের এই ঘুমের কাহিনি শ্রীকৃষ্ণের লীলার সঙ্গে যুক্ত হয় দ্বাপর যুগে। মথুরা আক্রমণের সময় কালযবন নামক এক অপরাজেয় অসুর শ্রীকৃষ্ণকে তাড়া করে। কালযবনকে কোনো অস্ত্র দিয়ে বধ করা সম্ভব ছিল না। শ্রীকৃষ্ণ কৌশলে কালযবনকে সেই গুহায় নিয়ে যান যেখানে মুচুকুন্দ ঘুমিয়ে ছিলেন।

শ্রীকৃষ্ণ নিজের পীতাম্বর (হলুদ চাদর) মুচুকুন্দের গায়ের ওপর ফেলে রেখে আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। কালযবন গুহায় ঢুকে চাদর ঢাকা মুচুকুন্দকে কৃষ্ণ ভেবে পদাঘাত করে জাগিয়ে দেয়। দীর্ঘ নিদ্রা ভেঙে ক্রুদ্ধ মুচুকুন্দ চোখ মেলতেই তাঁর চোখের আগুনে মুহূর্তের মধ্যে কালযবন ভস্মে পরিণত হয়।

শ্রীকৃষ্ণের দর্শন ও মোক্ষ লাভ

কালযবন ভস্ম হওয়ার পর মুচুকুন্দ যখন শ্রীকৃষ্ণকে সামনে দেখেন, তিনি বুঝতে পারেন যে ত্রেতা যুগের সেই রামচন্দ্রই আজ কৃষ্ণরূপে তাঁর সামনে। মুচুকুন্দ অনুশোচনা করেন যে তিনি কেবল বৈষয়িক বিজয় আর ঘুমের মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে তিনি সংসার ত্যাগ করে বদরিকা আশ্রমে তপস্যা করতে যান এবং অবশেষে মোক্ষ লাভ করেন।

রাজা মুচুকুন্দের কাহিনি আমাদের শেখায় যে, পরম বীরত্বের শেষ গন্তব্যও আসলে আধ্যাত্মিক শান্তি। তিনি যেমন দেবতাদের রক্ষা করেছিলেন, তেমনই নিজের অজান্তেই শ্রীকৃষ্ণের এক মহান উদ্দেশ্য সফল করেছিলেন। মহাভারতের এই মহান চরিত্রটি আজও ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

  • Suman Roy
    ABOUT THE AUTHOR
    Suman Roy

    সুমন রায় হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় ডেপুটি নিউজ এডিটর পদে কর্মরত। এই মুহূর্তে তিনি এই ওয়েবসাইটের ভারপ্রাপ্ত। কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সুমন সাংবাদিকতার পেশায় চলে এসেছিলেন। মূল আগ্রহের জায়গা ছিল লেখালিখি। সাংবাদিক হিসাবে কাজ শুরু করার পরে সংবাদপত্রের উত্তর সম্পাদকীয় পাতায় কাজ, বিনোদন এবং জীবনযাপন বিভাগে কাজ করতে করতে এখন সুমন ডিজিটাল মাধ্য়মের কনটেন্ট প্রোডিউসার হিসাবে কর্মরত। পেশাদার অভিজ্ঞতা: ১৮ বছরের সামান্য বেশি সময় ধরে সুমন এই পেশায় কর্মরত। প্রথম বছর খানেক কাটে খবরের কাগজে। তার পরে তারা নিউজে স্বল্প কিছু সময়ের কাজ এবং তার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত খবরের কাগজে কাজ করেছেন সুমন। এর মধ্যে ‘একদিন’ নামক দৈনিক পত্রিকায় কয়েক বছর কেটেছে। তবে কেরিয়ারের বেশির ভাগ সময়ই কেটেছে ‘এই সময়’ সংবাদপত্রে। সেখানে বিনোদন, জীবনযাপন এবং ফিচার বিভাগে সুমন কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে এক বছর কাটে আনন্দবাজার ডিজিটালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে হিন্দুস্তান টাইমস বাংলায় কর্মরত সুমন। শিক্ষাগত যোগ্যতা: হিন্দুস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন। তার পরে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলা নিয়ে স্নাতকস্তরের পড়াশোনা করেন তিনি। ব্যক্তিগত পছন্দ ও নেশা: গল্পের বই পড়া, গান শোনা এবং বেড়ানো। কাজের বাইরে মূলত এই তিনটি জিনিস নিয়েই বাঁচেন সুমন। একটু লম্বা ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়েন নতুন জায়গা দেখতে। অচেনা মানুষের সঙ্গে আলাপ করতে, তাঁদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে এবং সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখতে পছন্দ করেন সুমন।Read More